নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পেছনে শিশুদের ভূমিকা আছে কিনা, এ নিয়ে শুরু থেকে বিতর্ক ছিল। এখন কিছু দেশ শিশুদের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া শুরু করায় বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীরাও এখন এ বিষয়ে আলাদা আলাদা অবস্থান নিয়েছেন।
তথ্য বলছে, শিশুদের খুব সামান্য অংশই কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। চীন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছরের নিচে আক্রান্তের হার ২ শতাংশেরও নিচে।
এখন শিশুদের আক্রান্ত ও ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনা বয়স্কদের চেয়ে কম কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দুই ভাগ হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ বলছে, শিশুদের ঝুঁকি কম। তাই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য তারা সেভাবে দায়ী নয়। পাশাপাশি তথ্য উপাত্তও স্কুল খোলার পক্ষে রায় দিচ্ছে।
জার্মানি ও ডেনমার্কের শিশুরা এরই মধ্যে স্কুলে ফিরে গেছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের স্কুলগামী শিক্ষার্থীরাও কিছুদিনের মধ্যে স্কুলে ফিরতে শুরু করবে।
তবে অন্য একদল বিজ্ঞানী শিশুদের স্কুলে ফেরার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন, শিশুদের সংক্রমণ কম হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে বয়স্কদের মতো তাদের অত বেশি টেস্ট করা হয়নি। এছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা ছিল উপসর্গহীন বা মৃদু উপসর্গসম্পন্ন।
ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের গবেষক গ্যারি উং বলেন, আমি তেমন কোনো বায়োলজিক্যাল অথবা এপিডেমিওলজিক্যাল কারণ দেখি না, যাতে বিশ্বাস করা যায় শিশুরা আক্রান্ত হয় না। যতদিন পর্যন্ত বয়স্কদের মাঝে গোষ্ঠী সংক্রমণের অস্তিত্ব থাকবে, সঙ্গে যদি স্কুল খুলে দেয়া হয় তা সংক্রমণকে আরো ত্বরান্বিত করবে। শ্বসনতন্ত্রের ভাইরাসগুলো সাধারণত স্কুল এবং ডে কেয়ারে আরো বেশি চালিত হবে।
যদি শিশুদের মধ্য দিয়ে ভাইরাস চালিত হয় তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণও অনেক তীব্রতা পাবে। বিশেষ করে সেই দেশগুলোতে যেখানে স্কুল খুলে দেয়া হয়েছে।
কিন্তু এই বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে হলে যা প্রয়োজন তা হলো বড় পরিসরে এবং মানসম্পন্ন জনসংখ্যা অধ্যয়ন। যার কিছু এরই মধ্যে চলছে। যার মাঝে আগের সংক্রমণের চিহ্ন হিসেবে রক্তে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির পরীক্ষাও আছে।
এছাড়া অন্য একদল বিজ্ঞানী শিশুদের ইমিউন সিস্টেম কীভাবে সাড়া দেয়, তা নিয়ে এবং কেন তারা বয়স্কদের চেয়ে মৃদু উপসর্গসম্পন্ন সেটি পরীক্ষা করে দেখছেন।
সংবেদনশীলতা নিয়ে বিতর্ক
চীনের শেনজেনে করা আরেকটি গবেষণা বলছে, ১০ বছরের নিচের শিশুদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বয়স্কদের মতোই। যদিও তাদের উপসর্গগুলো অতটা গুরুতর হয় না।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আলসডায়র মুনরো বলেন, এ গবেষণাপত্রটি সবাইকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। কারণ এটি বলছে, শিশুরাও নীরবে ছড়াচ্ছে কভিড-১৯।
অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও আইসল্যান্ডের অন্য গবেষণা বলছে, যেসব দেশে অনেক বেশি টেস্ট করা হচ্ছে সেখানে দেখা গেছে শিশুদের মাঝে সংক্রমণের হার অপেক্ষাকৃত কম। এমনকি চীনের অন্য গবেষণাও বলছে, শিশুদের সংবেদনশীলতা কম।
