নভেল করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন। অফিসগুলোকেও এ সময় নিজেদের কাজ, ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপকভাবে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এখন কীভাবে ও কখন অফিসগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে, তা নিয়েও চলছে নানা জল্পনাকল্পনা। করোনাভাইরাসের নজিরবিহীন এ সময়ে এসে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার বিষয়টি বেশ উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। কর্মচারীদের ফের অফিসে ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে এখন সবকিছু নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মূলত অনেকগুলো বিষয় জড়িত। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে একই রুমের ভেতর কীভাবে ডেস্ক সাজানো যাবে, সে বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। এছাড়া কর্মীদের সপ্তাহের সব কর্মদিবসে অফিসে আনার প্রয়োজন আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। 

অনেক কোম্পানি এখন কর্মীদের একাংশকে কিছু সময়ের জন্য বাসায় বসে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে খুব সাবধানী হয়ে চিন্তা না করলে কোম্পানিগুলোর মাঝপথে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তখন চিরায়ত অফিস করার যে ধরন সেটি কিংবা কর্মীদের বাসায় রেখে অফিস করার যে ধারণা, কোনোটাই ঠিক সুবিধা দেবে না।

‘ছয় ফুট’ অফিস-সংক্রান্ত যে ধারণা তার কথাই না হয় ধরা যাক। এ ধারণাটি বিকশিত হয়েছে বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট বহুজাতিক কোম্পানি কাশম্যান ও ওয়েকফিল্ড দ্বারা। তাদের লক্ষ্য ছিল কর্মীদের মধ্যে সব সময় ছয় ফুট দূরত্ব রাখা। এটা করা হয়েছে মূলত ডেস্কগুলোর মাঝে দূরত্ব তৈরি, মানুষ চলাচলের জন্য একমুখী রাস্তা তৈরি এবং প্রতিটি ডেস্কের চারপাশে ভিজ্যুয়াল চিহ্ন দেয়া, যাতে লোকেরা তাদের দূরত্ব বজায় রাখার কথা মনে রাখতে পারে।

তবে এখানে ধারণাটি ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ কারস্টিন সেইলার যেমনটা বলেন, দূরত্ব যুক্ত এ আসবাবপত্র, স্পর্শহীনতা এবং অতি সতর্কবার্তা ব্যাহত করতে পারে সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে। এমনকি অফিসের মধ্যকার যোগাযোগও চলে যেতে পারে অনলাইনে। যদি বিষয়টি এমনই হতে হয়, তাহলে বাসা থেকে বসে কাজ করলেই বা কী সমস্যা, এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করবে।

কোম্পানিগুলোকে কভিড-১৯-এর কারণে যে লকডাউন দেখতে হয়েছে তা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে হবে, জুম আশ্চর্যজনকভাবে ভালো কাজ করে। কিন্তু এখনো অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের এমন অনেক সুবিধা রয়েছে, যা কিনা আগে থেকে ঠিক করে রাখা ভিডিও কল দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা যায় না। এটি মাথায় রেখেই দুটি জগতের জন্য একটি হাইব্রিড সিস্টেমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যদি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কম কর্মী অফিসে আসে তবে যেটা সেরা উপায়। সে সঙ্গে অফিসের ভেতর বিন্যাস এমন হতে হবে যেন তা কর্মীদের একজনকে আরেকজন থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে যোগাযোগে কাছাকাছি রাখে।

পরিকল্পিত বনাম অপরিকল্পিত যোগাযোগ

কাজের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিত যোগাযোগের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। অপরিকল্পিত যোগাযোগে কারো সঙ্গে আমার আকস্মিক দেখা হতে পারে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলাপ হতে পারে। এটুকু নৈকট্যের সম্ভাবনা বজায় রাখাও জরুরি।

