২০২০ সালের অধিকাংশ সময়জুড়ে এককভাবে দুনিয়ায় আধিপত্য করেছে নভেল করোনাভাইরাস। এরই মধ্যে এটি অনেকবার বিশ্বজুড়ে প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে এবং কমপক্ষে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের পথে চলাচল করেছে।

অতি ক্ষুদ্র এ ভাইরাসটি মুহূর্তের মধ্যে বিস্তৃত হতে পারে। যাতে প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে তিন লাখের বেশি মানুষ এবং সংখ্যাটি ক্রমে বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধে যেখানে তাপমাত্রা কমে এসেছে ও মানুষ বেশির ভাগ সময় আবদ্ধ স্থানে অবস্থান করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা হচ্ছে শরৎ ও শীতে এ কভিড-১৯-এর সংক্রমণ আরো ব্যাপকভাবে বাড়বে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে।

সাম্প্রতিক সময়ে মন খারাপ করে দেয়ার মতো একটি মাইলফলক এনে দিয়েছে এ ভাইরাস। যেখানে জনস হপকিন্সের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান মতে, ১০ লাখ মানুষ এরই মধ্যে সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের ধারণা হচ্ছে, করোনাভাইরাস সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো আরো বেশি হতে পারে।

তবে এখানেই সব শেষ হচ্ছে না, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) মেডিকেল পরিসংখ্যানবিদদের মতে, মধ্য ডিসেম্বরেই এ ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা ২০ লাখের কোটা অতিক্রম করবে।

এদিকে নববর্ষের প্রাক্কালে গিয়ে চীনে প্রথম এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার এক বছরও পূর্ণ হবে। সিয়াটলভিত্তিক আইএইচএমই গবেষকদের সাম্প্রতিক মডেল বলছে, বছর পূরণ করার সময় এ ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা হতে পারে ২৫ লাখেরও বেশি। 

একটি নিম্ন বিন্দু

মাত্র একটি বছর। স্প্যানিশ ফ্লুর পর আর কোনো ভাইরাস বিশ্বের জন্য এত দ্রুত সময়ের মধ্যে এমন দুর্ভোগ নিয়ে আসেনি। এমনকি এইচআইভিরও এক মিলিয়ন মৃত্যু স্পর্শ করতে লেগেছে দীর্ঘ সময়।

সব মিলিয়ে সংক্রামক রোগের ইতিহাসে ২০২০ সাল বেশ খারাপ একটি বছর হিসেবে হাজির হয়েছে। তবে গবেষকরা কয়েক বছর আগে থেকেই মানুষকে এ ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করে আসছিলেন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সতর্কতামূলক রিপোর্টটি প্রকাশ করেছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা সে সতর্কবার্তাকে গ্রাহ্য করেননি এবং এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। পরিসংখ্যান বলছে, কভিড-১৯-এ এ বছর যে পরিমাণ মানুষ মারা যাবে তা গত বছর এইডসে যত মানুষ মারা গেছে তার তিন গুণ এবং ম্যালেরিয়ায় যে পরিমাণ মারা গেছে তার পাঁচ গুণ।

শুরুতে ডাক্তাররা কভিড-১৯কে মামুলি ফ্লু বলে মন্তব্য করেছিলেন, এ মন্তব্য যে মোটেই সঠিক ছিল না এরই মধ্যে তা প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি প্রতি বছর ১.৩ মিলিয়ন যে ট্রাফিক ডেথ দেখা যায় তাও সার্স-কোভ-২-এর চেয়ে কম মারাত্মক বলে বিবেচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর ছয় কোটি মানুষ মারা যাবে হূদরোগ, ক্যান্সার, দুর্ঘটনা, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। প্রতি ২৫ জনে একজনের মৃত্যুতে ভূমিকা থাকবে করোনাভাইরাসের।

আর এটা কেবলই শুরু। এ মহামারী তখনই শেষ হবে যখন ভাইরাসটি সংক্রমিত করার জন্য আর কাউকে খুঁজে পাবে না। বর্তমানে সাত বিলিয়নের বেশি মানুষ রয়েছে যারা এখনো ভ্যাকসিনেটেড হয়নি এবং সংক্রমণে বেঁচে গিয়ে ইমিউনিটি প্রাপ্তও হয়নি।

তবে অন্য মহামারীর মতো এটা কেবল দরিদ্র দেশের বস্তিতে থাকা লোকজনকে সংক্রমিত করছে না। এটি সব জায়গায় আঘাত হেনেছে।

