গত সপ্তাহে যখন খবর এল হংকংয়ের এক ব্যক্তি কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার কয়েক মাস পর ফের আক্রান্ত হয়েছেন, ইমিউনোলজিস্ট আকিকো ইউয়াসাকির প্রতিক্রিয়া একটু ভিন্ন ছিল। তিনি বলেন, আমি একরকম খুশিই হয়েছিলাম। ইমিউন প্রতিক্রিয়া কীভাবে কাজ করে তার জন্য এটি ছিল দারুণ একটি উদাহরণ।
কানেটিকাটের নিউ হেভেনের ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে ইমিউন প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন ইউয়াসাকি। এই কেসটি তার জন্য উৎসাহজনক ছিল, কারণ দ্বিতীয় সংক্রমণটি লক্ষণ দেখায়নি। তার মতে, মানুষটির ইমিউন সিস্টেম নিশ্চয় ভাইরাসের সঙ্গে আগের লড়াইটিকে মনে রেখেছে এবং সেটি সক্রিয় হয়ে সামনে এসেছে। পাশাপাশি এটি পুনঃসংক্রমণকে খুব বেশি ক্ষতিসাধন করার আগে থামিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু এক সপ্তাহ পরই তার মেজাজ বদলে গেল। নেভাদাতে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আরো একটি পুনঃসংক্রমণের কথা জানান। তবে এবার সেটি আরো বেশি মারাত্মক ছিল। এটা কি সম্ভব যে ইমিউন সিস্টেম ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে কেবল ব্যর্থই হয়নি, বরং সবকিছু আরো খারাপ করে ফেলেছে? তিনি বলেন, নেভাদার ঘটনা আমাকে আনন্দিত করতে পারেনি।
কভিড-১৯ মহামারীকালে উপখ্যানের এ পরিবর্তন খুবই নৈমিত্তিক ব্যাপার এবং ইউয়াসাকি জানেন, তিনি মাত্র কয়েকটি কেস বিশ্লেষণ করে সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ইমিউন প্রতিক্রিয়া নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন না। কিন্তু ইউয়াসাকি এবং অন্য বিশেষজ্ঞরা জানেন যে সামনের দিনগুলোতে আরো অনেক পুনঃসংক্রমণের ঘটনা দেখতে হবে। পাশাপাশি এ সময়ের মাঝে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে মহামারীর শেষের জন্য ইমিউন সিস্টেমের ওপর নির্ভর করা যাবে কিনা।
পুনরায় সংক্রমণ কতটা সাধারণ ব্যাপার?
সম্ভাব্য পুনঃসংক্রমণের ঘটনা নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলাপ হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধানগুলো সম্ভবত দ্বিতীয় সংক্রমণ প্রথমটির ধারাবাহিকতা, এই ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করছে।
একই ব্যক্তির আলাদা দুটি সংক্রমণের ঘটনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হংকং ও নেভাদা উভয় ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় সংক্রমণের ভাইরাল জিনোমের সিকোয়েন্স করা হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই ভাইরাসের আলাদা রূপের উপস্থিতির ব্যাপারটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য ছিল।
কিন্তু কেবল দুটি উদাহরণ দিয়ে এটা স্পষ্ট হওয়া কঠিন যে বারবার পুনঃসংক্রমণ ঘটে কিনা। এখন পর্যন্ত গোটা পৃথিবীতে ২৬ মিলিয়ন লোক করোনায় সংক্রমিত হয়েছে, যার মাঝে অল্প ক’টি পুনঃসংক্রমণের ঘটনা এখনো সম্ভবত উদ্বেগের কারণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন ভাইরোলজিস্ট থমাস গিয়েসবার্ট। তিনি বলেন, এটি কতটা প্রভাবশালী তা জানতে আমাদের আরো অনেক তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
তথ্য হয়তো আমাদের সীমার মাঝেই আছে: সময় ও সংস্থানকে একত্র করতে পুনঃসংক্রমণের আরো দৃষ্টান্তগুলো জড়ো করতে সক্ষম। সংক্রমণের প্রাথমিক ঝড়ের পর যথেষ্ট সময় এরই মধ্যে পার হয়েছে। কোনো কোনো অঞ্চল নতুন প্রাদুর্ভাবের সামনে পড়েছে, যা কিনা মানুষকে পুনরায় ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। টেস্টিং এখন আরো দ্রুত ও উপলব্ধ হয়েছে। হংকংয়ের লোকটি সংক্রমিত হয়েছে স্পেন ভ্রমণ করার পর এবং হংকং ফেরার পথে এয়ারপোর্টে তার সার্স-কোভ-২ ধরা পড়েছে।
জনস্বাস্থ্যের ল্যাবরেটরিগুলোতে বিজ্ঞানীরা নিজেদের পায়ের নিচে জমি খুঁজে পেতে শুরু করেছেন, বলেছেন নেভাদা স্টেটের জনস্বাস্থ্য ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর মার্ক পানডোরি। মহামারীর শুরুর দিকে পুনঃসংক্রমণ শনাক্ত করা বেশ কঠিন ছিল, যখন কিনা ল্যাবগুলো উপচে পড়েছে। তবে পানডোরি বলেছেন, এখন তার ল্যাব নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং সিকোয়েন্সিং সুবিধাও তৈরি করেছে। এর ফলে এখন পুনঃসংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হয়েছে।
পুনঃসংক্রমণ কি প্রথমবারের চেয়ে বেশি তীব্র হয়?