এর কারণ বিভিন্ন দল সচরাচর একই কাজের অংশ হয় না। ফলে এক্ষেত্রে যোগাযোগ একে অন্যের কথা শোনা বা করিডোরে হঠাৎ মুখোমুখি দেখা হওয়ার মতো অপরিকল্পিত মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। এর ফল সত্যিকার অর্থে লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকছে। সাম্প্রতিক একটি বইয়ে যেমনটা বলা হচ্ছিল যে ওয়াল স্ট্রিট ট্রেডিং ফ্লোরে কাছাকাছি ডেস্কগুলোর মাঝে অপরিকল্পিত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া অর্থনৈতিক মডেলগুলোতে দারুণ উন্নতি দেখিয়েছে।

পরিকল্পিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে দূরবর্তী জায়গা থেকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন নৈকট্যকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর কারণ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর মাঝে যোগাযোগ সাধারণত পূর্বপরিকল্পিত এবং নিয়মমাফিক হয়ে থাকে। তাই যা প্রয়োজন তা হলো একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম।

এই বার্তাটি এসেছে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সিস্টেমিক রিস্ক সেন্টার থেকে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক জেপি মর্গানের রেটস ট্রেডিংয়ের গ্লোবাল হেড চার্লস ব্রিস্টো বলেন, একদল ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট পণ্য নিয়ে একসঙ্গে ব্যবসা করছে, একই চ্যানেল দিয়ে পণ্য আনা-নেয়া করছে এবং একই সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। এ কারণে দূর থেকে যোগাযোগ অবিশ্বাস্যভাবে এখন সহজ এবং আরো বেশি উপযোগী হতে পারে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শারীরিক নৈকট্য অপরিকল্পিত যোগাযোগের জন্য প্রাথমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হচ্ছে দূরবর্তী অবস্থা থেকে করা কাজগুলো পরিকল্পিত যোগাযোগের মাধ্যমে করা যেতে পারে।

এখন যদি কোম্পানিগুলো কিছু মানুষকে অফিসে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চায়, তবে তাদের অন্তত প্রতিটি দলের একজনকে অফিসে আনতে হবে। এর ফলে দলগুলোর মাঝে আন্তঃযোগাযোগ সম্ভব হবে, যা কিনা শারীরিক নৈকট্যের ওপর নির্ভর করছে।

সবাইকে যুক্ত রাখা

অফিস ডিজাইনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, কর্মচারীদের সুবিধার্থে, যেমন কর্মীরা একে অন্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ডেস্ক ছেড়ে উঠে আসে কিনা তা। এটা গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সহকর্মীদের মাঝে এবং কোম্পানির সংস্কৃতির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ার জন্য।

এ সুবিধার জন্য সামাজিক দূরত্বের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে দূরত্ব ও প্রবেশযোগ্যতার ওপর পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। দূরত্ব হ্রাস করতে হবে সেই পরিমাণে যেন মানুষ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং সহায়তা করতে পারে। স্থাপত্যসংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবেশের সহজতা ও চলাচলকে সহজ করা সম্ভব হলে কিছুটা হলেও দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে।

সেলার যেমনটি বলছেন যে ঘরের মাঝে প্রতিটি রুমের একটি দরজা দিয়ে অন্য ঘরে প্রবেশ করা যাবে। এটি একটি নির্দিষ্ট রুমসংলগ্ন প্রবেশপথ থাকার চেয়ে বেশ ভালো উপায়। মানুষের মাঝে একই মাত্রার দূরত্বে যুক্ত হওয়া বিষয়টিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে পারে।

এ সংযুক্ততা অর্জন করার জন্য (সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সময়) কোম্পানিগুলো কিছু ডেস্ক সরিয়ে নিতে পারে এবং পরিধির মাঝে একটি করিডোর তৈরি করতে পারে, যা কিনা কর্মীদের মাঝে একের অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে অধিকতর সহজ করে দেবে। যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়াগুলো আরো ভালোভাবে করা যেতে পারে বাইরের করিডোরের কোনো একটি কর্নারে। এর ফলে চলাচলের রাস্তা না আটকেই কর্মীরা নিজেদের মাঝে দ্রুত যোগাযোগ সেরে নিতে পারে।

এছাড়া কয়েক মাস পর অফিসে ফেরার কারণে কোম্পানিগুলোও সুযোগ পাচ্ছে নিজেদের সেটআপকে নতুন করে আরো কার্যকর রূপে সাজিয়ে নিতে।

স্ক্রলডটইন