ভাইরাসের সঙ্গে বাঁচতে ও মরতে শেখা

প্রচুর মানুষ একাকী মরেছে এবং মরছে। যদিও নার্সরা হয়তো পিপিই পরে সেবা প্রদান করছেন। অনেক জায়গায়ই একসঙ্গে প্রচুর কবর তৈরি করা হয়েছে দাফনের জন্য। এমনকি আত্মীয়স্বজনকে শেষ বিদায়ের সুযোগও দেয়া হচ্ছে না।

সম্ভবত হয়তো ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতা নিয়ে অনেকগুলো ভ্যাকসিন আসবে এবং উন্নত ওষুধও হয়তো উপলব্ধ হবে। কিন্তু তার পরও ভাইরাসকে পুরোপুরি দূর করা অসম্ভব হবে। ফ্লু ও কোল্ড ভাইরাসের মতো এটি হয়তো স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। আমাদের শিখতে হবে এর সঙ্গে কীভাবে বাঁচতে হবে এবং কীভাবে এটি সঙ্গে নিয়ে মরতে হবে। অবশ্য বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও অনেকেই এর শক্তিকে বুঝতে রাজি নন।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

এ ভাইরাস আবার ব্যাপকভাবে ফিরে আসার কারণ হতে পারে তরুণদের বিশেষ সুবিধা লাভ করার বিষয়টি। কভিড-১৯ প্রাথমিকভাবে বেশি প্রাণ নিয়েছে বয়স্ক মানুষদের। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা ছিল। কভিড-১৯-এ মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি বাড়ে ৫০ বছর বয়সের পর থেকে। সেখানেও অধিক মৃত্যু হয়েছে ৭০-এর বেশি বয়সীদের।

তবে কেউই নিরাপদ বোধ করতে পারে না, কেবল ২০ কিংবা ৪০ বছর বয়সী বলে। যদিও এ বয়সের লোকজন অপেক্ষাকৃত কম উপসর্গসম্পন্ন। এর পরও কভিডে তরুণদের মৃত্যু হয়েছে। এমনকি শিশু-কিশোররাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঝুঁকি আরো বেড়ে যায় স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং যাদের ফুসফুসে সমস্যা আছে তাদের জন্য। আবার অনেক তরুণ রোগী সেরে উঠতে প্রচুর সময় নিচ্ছেন। আবার বেঁচে যাওয়া অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে অবসাদ, মাথাব্যথা, পেশির ব্যথা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। এই রোগ এমনকি স্থায়ীভাবে হূদযন্ত্র, রক্তনালি ও অন্যান্য স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

মাস্কের গুরুত্ব

আইএইচএমইর একটি মডেল বলছে, তাইওয়ান কভিড-১৯-এ বছরের শেষ পর্যন্ত গিয়ে ১০টি মৃত্যু দেখবে। এখন যতজন মরেছে তার চেয়ে তিনজন বেশি। উদাহরণস্বরূপ এখানে জার্মানির কথা বলা যায়। সিয়াটলের পরিসংখ্যানবিদরা জার্মানির চিত্রকেও খতিয়ে দেখেছেন। তাদের নিরবচ্ছিন্নভাবে বদলাতে থাকা মডেলের হিসাবে এ বছর হয়তো মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। এর কারণ হতে পারে বর্তমানে অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের নেয়া মাঝারি পদক্ষেপগুলো।

অবশ্য এখানেই উপসংহার টানা যায় না। প্রতিদিনই দেশটির সংক্রমণ বাড়ছে। অবশ্য আইএইচএমই বলছে, যদি জার্মানি সিঙ্গাপুরের মতো মাস্ক পরার বিষয়ে সজাগ থাকে, তবে বছর শেষে প্রায় ১৩ হাজার মৃত্যু আটকানো সম্ভব।

ভবিষ্যৎ মহামারী

অনেক অর্থ ব্যায়ের পর পোলিও বিলুপ্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, তবে এটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে সার্স-কোভ-২-এর ফলাফল হিসেবে। দরিদ্র দেশগুলো যেমন আফগানিস্তান, ইয়েমেন, দক্ষিণ সুদান ও হাইতি দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যা আরো ত্বরান্বিত হতে পারে করোনাভাইরাসের কারণে।

ধনী দেশগুলোও করোনাভাইরাসের ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পায়নি। অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা পিছিয়ে গেছে মহামারীর কারণে। গৃহ নির্যাতনও বেশ বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে মদ্যপানের অভ্যাস, হতাশা ও উদ্বেগও।

ডার স্পিয়েগেল থেকে সংক্ষেপে অনূদিত