ওয়াশিংটন পোস্টে হ্যারি স্টিভেন্স কর্তৃক একটি অনলাইন সিমুলেশন প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখানো হয় কিভাবে একটি শহরে ভাইরাস অতি সহজেই এক জনের সংস্পর্শে থেকে অন্যজনের সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম হয়। প্রকাশিত সিমুলেশনে, তিনটি রং দ্বারা তিন প্রকারের বিন্দু নির্দেশ করেন। একেক রকম বিন্দু একেক প্রকারের মানুষের উপস্থিতি জানান দেয়। সবুজ রং সুস্থ মানুষের প্রতীক, লাল রং ভাইরাস কর্তৃক সংক্রমিত মানুষ এবং পিংক রং ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পুনরায় সুস্থ হয়ে ফিরে আসা মানুষের প্রতীক।
প্রথমত বিন্দুগুলো একে অপরের চারদিকে ঘুরতে থাকে। বিভিন্ন রং যখন একে অপরকে স্পর্শ করে বা ধাক্কা দেয় তখন লাল রংয়ে স্পর্শীত অন্য বিন্দুটি লাল বর্ণ ধারণ করে। লাল রংয়ের উপস্থিতি দ্বারা সংক্রমিত মানুষের উপস্থিতি বুঝিয়েছেন।বাস্তবিকপক্ষে Social Distancing বা সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখলে এভাবেই নির্দিষ্ট কোন জায়গায় বা কোন গোষ্ঠির মাঝে সংক্রমনের মাত্রা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কিন্তু সংস্পর্শে না এসে যদি প্রতিটি সবুজ এবং পিংক রঙের বিন্দু লাল রঙ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ঘুরতে থাকে তবে সম্পূর্ণ ক্ষেত্রটি লাল রং হয়ে উঠতে বিলম্বিত হয় বা কমতে শুরু করে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও কমতে থাকে।
প্রকাশিত সিমুলেশনের পর্যায়কে সংক্রমিত মানুষের সাথে অন্যান্য মানুষের Social Distancing বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। লাল রং বা সংক্রমিত মানুষ থেকে যত দূরে অবস্থান করা যায় সংক্রমণের ঝুঁকি তত কম। আবার লাল রং বা সংক্রমিত মানুষের কাছে অবস্থান করলে বা সংস্পর্শে আসলে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাই নির্দেশ করে।
রোগবিস্তার বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে সামাজিক দূরত্ব স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্ব সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমন পুন:সৃষ্টি সংখ্যা হ্রাস করা। একটি দেশের জনগোষ্ঠী যখন অন্য কারো সংস্রবে আসায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখনি Social Distancing বা সামাজিক দূরত্বের কথা ভাবা হয়।
আমাদের দেশে Social Distancing বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য জনসচেতনামুলক প্রচারনা বিদ্যমান। তারপরও রাস্তা-ঘাটে কিংবা অলিতে-গলিতে মানুষের আনাগোনা থেমে নেই।
তবে প্রতিদিন কারা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসছে তাদের বের করা অতি সহজ বিষয় নয়। বিশেষ করে আমাদের মত জনবসতিপূর্ণ দেশে। সংস্রবের কারণে ছড়িয়ে পড়ে বলে সংক্রমণ ছড়ানোর মাত্রা অতি সহজ। অজানা এক সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে কত জনের সংক্রমণ ঘটাতে পারে তার নির্দিষ্ট কোন ভিত্তি নেই। অথচ সংক্রমিত লোকটি কাদের সংস্পর্শে এসেছিল তা যদি চিহ্নিত করে রাখা যায় এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যায় তাহলে সংক্রমন অধিক হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
এই পদ্ধতির নাম ' কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' পদ্ধতি। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কয়েকটি দেশ সুফল পেতে শুরু করেছে। সংক্রমণ রোধের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে সামাল দেয়া অনেক সহজতর হয়।
২০১৪ সালে আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরা লিওনের কাম্ব্রিয়া জেলায় যখন ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমন ছড়িয়ে পড়ে তখন 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' পদ্ধতি অবলম্বন করেই সংক্রমণের হার কমানো সম্ভব হয়েছিল। একজন সংক্রমিত ব্যক্তি যখন অন্য একজন ব্যক্তির সংস্রবে আসে তখন কন্ট্যাক ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে জানান দেয়া হয়।
