নভেল করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার হিসাবে শীর্ষে রয়েছে দেশটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটির এমন ভয়াবহতার কারণ কী? দেশটির দক্ষিণ ডাকোটায় এমন প্রাদুর্ভাবের পেছনে অন্যতম একটি কারণ হিসেবে শূকরের মাংস প্রক্রিয়াজাত একটি কারখানাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্মিথফিল্ডের এ কারখানা থেকে ভাইরাসটির সংক্রমণ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তবুও রাজ্যটিতে এখন পর্যন্ত বাড়িতে থাকার কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়নি।

২৫ মার্চ বিকালে দক্ষিণ ডাকোটার বাসিন্দা জুলিয়া (ছদ্মনাম) ল্যাপটপ খুলে তার একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লগইন করে। সে স্কুলে থাকাকালে তার পছন্দের ছেলেদের পর্যবেক্ষণ করতে অ্যাকাউন্টটি খুলেছিল। কিন্তু বহু বছর পর এ অ্যাকাউন্টটি গুরুতর উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে চলেছে। সে অর্গাস লিডার নামের স্থানীয় একটি পত্রিকার ফেসবুকভিত্তিক অ্যাকাউন্ট ‘অরগাস৯১১’ নামের অ্যাকাউন্টে মেসেজ করে, ‘অনুগ্রহ করে আপনারা কি স্মিথফিল্ড কারখানার দিকে নজর দিতে পারেন। কারখানাটিতে কভিড-১৯ আক্রান্ত কর্মী রয়েছে এবং তবুও সেটা খোলা রাখার পরিকল্পনা হয়েছে।’

‘অর্গাস৯১১’ অ্যাকাউন্ট থেকে রিপ্লে আসে ‘তথ্যটি জানানোর জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কভিড-১৯ আক্রান্ত কর্মীরা কারখানার কোন কাজে যুক্ত রয়েছে?’ জুলিয়া রিপ্লে দেয়, ‘আমরা ঠিক নিশ্চিত নই।’ উত্তরে অর্গাস৯১১ থেকে রিপ্লে আসে, ‘ঠিক আছে, ধন্যবাদ। আমরা যোগাযোগ রাখব।’

স্মিথফিল্ড বলতে জুলিয়া দক্ষিণ ডাকোটার সিউক্স ফলস শহরে অবস্থিত ‘স্মিথফিল্ড ফুডস পর্ক-প্রসেসিং প্লান্ট’র কথা উল্লেখ করেছিল। বিগ সাউক্স নদীর তীরে বিশাল আটতলা ভবনের এ কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের নবম বৃহত্তম শূকর প্রক্রিয়াকরণ কারখানা। সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে চললে কারখানাটি প্রতিদিন ১৯ হাজার ৫০০ শূকর প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। ৩ হাজার ৭০০ কর্মীর সংখ্যার দিক দিয়েও কারখানাটি শহরের চতুর্থ বৃহত্তম।

পরের দিন ২৬ মার্চ সকালে অর্গাস লিডারের অনলাইনে সংবাদটি প্রকাশ করা হয়। ‘স্মিথফিল্ড কারখানার কর্মীরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত’। সংবাদের প্রতিবেদককে কারখানার একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, তাদের একজন কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, তিনি ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে ছিলেন এবং তার কাজের স্থান ও অন্য সাধারণ স্থানগুলো স্যানিটাইজ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘জরুরি অবকাঠামো শিল্প’ হিসেবে বিবেচিত কারখানাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকবে।

কারখানাটি খোলা রাখার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়ে ১৯ মার্চ স্মিথফিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলিভান অনলাইনে একটি ভিডিও বার্তায় জানান, খাদ্য আমাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অঙ্গ এবং ৪০ হাজার আমেরিকান আমাদের গ্রাহক। হাজার হাজার আমেরিকান কৃষক আমাদের সরবরাহ প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছে।

এদিকে জুলিয়া ওই প্রতিবেদককে প্রতিনিয়ত সতর্ক করে যাচ্ছিল। ‘আমি শুনেছি বিশেষভাবে স্মিথফিল্ডের সঙ্গে সংযুক্ত মানুষরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।’ যদিও এটা শোনা কথা। কারণ জুলিয়া সেখানে কাজ করে না। সে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। কভিড-১৯ মহামারীতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়ায় সে বাড়িতে অবস্থান করছে। তার বাবা-মা দুজনই স্মিথফিল্ডের কারখানার কর্মী। কারখানায় কী ঘটছে, তা প্রতিদিন বাবা-মার থেকে শোনে জুলিয়া। তারা অভিবাসী। জুলিয়া বলে, ‘আমার বাবা-মা ইংরেজি জানে না। তারা নিজেদের জন্য আইনজীবীও পাবে না। চাকরি যাওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়েই তাদের কাজে যেতে হচ্ছে। গিজগিজ করা মানুষের সঙ্গে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। তাই তাদের হয়ে কাউকে কথা বলতে হবে।’

এই সময়ে স্মিথফিল্ডের কারখানার কর্মীদের আক্রান্তের শনাক্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে—৮০ থেকে ১৯০, এরপর ২৩৮ জন...। দক্ষিণ ডাকোটার গভর্নরের কার্যালয়ের চাপের মুখে অবশেষে গত ১৫ এপ্রিল স্মিথফিল্ড তাদের কারখানা পূর্ণাঙ্গভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ততদিনে কারখানাটি যুক্তরাষ্ট্রের করোনাভাইরাসের হটস্পট হয়ে ওঠে। এখন পর্যন্ত স্মিথফিল্ডের কর্মীদের মধ্যে ৬৪৪ জন ভাইরাসটিতে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। আর তাদের থেকে ছড়িয়েছে পুরো রাজ্যে। রাজ্যটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের ৫৫ শতাংশ স্মিথফিল্ডের এ কারখানার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

স্মিথফিল্ডের কর্মী বাহিনী মূলত মিয়ানমার, ইথিওপিয়া, নেপাল, কঙ্গো ও এল সালভাদোরের মতো দেশ আসা শরণার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত। কারখানাটিতে তারা ৮০টিরও বেশি ভাষায় কথা বলে। গড়ে প্রতি ঘণ্টায় তাদের মজুরি দেয়া হয় ১৪ থেকে ১৬ ডলার। তাদের কাজের সময় দীর্ঘ, কাজটি হতাশাজনক এবং উৎপাদন লাইনে উভয় পাশে তাদের সহকর্মীরা এক ফুটেরও কম দূরত্বে কাজ করে।

বিবিসি কারখানাটির ছয়জনের বেশি কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রথম থেকেই কাজ করতে তারা ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু কর্মসংস্থানের কথা ভেবে বাধ্য হয়েই তাদের কাজ করতে হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, স্মিথফিল্ড ফুডসের মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট এবং শিকাগোর কুক কাউন্টি জেল থেকে ছাড়িয়ে গেছে।

হাসপাতালে স্মিথফিল্ডের কারখানার প্রথম কর্মী মারা যাওয়ার পর এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়।

বিবিসি অবলম্বনে