ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে আরোপিত লকডাউন তুলতে শুরু করেছে। পুরোপুরিভাবে না হলেও, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এরই মধ্যে কাজে ফিরতে শুরু করেছে অনেকে। তবে এর মাঝে লকডাউন তুলে দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের চেয়ে জার্মানি কিছুটা এগিয়ে আছে। কেবল তাই নয়, জার্মানিতে সামাজিক দূরত্ব মানার যে নিয়ম তাও অনেকটা শিথিল হয়ে এসেছে। লোকজনকে বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হতেও দেখা যাচ্ছে। যদিও লকডাউন তুলে দেয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দেশের জনগণ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।
একদল ভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকার কর্তৃক আরোপিত বিধিনিষেধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আর অন্য পক্ষ লকডাউনে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একদল বলছে, সবকিছু আগের মতো করে দিতে, কারণ তারা আর গৃহবন্দি হয়ে থাকতে রাজি নয়। আবার অন্যদলের মত হচ্ছে, দায়িত্বজ্ঞানহীন কিছু মানুষের কারণে বাকিরাও বিপদে পড়তে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এটা অবশ্য কেবল জার্মানির চিত্র নয়। লকডাউন নিয়ে গোটা ইউরোপই একরকম বিভক্ত। কেউ এখনই লকডাউন তুলে দেয়ার পক্ষে, আবার কেউ বিপক্ষে।
বিতর্ক
লকডাউন তুলে দেয়ার বিষয়টি জার্মানিতে কয়েকদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কভিড-১৯-এর কারণে আরোপিত সামাজিক দূরত্বের নীতি কেবল মানুষের মাঝে দূরত্বই তৈরি করছে না, বরং কাছের মানুষকেও দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য করছে। তবে সম্প্রতি ক্রিস্টোফার লুয়ের নামে এক ব্যক্তির তোলা একটি ফটোগ্রাফ বেশ আলোচনায় এসেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে বার্লিন পার্কে একশর বেশি মানুষ একত্র হয়েছে। আলোচিত এই ছবি নিয়ে লুয়ের বলেন, ‘আমি কেবল বাজার করতে ও হাঁটার জন্য বের হই। যখনই বের হই, মাস্ক পরা থাকি। আমি আমার চলাফেরা সীমিত করেছি এবং এই মহামারীকে সিরিয়াসলি নিয়েছি। কিন্তু তারা পার্কে বসে বিয়ার পান করছে।’
এ ঘটনায় নিজের বিস্ময় প্রকাশ করতে ভোলেননি তিনি।
সব মিলিয়ে ইউরোপে দুই পক্ষের ক্রোধও ভাইরাসের মতো তীব্রতা নিয়ে বেড়ে চলেছে, যা সমাজকেও বিভক্ত করে ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। লকডাউনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে। সে সঙ্গে জনজীবন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার কারণে হতাশাও বেড়ে চলেছে। যাদের বাধ্য হয়ে লকডাউনে থাকতে হচ্ছে তারা আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। তাদের এই আগ্রাসী মনোভাব আবার বিশেষ করে যারা মানছে না তাদের ওপর।
এদিকে ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক দেশ বাজেভাবে করোনা আক্রান্ত হলেও জার্মানি তুলনামূলকভাবে ভালো ফল দেখিয়েছে। জার্মানির নেয়া পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও অনেক প্রশংসিত হয়েছে। তাদের মৃত্যুহারও অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্স, ইতালি কিংবা স্পেনের পরিস্থিতি একটা ভালো নয়। এই দেশগুলোর অবস্থা বেশ খারাপের দিকে মোড় নিয়েছিল। তাই তাদের লকডাউন জার্মানির চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। যেখানে কাউকে ঘর থেকে বের হতে হলেও অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন ছিল। তাই জার্মানির লকডাউন নীতি কিছুটা সহনীয় ছিল। যা এখন ধীরে ধীরে উঠেও যাচ্ছে।