ব্যবহারকারী যেখানেই থাকে না কেন স্মার্ট ফোনের ব্লু-টুথের কাছাকাছি থাকা অন্যান্য স্মার্ট ফোনের সঙ্গে নির্দিষ্ট 'কি কোড' আদান-প্রদান করে। এর মাধ্যমে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে অ্যাপসটির মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দেবে এবং সেন্ট্রাল ডাটা বেসে 'কি কোডটি' যুক্ত হয়ে যাবে। ডাটা বেসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিদিন ডাউনলোড হবে। ফলে ফোনে সেইভ থাকা অন্য একটি কোডের সঙ্গে মিলে গেলে স্মার্ট ফোনের মালিক সহজেই বুঝতে পারবে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন কি-না। কেউ সংক্রমিত হলে ম্যাসেজ চলে যাবে তার মোবাইলে। সংক্রমিত ব্যক্তি যে সকল জায়গায় অবস্থান করেছেন, কাদের সংস্রবে ছিল তাদেরকেও বলা হবে ডিসইনফেক্ট বা সংক্রমণ মুক্ত করতে। এই প্রযুক্তির ফলে কর্তৃপক্ষ খুব সহজেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে এমন ব্যক্তিদের সনাক্ত ও পরীক্ষা করা এবং দ্রুত কোয়ারেন্টিনে পাঠাতে পদক্ষেপ নিতে পারে। এই প্রযুক্তির ফলে, ব্যবহারকারীর ফোন থেকে ব্লু-টুথ সিগন্যাল দেবে। কেউ যদি ছয় ফুটের ভেতর চলে আসে তাহলে অপরজনের তথ্য সংরক্ষিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, কোন একজন করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তি যদি একটি ট্যাক্সিতে করে কোন জায়গায় গমণ করেন তবে ট্যাক্সিতে অবস্থানকারী সকলের মোবাইলে ম্যাসেজ চলে যাবে তাদের সংস্পর্শে কোন সংক্রমিত ব্যক্তি এসেছিল। অবশ্যই করোনা ভাইরাসের সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্রবে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশনে রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। তা না হলে সংক্রমনের হার কমানো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বলা যেতে পারে সিঙ্গাপুর এ ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টিনে থাকা বা আইসোলেশনে থাকার জন্য আইনি নোটিশের মত জারি করে থাকে। এমন কি এ নিয়ম ভঙ্গ করলে দশ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হয়।
WHO- এর মতে, 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' ৩ টি ধাপে পরিচালিত হয়।
প্রথম ধাপ: সংস্রব চিহ্নিতকরণ- এই ধাপে সংক্রমিত ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে নিয়ে কারা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছে তা নির্ণয় করা প্রাথমিক দায়িত্ব। সংক্রমিত ব্যক্তির স্পর্শে বা কাছে আসা ব্যক্তিদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ম্যাসেজ প্রদানের মাধ্যমে সংস্রব ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ করা হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: সংস্রবের তালিকা নির্ণয়- সংস্রবে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণের পর তাদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনে কোয়ারেন্টিনে বা আইসোলেশনে রাখা।
তৃতীয় ধাপ: খোঁজ রাখা- কোয়ারেন্টিনে বা আইসোলেশনে রাখা ব্যক্তিদের সংক্রমনের কোন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা।
'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ' পদ্ধতি ব্যবহার করে বর্তমান সময়ে সিঙ্গাপুর অনেকটাই সফলতার মুখ দেখছে। চলতি বছরের ২০ মার্চ তারিখে 'ট্রেস অল টুগেদার' নামক কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং সনাক্তকরণে প্রথম অ্যাপস উন্মোচন করে। উল্লেখ করা যেতে পারে, চীন থেকে নববর্ষ উদযাপনের জন্য এ বছরের প্রথমদিকে বিশ জনের একটি পর্যটক দল সিঙ্গাপুরে আসেন। চীনের মূল ভূ-খন্ডের নিকট একটি ঔষধের দোকান কুমিরের তেলের জন্য চীনাদের খুবই জনপ্রিয়। সেই বিশ জনের পর্যটক দল সেখানে প্রবেশ করেন। কিন্তু রেখে যান অদৃশ্য অঘটন ঘটনার অশনি সংকেতের হাতছানি। চীনের সেই পর্যটক দলটি করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত ছিল যেটা তারা নিজেরাও জানতেন না। পরবর্তীতে ওই ফার্মেসির লোকজনের মাধ্যমে বয়ে বেড়ানোর সংক্রমণের দরুণ নয় জন সংক্রমিত হয়। অবশ্য, তারা সকলেই পরে সুস্থ হয়ে উঠেন। তারা অন্য কারো সংস্পর্শেও যেতে পারেননি এবং সংক্রমনও ঘটাতে পারেননি। অথচ, তাদের মাধ্যমেও সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারতো। তারা সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পেরেছিল একমাত্র 