ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে পৃথিবীতে হানা দিয়েছিল মহামারী। এগুলো বদলে দিয়েছে সভ্যতার গতিপথ। প্লেগ, ইবোলা, স্প্যানিশ ফ্লুসহ বিভিন্ন নামে আমরা মহামারীর দেখা পেয়েছি। কিন্তু অন্যান্য সময়ের মহামারীগুলোর চেয়ে নভেল করোনাভাইরাস একেবারে ভিন্নতর। এটি কেবল মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে এমন নয়, রাজনীতি-অর্থনীতিসহ সবক্ষেত্রেই এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অতীতের মহামারীগুলোর চেয়ে যেসব জায়গায় কভিড-১৯ আলাদা সেসব বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো।
অনুমানের ভিত্তিতে সাড়া
কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মহামারী পর্যায়ে পৌঁছার আগে থেকেই অনেক দেশ অনুমানের ভিত্তিতে এ নিয়ে সতর্ক হয়েছিল। এ বিষয়ে মেডিকেল ডিসিশন-মেকিং বিশেষজ্ঞ টালায়া মিরন-শাটজ বলেন, কভিড-১৯-এর পরিপ্রেক্ষিতে নেয়া আইসোলেশন ও অর্থনৈতিক শাটডাউন এজন্য করা হয়নি যে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, বরং এ জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে যে এমনটা ঘটতে পারে।
মৃত্যুহার
মৃত্যুর হার আমরা পরিমাপ করি ভাইরাসটি মানুষের মৃত্যুর জন্য কতটা দায়ী তা দিয়ে। করোনাভাইরাস এখনো তার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে এটা নির্ণয় করার সময়ও আসেনি। যদিও এর দ্বারা ঘটিত মৃত্যু সম্পর্কে সঠিক তথ্য বের করা কঠিন। কারণ এটি স্বাস্থ্যসেবা দ্বারা প্রভাবিত হয়। বয়স্ক লোকের ওপরও এর প্রকোপ বেশি এবং সমাজ কর্তৃক নেয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থাগুলো তো আছেই। তাছাড়া আলাদা আলাদা দেশে এর মাত্রাও কম-বেশি হচ্ছে। তাই মহামারী চলে গেলে কেবল মৃত্যুর প্রকৃত হার নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
ব্যাপক বিস্তৃতি
মহামারীকে সাধারণত বোঝা যায় এর বিস্তৃতি ও ছড়ানোর গতিপ্রকৃতি দিয়ে। কয়েক দফায় আক্রমণ ঘটিয়ে এটা থেমে যায়। এটা সম্ভব হয় যখন অনেক মানুষ এর দ্বারা সংক্রমিত এবং তাদের মাঝে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। পরিবেশ, বয়স, লিঙ্গ ও আরো কিছু বিষয়ের ভিত্তিতে কভিড-১৯ ভাইরাসটির অদ্ভুত পছন্দ-অপছন্দ রয়েছে। তাই বয়স ও ভৌগোলিক অবস্থান এ ভাইরাসের ছড়ানোর বিষয়কে প্রভাবিত করে। যে কারণে কিছু কিছু দেশে ভাইরাস ছড়ানোর মাত্রাও অন্যদের চেয়ে বেশি হয়।
দীর্ঘ সময় অনির্ণেয় থাকতে পারে
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একজনের শরীরে এটা কতক্ষণ অনির্ণেয় অবস্থায় থাকতে পারে সেটি। ধরা না পড়ার কারণেই মূলত অনেকে দেশে টেস্ট করা হয়েছে কম, যে কারণে মৃত্যুর হারও হয়েছে বেশি। এপিডেমিওলজিস্টদের মতে, অন্যান্য মহামারীর চেয়ে এটি অধিক সময় পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সাধারণত এটি পাঁচ থেকে সাতদিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে কখনো কখনো এটি ১৪ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্ব এখন অনেক বেশি সংযুক্ত
স্প্যানিশ ফ্লুসহ অন্যান্য মহামারীর সঙ্গে এর আরেকটি বড় পার্থক্য হচ্ছে বিশ্ব এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এটি বিস্তৃত হয়েছে। নৃতাত্ত্বিক রোলিন্স কলেজ বলেন, ভ্রমণ ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব এখন আরো বেশি সংযুক্ত। যা কিনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে খাবার, মানুষ ও পণ্য সহজেই বিশ্বের যেকোনো জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে।
সঠিক ও ভুল তথ্য দ্রুত ছড়ায়