শুরুর দিকে অবশ্য বিধিনিষেধের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। কিন্তু এখন এসে অনেকে প্রশ্ন করছে আর কত? এর কি আসলেই কোনো লাভ হচ্ছে? অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, ইন্ডাস্ট্রিগুলোর অবর্ণনীয় ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি এর কারণে পারিবারিক ও মানসিক জটিলতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক জায়গায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও শুরু হয়েছে। যা সামনে হয়তো আরো বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে এসবের মাঝেই জার্মানি লকডাউন তুলতে শুরু করেছে। ফ্রান্স অবশ্য আরেকটু অপেক্ষা করতে চাইছে। ১১ মে থেকে লকডাউন শিথিল করার প্রক্রিয়া শুরুর কথা বললেও সেটি অবশ্য তখনই করা হবে যদি আক্রান্তের সংখ্যা দিনপ্রতি ৩ হাজারের নিচে নামে। অবশ্য লকডাউন তুললেও তা করা হবে ধীরে ধীরে। অন্যদিকে করোনায় বিপর্যস্ত ইতালি ৪ মে থেকে ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করেছে। তারাও ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। স্পেন এরই মধ্যে শিশুদের এক ঘণ্টার জন্য বাইরে আসার অনুমতি দিয়েছে। যদিও অনেক সচেতন মানুষ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লকডাউন তুলে দেয়ার বিপক্ষে। কারণ একটা ভুল দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ভয়ংকরভাবে ফিরিয়ে আনতে পারে কভিড-১৯ কে।
প্রতিবাদ
জার্মানিতে লকডাউন তুলে দেয়া নিয়ে বেশ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। প্রতি শনিবার রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে লকডাউন তুলে দেয়ার দাবি জানাত। কেউ কেউ এর নামও দিয়েছিল ‘হাইজিন প্রোটেস্ট’। যদিও এর সঙ্গে হাত ধোয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। অনেক আন্দোলনকারীর ধারণা, এসব বিধিনিষেধ সংবিধানের অবমাননা। জার্মানির এই চিত্র অবশ্য ইউরোপের অন্যান্য দেশেও দেখা যেতে পারে। কারণ ভাইরাস থেকে বাঁচতে গিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই ভাইরাসের প্রকোপ একটু কমে এলেই হয়তো সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইবে, সেক্ষেত্রে সরকারগুলো কঠোর হলে এমন আন্দোলন সংগ্রাম সেখানেও ফিরে আসতে পারে।
‘ভাইরাস খুন করুন, ব্যবসা না’
জার্মানির হামবুর্গের এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সম্প্রতি ফেসবুক পেজে লিখেন ‘ভাইরাসকে হত্যা করুন, আমাদের ব্যবসা না।’
তবে এটি কেবল জর্গ মেয়ের নামের সে ব্যবসায়ীর একার কথা না। ইউরোপজুড়ে এখন ব্যবসা-বাণিজ্য একরকম স্থবির হয়ে আছে। এরই মধ্যে বিশাল পরিমাণে ক্ষতি হয়ে গেছে, তবে লকডাউন যত দীর্ঘায়িত হবে ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে থাকবে। যে কারণে ইউরোপজুড়ে ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে যা আরো বাড়তে পারে।
অসামঞ্জস্য
অনেক ডাক্তার ও মনোবিদ এখন প্রশ্ন তুলেছেন রাজনীতিবিদদের নেয়া এসব বিধিনিষেধ আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা সেটা নিয়ে। সান্তিয়াগো ইউগ নামে এক ডাক্তার বলেন, আমি মনে করি না লকডাউন চালিয়ে যাওয়ার ফলাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ভয়ংকর পরিণতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, কভিড-১৯ কে একমাত্র হুমকি হিসেবে বিবেচনা না করে অনেকগুলো হুমকির একটি হিসেবে নেয়া উচিত। ডাক্তারদের এমন মন্তব্য নিশ্চিতভাবেই চলমান বিতর্ককে নতুন করে উসকে দেবে।
কমতে থাকা সমর্থন
সরকারগুলো এখন আপসের পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। তাদের মহামারীর সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি এর ফলস্বরূপ অন্যান্য যেসব ক্ষতি তাকেও কমানোর করার চেষ্টা করতে হচ্ছে। এর ফল কেমন হতে যাচ্ছে, তা আদৌ নিশ্চিত না। যদিও জার্মানিসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের নেয়া ব্যবস্থাগুলো এখন সমর্থন হারাচ্ছে এবং অনেকেই অনিরাপদ বোধ করতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে মহামারীর ক্ষতি কমিয়ে লকডাউন তুলে দেয়ার যে প্রক্রিয়া তা সরকারগুলোকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে যাচ্ছে।
ডার স্পিগেল ও ডয়েচে ভেলে অবলম্বনে