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' বিষয়টি কাজে লাগিয়ে। যখন নয়জন সংক্রমিত হয় তাদের সবাইকে তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা করে রাখা হয় এবং তাদের সংস্পর্শে যারা ছিল তাদেকেও চিহ্নিত করে পরীক্ষার মাধ্যমে কোয়ারেন্টিনে এবং আইসোলেশনে রেখে সংক্রমন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষকদের মতে, আইটির যুগে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ডাটার পূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে শতভাগ কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং সম্ভব। গবেষকদের মতে, এই ডেটা থেকে একটি রিস্ক রেটিং সিস্টেমও ডেভেলপ করা যেতে পারে যা পাবলিক প্লেসগুলোতে মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে লোকাল ডেটার প্রয়োজন নেই বলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে না। তবে অ্যাপসটি ডাউনলোড করার সাথে সাথে নাম নির্ধারণ করতে হয় বলে ছদ্মনাম ব্যবহার করলেও কোন সমস্যা নেই।
প্রথম থেকে জার্মানীর স্বাস্থ্য বিভাগ 'ইনফেকশন ক্লাস্টার' বা বেশি দ্রুত এলাকা ট্র্যাক করেছিল যার ফলে ইনফেকশনের চেইন বা চক্র প্রথমেই ভেঙ্গে গিয়েছিল। ফলে করোনা ভাইরাস সংক্রমন হ্রাস করার ক্ষেত্রে 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' ব্যবহার করে জার্মান সরকার সফলতা পেয়েছে।
ইতোমধ্যে ভারত সরকার ' আরোগ্য সেতু অ্যাপসটি '( Aarogya Setu App) তৈরি করেছে। এই অ্যাপসের মাধ্যমে জানতে পারা যায় আশে পাশে কোন সংক্রমিত রোগী আছে কিনা।
আরোগ্য অ্যাপস চালু হওয়ার কিছুদিন পর অর্থাৎ ১০ এপ্রিল ২০২০ ইং তারিখে টেকনোলজির বড় দুই কোম্পানী অ্যাপল এবং গুগল জানিয়েছে, 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' টেকনোলজি ব্যবহার করে নতুন ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার হার কমাতে তারা স্মার্ট ফোনের জন্য যৌথভাবে একটি অ্যাপস নির্মাণ করছে। সম্ভবত মে মাসের মধ্যেই এটি চলে আসবে।
ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকাতে পাবলিক হেলথ অন্টারিও 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' শুরু করেছে। অন্টারিওতে ফলপ্রসু হওয়ায় বর্তমানে পুরু কানাডা জুড়ে চালু করা যায় কিনা সে ব্যাপারে আলোচনা চলছে।
এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ায় চালুকৃত কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং অ্যাপটির নাম 'কোভিডসেইফ। অ্যাপটি ছাড়া মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই লাখো মানুষ ডাউনলোড করেন। তাই এখনো অস্ট্রেলিয়াতে সংক্রমনের হার কম।
চীনের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে ভিয়েতনামের। কাজেই চীনের সাথে সকল ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে ভিয়েতনামের। দেশটি করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে কয়টি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে তার মধ্যে 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' অন্যতম।
দক্ষিণ কোরিয়া গোঁড়া থেকেই সংক্রমিত কিংবা সংস্রবে থাকা ব্যক্তিদের আলাদা করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এটা সম্ভব হয়েছিল কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের জন্য। দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ডও সেক্ষেত্রে অনেকটা সফল।
তাছাড়াও সেলফোনের এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সংক্রমন বিস্তার রোধে সক্ষম হয়েছে আরো কয়েকটি দেশ। তাদের মধ্যে তাইওয়ান, বেলজিয়াম, চীন, অস্ট্রিয়া উল্লেখযোগ্য।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আক্রমনের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এভাবে বাড়তে থাকলে পরবর্তীতে কতটুকু আশার আলো দেখতে পাবো প্রশ্ন থেকেই যায়।
তাই বর্তমান সময়ে সামাজিক দূরত্বের(Social Distancing) পাশাপাশি 'কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং' ব্যবস্থা ফলপ্রসু হবে বলে আমরা আশাবাদী।
লেখক : প্রিন্সিপাল অফিসার
রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, বন্দর বাজার শাখা, সিলেট।
anjan999roy@gmail.com





