দুনিয়ার দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে শীতল যুদ্ধ চলাকালে হাজির হয়েছে কভিড-১৯ নামের প্রাণঘাতী মহামারীটি। তবে বেইজিং ও ওয়াশিংটন এখন একই শত্রুর মোকাবেলা করছে। অবশ্য এ পরিস্থিতি দুই পক্ষের শীতল যুদ্ধের তীব্রতা হ্রাস করার বদলে বরং বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমবারের মতো চীনের ভুল তথ্য দেয়ার প্রচার রুশ মাধ্যমেও নেমে এসেছে। এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছিল আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মাঝে ট্রাম্পের জামাতা এবং ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত নিষেধ করার আগ পর্যন্ত ট্রাম্প এটিকে প্রতিহিংসাপরায়ণ চাইনিজ ভাইরাস নামে অভিহিত করে আসছিলেন।

কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করছেন, চীন করোনা যুদ্ধ জিততে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ভাইরাসটির উত্পত্তি উহানে হয়েছিল, সম্ভবত স্থানীয় কোনো বাজার থেকে। যেখানে বন্যপ্রাণী কেনাবেচা হয়ে থাকে কিংবা সেই শহরে থাকা কোনো একটি বায়োলজিক্যাল ল্যাব থেকে। কিন্তু যেভাবেই হোক, সংক্রামক এই ব্যাধিটি চীন সরকার দ্রুততম সময়ের মাঝে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এখন তারা ভার্চুয়াল লড়াইটাও নিজেদের পক্ষে আনতে চাচ্ছে। যেখানে নিজেদের উত্পীড়কের বদলে মানবজাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে।

আমি অবশ্য আস্থা রাখতে পারছি না। হ্যাঁ, এটা হয়তো চেরনোবিল নয়। ১৯৮৬ সালের সোভিয়েতের উল্টোধারায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা আছে ঝড় থামাতে এবং অর্থনীতির শিল্প মূলকে নতুন করে শুরু করতে। যদিও এমন কোনো সম্ভাব্য উপায় নেই, যেখানে চীন চাইলে এ বছর নিজেদের অর্থনীতিকে ২০১০ সালের দ্বিগুণ অবস্থায় নিতে পারে। যেজন্য প্রয়োজন ন্যূনতম ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। তবে কভিড-১৯ সেই লক্ষ্যে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হয়তো আরো অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার আধিপত্য অক্ষুণ্ন রেখে মহামারী আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসবে, এমনটা হওয়ার নয়। কারণটা এই নয় যে ট্রাম্প এই সংকট নিয়ে বিশৃঙ্খলভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন (যদিও তিনি তা দেখিয়েছিলেন)। বরং আরো বেশি ঝামেলার ব্যাপার ছিল ফেডারেল গভর্নমেন্টের একাংশের উপলব্ধি, যারা নিজেরাই এ সমস্যাকে ঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারেনি।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ ও হিউম্যান সার্ভিসের যে অংশটিকে মহামারী মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল, তারাও ব্যর্থ হয়েছে। কেবল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) নয়, বরং ফুড অ্যান্ড ড্রাগ, পাবলিক হেলথ সার্ভিস ও ন্যাশনাল ডিজাস্টার মেডিকেল সিস্টেমও ব্যর্থ হয়েছে।

আইন প্রণয়নের অভাবে এটা হয়েছে তেমন নয়। ২০০৬ সালে কংগ্রেস মহামারী ও সব বিপর্যয় মোকাবেলায় আইন পাস করে। যা ২০১৩ সালে একই নামে ফের অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর গত বছরও নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া আরো কিছু উদ্যোগ নেয়া হয় সম্ভাব্য এসব সংকট ঠেকাতে। কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র ছিল মহামারী মোকাবেলায় সবচেয়ে প্রস্তুতিসম্পন্ন দেশ।

আমেরিকার মতো বড় দেশ, যাদের কিনা এজেন্সি, আইন, প্রতিবেদন, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সব ছিল। কিন্তু যখন সত্যিকার অর্থেই সংকট এল, আতঙ্কের পর সবকিছু নিয়ে তারা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ল।

এদিকে আজ সংকটকালে যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতকের পুরনো পেন্ডেমিক প্লেবুকের পেছনে পড়ে আছে। যার ফলাফল হচ্ছে ভয়াবহ। সরকারের আদেশে অর্থনীতির বড় একটি অংশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি অর্থনৈতিক খাতগুলো খুলে দেবেন।  এ নিয়ে নানা প্রপাগান্ডাও শুরু করেছেন ট্রাম্প। অথচ পরীক্ষার পরিমাণ ও আক্রান্ত শনাক্তের জন্য ব্যবহার করা প্রযুক্তি বলছে না যে লকডাউন শেষ করার প্রয়োজন আছে। এ যেন সেই ট্রিলজির মতো, যেখানে আমেরিকান সাম্রাজ্য শেষ হওয়ার চিত্র।

প্লেগের ইতিহাস বলছে, দুর্বল দেশগুলোর সঙ্গে এটি বড় দেশগুলোর জন্য দুর্ভোগ ডেকে আনে। যেভাবে এনেছিল রোমান সাম্রাজ্যের জন্য। এমনকি চারলেমাগান থেকে নেপোলিয়নের সময় পর্যন্ত ইউরোপকে পুনরায় একত্র করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল বারবার মহামারীর ফিরে আসা এবং সীমান্ত দেয়ালের কারণে। যা কিনা ছোট ছোট পর্যায়ের রাজনীতিকে উৎসাহিত করেছে। তবে উনিশ ও বিশ শতকের পশ্চিম ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্য এক্ষেত্রে অন্য রকম ছিল। কারণ তারা কেবল স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেই জয় করেনি, বরং ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়াকেও জয় করতে সমর্থ হয়েছে।  

তবে পশ্চিমের যে আধিপত্য তা এখন অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতেও সক্ষম হয়নি। কারণ এটি ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে অধিক সংক্রামক ও মরণঘাতী।

গত বছর গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি ইনডেক্সের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল এক নম্বরে এবং যুক্তরাজ্য ছিল দুইয়ে। যা ছিল ভুল। করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যনিরাপত্তার দিক থেকে এখন ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, হংকং ও তাইওয়ান হচ্ছে সবার ওপরে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে করোনা মোকাবেলায় ছোট দেশগুলো সার্স ও মার্সের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র, চায়না ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো নিতে পারেনি।

এখন চলমান মহামারীর রাজনৈতিক ফলাফল কী হতে পারে? শি তার প্রতিদ্বন্দ্বী দল দ্বারা সিংহাসনচ্যুত হওয়ার চেয়ে নভেম্বরে ট্রাম্পের হারার সম্ভাবনা বেশি, এ ফলাফলের ওপর আপনি চাইলে বাজিও ধরতে পারেন। যা কিনা ১৯২০ সালে যুদ্ধ ও ইনফ্লুয়েঞ্জা-পরবর্তী সময়ে ওয়ারেন হার্ডিংয়ের সঙ্গে হয়েছিল।

তবে এমন নয় যে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের কেউ একজন জিততে পারবেন। জিতবে মূলত সিটি স্টেটগুলো। আর অবশ্যই ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান ভালো ফলাফল দেখালেও তারা বড় শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এই মহামারী মোকাবেলা করে ভালো কিছু অর্জন করবে? ছোট দেশগুলো করবে। যা কিনা এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করবে। যার ফলে এক দলের এককেন্দ্রিক যে হুমকি তা অনেকটাই বিকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে।

দ্য স্পেক্টেটর থেকে সংক্ষিপ্ত অনুবাদ