চীনের হুনান অঞ্চল থেকে তথ্য নিয়ে করা আরেক গবেষণায় দেখা যায়, সেখানে ২০ থেকে ৬৪ বছরের আক্রান্ত তিনজনের বিপরীতে ১৫ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা একজন। তবে ১৫ কিংবা তার বেশি টিনএজারদের জন্য এটি চূড়ান্ত নয়। মুনরো বলছেন, তাদের ঝুঁকিও বয়স্কদের মতো।
সংক্রমণের ঝুঁকি
বাচ্চারাও বয়স্কদের মতো সংক্রমণ ছড়িয়ে দেয় কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ফ্রান্সের আল্পসের কিছু কেস নিয়ে করা এক গবেষণা বলছে, নয় বছরের এক শিশু কভিড-১৯-এর লক্ষণ নিয়ে তিনটি স্কুল ও স্কিয়িং ক্লাসে গিয়েছে কিন্তু একজনকেও আক্রান্ত করেনি। মুনরো বলেন, এটা শোনাই যায়নি যে একজন বয়স্ক লোক আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু অন্য কাউকে আক্রান্ত করেননি।
ক্রিস্টি শর্ট নামে ব্রিসবেনের ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের
এক ভাইরোলজিস্ট সম্প্রতি এক গবেষণা করেছেন। অপ্রকাশিত সেই গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু দেশে যেখানে সে সময় স্কুল বন্ধ ছিল না যেমন সিঙ্গাপুর, তাদের ক্ষেত্রে খুব কম সময়ই দেখা গেছে শিশুরা বাসায় প্রথম সংক্রমণ নিয়ে এসেছে। মাত্র ৮ শতাংশ পরিবারের মধ্যে প্রথম চিহ্নিত কেস ছিল শিশু। যা কিনা এইচ৫এন১ অ্যাভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জার সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল ৫০ শতাংশ।
মুনরো বলেন, পরিবারের মাঝে চালানো গবেষণাগুলো আশ্বস্ত করছে। কারণ এটি দেখাচ্ছে শিশুদের অনেকেই আক্রান্ত হলেও তারা ঘরে গিয়ে অন্যদের সংক্রমিত করছে না।
তবে উং মনে করছেন, এসব গবেষণায় ত্রুটি রয়েছে। কারণ বাসাগুলো এলোমেলো বাছাই করা হয়নি। বরং বাছাই করা হয়েছে ওখানে এরই মধ্যে বয়স্ক রোগী থাকার কারণে। তাই এটি নিশ্চিত হওয়া খুব মুশকিল যে আসলে ভাইরাসটি কে নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, স্কুল ও ডে কেয়ারগুলো বন্ধ হওয়াও ব্যাখ্যা করছে কেন শিশুরা সংক্রমণের প্রধান উৎস নয়। অন্যান্য শ্বসনতন্ত্রের ভাইরাসও বয়স্কদের কাছ থেকে শিশুদের মাঝে ছড়াতে পারে এবং উল্টোও হতে পারে। তাই আমি বিশ্বাস করি না এটা ব্যতিক্রম।
এমনকি দুটি গবেষণাপত্র বলছে, কভিড-১৯-এর উপসর্গের তীব্রতা বয়স্কদের মতো হতে পারে। তাই উং মনে করছেন, বর্তমান অবস্থায় স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনস হিসাব ছাড়া খুলে দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ শিশুরাও বড়দের মতো সংক্রামক হতে পারে। এছাড়া আরো কিছু গবেষণা বলছে, সংক্রমণ স্কুল থেকে বৃহৎ কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও অস্ট্রেলিয়ান এক প্রতিবেদন মতে, এটা অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস থেকে সীমিত এবং কম আকারে ছড়ায়।
ইমিউনের প্রতিক্রিয়া
গবেষকরা একমত যে শিশুরা কভিড-১৯ মোকাবেলায় বয়স্কদের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। যাদের বেশির ভাগই হয় কোনো ধরনের উপসর্গ ছাড়া কিংবা মৃদু সংক্রমণসম্পন্ন। কিন্তু কেউ কেউ বাজেভাবে অসুস্থ হতে পারে এবং মৃত্যুবরণও করতে পারে। লন্ডন ও নিউইয়র্কে অল্প কিছু শিশুর মাঝে কাওয়াসাকি রোগের মতো একই ধরনের প্রদাহজনিত সমস্যা হতে দেখা গেছে। উং বলেন, আমি অবাক হব না কভিড-১৯-এর সঙ্গে যদি কাওয়াসাকির কোনো যুক্ততা থাকে। কারণ এর আরো অনেক ভাইরাল সংক্রমণ এর সঙ্গে যুক্ত।
শিশুদের মৃদু উপসর্গের কারণ হিসেবে উং বলেন, ফুসফুসে এসিই২ রিসেপ্টরের কম উপস্থিতি। যদিও এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য শিশুদের টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
দ্য নেচার





