নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের কারণে দেশের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ এখন গৃহবন্দি। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে, অনেক মানুষের হাতে টাকা নেই বা বাইরে বেরিয়ে পণ্য ক্রয়ের উপায় নেই। দেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ সরকারি বা বেসরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক সংকট একাকার হয়ে একের পর এক দেশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে চুপসে দিয়ে। করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি অনেকটাই অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে। কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত, সাধারণ ছুটি বা লকডাউন, যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, তা একসময় উঠিয়ে দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কখন ওঠানো যৌক্তিক হবে এবং কীভাবে তা করতে হবে?
কভিড-১৯-এর আক্রমণের তৃতীয় পর্যায়ের খুব সম্ভবত শুরুতে আছি আমরা। আমাদের কার্ভগুলো (আক্রান্ত, মৃত্যু ইত্যাদি) সবে উপরে উঠতে শুরু করেছে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে যে কভিড-১৯ আক্রান্তের রেখাটি চেপ্টা হতে ন্যনতম তিন সপ্তাহ থেকে সর্বোচ্চ আট সপ্তাহ বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। কত সময়ের মধ্যে রেখাটির ঢাল শূন্য বা তার কাছাকাছি নামিয়ে আনতে সক্ষম হব, তা নির্ভর করছে কতটা কার্যকরভাবে আমরা এরই মধ্যে সোস্যাল ডিসট্যান্সিং কার্যকর করতে পেরেছি। যা ঘটার তার অনেকটাই ঘটে গেছে। সামনের দিনগুলোয় এখন কেবল দেখার অপেক্ষা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন থেকে এটা ওয়াইড স্প্রেড আউটব্রেকের দিকে যায় কিনা। সেটাই নির্ধারণ করবে অর্থনীতির চাকা কীভাবে ঘুরবে, কতটা ঘুরবে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিষয় নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. ইউরোপের কিছু দেশ যেমন অস্ট্রিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, জার্মানি, চেক রিপাবলিক ও ডেনমার্ক লকডাউনের ইতি টানার পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এসব দেশে দৈনিক নতুন আক্রান্তের সংখ্যা মোটাদাগে কমতে শুরু করেছে যথাক্রমে ১৬ মার্চ, ২১ মার্চ, ২৩ মার্চ, ২৭ মার্চ, ১ এপ্রিল, ২ এপ্রিল ও ৭ এপ্রিল থেকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের লকডাউন হওয়া অনেক অঙ্গরাজ্যই সপ্তাহখানেকের মধ্যে খুলতে শুরু করবে। লকডাউন প্রত্যাহারে নতুন আক্রান্তের সঙ্গে সঙ্গে অন্য যে বিষয়গুলো দেখা হয় সেগুলো হচ্ছে, দৈনিক মৃত্যু, সুস্থ হওয়ার হার বনাম মৃত্যুহার, ট্রান্সমিশন রেট (একজন কতজনকে আক্রান্ত করতে পারে) ইত্যাদি এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক কারণ। নেদারল্যান্ডসে মার্চের ১৫ তারিখ থেকে ট্রান্সমিশন রেট ১-এর নিচে নেমেছে, জার্মানিতেও সপ্তাহখানেক ধরে সেটা ১-এর নিচে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন।
আমাদের করোনা পরিস্থিতির পরিষ্কার চিত্রটা বোঝার পর অর্থনীতি সচল করার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। প্রথম পিকে (চূড়া) পৌঁছেছি কিনা তা না জেনেই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। প্রসঙ্গক্রমে সিঙ্গাপুরের উদাহরণ টানা যায়। সেখানে দ্বিতীয় ওয়েভ শুরু হওয়ায় ১ জুন পর্যন্ত লকডাউন বর্ধিত করা হয়েছে।
২. ছুটি বা লকডাউন থেকে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক পরা এবং হাত ধোয়ার নির্দেশনা ও অভ্যাস পালন করতে হবে। আমরা জানি না, রোগটি একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে নাকি আগামী কয়েক মাস আমাদের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে থাকবে, নাকি এবার চলে গেলেও ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসবে। অর্থনীতির চাকা চালু করতে হলে বা চালু থাকতে হলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম একসঙ্গে চালু না করে পর্যায়ক্রমে করতে হবে। এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্তদের পেশাভিত্তিক বিন্যাস নীতিনির্ধারকদের কাছে থাকলে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক হবে। কোন ধাপে কোন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে শুরুতে। প্রথমে কৃষি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায় সে রকম পণ্যের ওপর জোর দেয়াই সমীচীন। পাশাপাশি যেসব পণ্য এখন বিদেশীরা নিতে ইচ্ছুক, সেগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, খুচরা বিক্রেতা-দোকান, বাজার, পার্সোনাল কেয়ার, ইলেকট্রনিকস, জামাকাপড় এবং বিশেষত যেসব ব্যবসা অনলাইনে করা যায় ও হোম ডেলিভারির সুযোগ আছে, সেগুলো খুলে দেয়া যেতে পারে। যারা ঘরে বসে কাজ করতে পারেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরেই অফিসের কাজ করবেন। সব ধরনের জমায়েত বন্ধ রাখতে হবে। পাঁচ থেকে ১০ জনের বেশি লোক একত্র হওয়া যাবে না। বেশির ভাগ অর্থনৈতিক লেনদেনের জন্য সরাসরি জমায়েতের প্রয়োজন হয় না, উৎপাদনের জন্য হয়।
৩. দেশের যেসব জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা কম এবং করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার ঝুঁকি কম, সেগুলোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করে দিতে হবে। প্রতিটি জেলাকে পৃথক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে যেন অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। আন্তঃজেলা চলাচল শুরুতেই অনুমোদন দেয়া যাবে না, তবে পণ্য বা শ্রমিকের পরিবহন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। প্রতি জেলায় টেস্টিং ফ্যাসিলিটি ও কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং বাড়াতে হবে। ট্রান্সমিশন রেট কমানোর জন্য ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকাগুলো লকডাউন সম্ভব না হলে কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে।
৪. যদি আমরা দৈনিক নতুন আক্রান্ত বা মৃত্যুর দিকে তাকাই, বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ মহামারী খুব সম্ভবত তার সবচেয়ে ভয়ংকর সময়টা পার করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে বাদ দিলে উন্নত দেশগুলো তাদের সবচেয়ে খারাপ সময়টা পার হয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ধীরে ধীরে বাজার খুলে দেয়ার দিকে এগোচ্ছে। তাই এসব দেশে চাহিদা কভিড-১৯ সময়ের তুলনায় বাড়তে শুরু করবে। সব জিনিসপত্রের চাহিদাই যে বাড়বে এমন নয়। কভিডে-১৯-এ আয় কমে যাওয়া বা যারা শপিং না করে সঞ্চয় করেছেন, উন্নত বিশ্বের সেসব মানুষ লকডাউন প্রত্যাহারের পর বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পোশাকই কিনবেন, বিলাসী আইটেম নয়। বাংলাদেশ যেহেতু পোশাক বাজারের লো-এন্ডে সরবরাহ করে, খুব সম্ভাবনা আছে যে যতটা ক্ষতি আমরা ভাবছি, ততটা ক্ষতি আমাদের হবে না। তাছাড়া স্বাভাবিক সময়ে ঈদ উপলক্ষে কারখানা বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকে। এবার ছুটি পুনর্বিন্যাস করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে আনা যাবে।
বাকি অংশ আগামীকাল
এম কে তৌফিক: সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