বাজার ও সাপ্লাই চেইন ছাড়াও যেকোনো তথ্য অতীতের যেকোনো মহামারীর চেয়ে দ্রুত ছড়াতে পারে। সময়টাই এমন যখন করোনাভাইরাস নিয়ে যেকোনো সঠিক খবর কিংবা গুজব দুটোই সহজেই পৌঁছে যেতে পারে।
অধিক জনসংখ্যা
বিশ্বে বর্তমানে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক মানুষের বসবাস। যা কিনা মহামারীকে আরো বেশি বিপজ্জনক করে তোলে। কারণ এখন কম প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন অধিক মানুষ রয়েছে পৃথিবীতে, যারা কিনা সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। যেহেতু এ ভাইরাস কোনো সীমানা ও বাধা মানছে না, তাই এটি আক্রান্তও করছে অনেক বেশি মানুষকে।
ভ্যাকসিন ও অতি প্রতিরোধক্ষমতার অভাব
কভিড-১৯ সব বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করছে। যদিও ৬০-এর অধিক বয়সের মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি। এর পরও সংক্রমণ বিবেচনায় অন্য মহামারীর সঙ্গে এর বড় পার্থক্য রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তরুণ ও সুস্বাস্থ্যসম্পন্ন মানুষ হার্ড ইমিউনিটি কিংবা অতি প্রতিরোধক্ষমতার কারণে বেঁচে যায়। কিন্তু কভিড-১৯-এ তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি এখনো ভ্যাকসিনও আবিষ্কার সম্ভব হয়নি।
স্বতন্ত্র জৈবিক পার্থক্য
করোনাভাইরাস ও অতীতের অন্যান্য ভাইরাসের মাঝে কয়েকটি স্বতন্ত্র জৈবিক পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাস দ্রুত পরিবর্তিত হয়, যার ফলে সেটি মানবদেহের সঙ্গে মানিয়ে যায় এবং আমাদের প্রতিরোধক্ষমতা তাকে রুখে দিতে পারে। করোনার প্রথম আঘাত ততটা মারাত্মক ছিল না, যতটা দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাস নিজেকে পরিবর্তন করে আরো বেশি সংক্রামক ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
ওষুধের উন্নতি
এটা একটা ভালো সংবাদ যে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ওষুধ ও বৈজ্ঞানিক সুবিধা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। যে কারণে মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসার দিক থেকে আমরা আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত। পাশাপাশি একই ঘরানার করোনাভাইরাস নিয়ে প্রায় ৫০ বছর ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
ইবোলার চেয়ে সহজে ছড়াতে পারে
যদিও ইবোলা ও কভিড-১৯-এর মাঝে খুব বেশি তুলনার সুযোগ নেই। দুটি ছড়ায় ভিন্নভাবে। সরাসরি বডি ফ্লুইড দ্বারা ইবোলা ছড়ায় সরাসরি স্পর্শের মাধ্যমে। যেখানে কভিড-১৯ ছড়ায় শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত ড্রপলেটসের মাধ্যমে। যা কিনা বস্তুর মাঝে কয়েকদিন এবং বাতাসে কয়েক ঘণ্টা টিকে থাকতে পারে। তবে ইবোলার ক্ষেত্রে কেবল রোগীকে আলাদা করে চিকিৎসা দিলে এটিকে আটকে রাখা যায়। অন্যদিকে কভিড-১৯ কোনো লক্ষণ ছাড়াই ছড়াতে পারে।
পৃথিবী কখনো এভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়নি
সত্যি কথা হচ্ছে আর কোনো মহামারীর কারণে পৃথিবী কখনো এভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। মানুষ বাসায় বসে কাজ করছে। স্কুল-কলেজসহ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে আছে দিনের পর দিন। খেলাধুলা ও বিনোদন জগৎও স্তব্ধ। যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মরিয়া প্রচেষ্টা
অন্যান্য ভাইরাসের সঙ্গে নতুন করোনাভাইরাসের পার্থক্য হচ্ছে দ্রুত সময়ে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রচেষ্টা। যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। মাত্র তিন মাসের মাঝে এর প্রথম পর্বের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। যা কিনা অভূতপূর্ব।
রিডার্স ডাইজেস্ট