ভাইরোলজিস্ট জোনাথন স্টোয়ি ইউয়াসাকির মতো হংকংয়ের পুনঃসংক্রমিত ব্যক্তিটির লক্ষণহীন থাকার ঘটনা খুশি হতে পারেননি। তিনি বলেন, একটি কেস থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছা কঠিন। আমি নিশ্চিত না যে এটা আসলে একেবারেই কোনো কিছু বোঝায় কিনা।
স্টোয়ির মতে, কভিড-১৯-এর তীব্রতা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। এমনকি একই ব্যক্তির মাঝে আলাদা আলাদা সংক্রমণও পৃথক হতে পারে। তাছাড়া ভাইরাসের প্রাথমিক ডোজ, সার্স-কোভ-২-এর বিভিন্ন রূপের মাঝে সম্ভাব্য পার্থক্য এবং একজন ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পুনঃসংক্রমণের তীব্রতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি বলেন, সংক্রমণের আগের সময়ে যতটা অজানা বিষয় ছিল, পুনঃসংক্রমণ নিয়েও তা আছে।
দ্বিতীয় সংক্রমণের সময় ইমিউনোলজিক্যাল মেমোরি উপসর্গকে প্রভাবিত করে কিনা তা জানা ভ্যাকসিনের বিকাশের জন্য জরুরি। যদি দ্বিতীয়বার উপসর্গ হ্রাস পায়, যেমনটা হংকংয়ের ব্যক্তিটির ক্ষেত্রে হয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে ইমিউন সিস্টেম তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে যেমনটা দেখানো উচিত।
কিন্তু যদি উপসর্গ ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় সংক্রমণের সময় খারাপ হয়, যেমনটা নেভাদার ব্যক্তিটির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাহলে বুঝতে হবে ইমিউন সিস্টেম হয়তো ব্যাপারগুলো আরো খারাপ করে দিয়েছে, বলছিলেন ইমিউনোলজিস্ট গ্যাব্রিয়েলে বেলজ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো কোনো কেস মারাত্মক রূপ লাভ করে বাজে ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারণে, যা কিনা স্বাস্থ্যবান টিস্যুকে ধ্বংস করে।
আরেকটি সম্ভাবনা হচ্ছে সার্স-কোভ-২-এর প্রতিক্রিয়ায় যে অ্যান্টিবডি উত্পন্ন হয় তা লড়াই করার পরিবর্তে দ্বিতীয় সংক্রমণের সময় সাহায্য করে। এ ফেনোমেনন যা অ্যান্টিবডি-নির্ভর বর্ধক হিসেবে পরিচিত, তা দুর্লভ। কিন্তু গবেষকরা মারাত্মক তীব্র শাসতন্ত্রের সমস্যার জন্য দায়ী সম্পর্কিত করোনাভাইরাসগুলোর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টার সময় উদ্বেগের কারণ খুঁজে পেয়েছিলেন।
পুনঃসংক্রমণ ভ্যাকসিনের সম্ভাবনায় কেমন প্রভাব ফেলতে পারে?
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ম্যালি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে যে ভ্যাকসিন তৈরি করা সহজ ছিল সেগুলো এমন রোগের বিরুদ্ধে ছিল, যেখানে প্রাথমিক সংক্রমণ স্থায়ী ইমিউনিটির দিকে চালিত করে। উদাহরণ হিসেবে হাম ও রুবেলার কথা বলা যায়।
তবে পুনঃসংক্রমণের সক্ষমতা বলতে এটা বোঝায় না যে সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন কার্যকর হবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য ‘বুস্টার’
শটেরও প্রয়োজন হয়।
পোভোরাওয়ান বলেন, পুনঃসংক্রমণ থেকে শিক্ষা নিতে পারলে তা ভ্যাকসিনের বিকাশে গবেষকদের সহায়তা করবে। এটি করা যাবে কোন ইমিউন প্রতিক্রিয়া ইমিউনিটি বজায় রাখার জন্য জরুরি, সে সম্পর্কে শিক্ষা নিয়ে। উদহারণস্বরূপ গবেষকরা দেখা গেল বের করলেন যে অ্যান্টিবডি নির্দিষ্ট মানের নিচে নেমে যাওয়ার ফলে লোকজন পুনরায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে তারা এ বিষয়টাকে মাথায় রেখে নিজেদের ভ্যাকসিনেশনের কৌশল গ্রহণ করতে পারে। সম্ভবত বুস্টার শট দিয়ে অ্যান্টিবডি লেভেল ধরে রাখা যেতে পারে।
নেচার থেকে সংক্ষেপে অনূদিত





