আজ আমরা এমন একটি রোগের বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছি, যা ইতিহাসবিদ ইভা শ্লোথিউবারের ভাষায় ‘মনের মহামারী’ বলে অভিহিত করার মতো আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ভুল তথ্য, সত্য ও মিথ্যা গল্প যেহেতু চারপাশে অবিরত প্রচারিত হচ্ছে, তাই বিশ্বনেতাদের এখন আগের চেয়ে আরো বেশি সামনের পথকে আলোকিত করতে হবে। আর এটা বিজ্ঞান ও প্রমাণভিত্তিক যুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়েই করতে হবে।
নিজের দেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসী এমন একজন নেতা আছেন, যিনি মহামারী মোকাবেলায় একটুও হোঁচট না খেয়ে পথ চলছেন, তিনি কমান্ডার ইন চিফ না হয়ে বরং বিজ্ঞানীদের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। কয়েক সপ্তাহ ধরে জার্মান এ নেতা তার স্বভাবগত বিচারবুদ্ধি ও সংবেদনশীলতা প্রয়োগ করে দেশকে এখন পর্যন্ত কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুলনামূলক সফলভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মহামারীটি এমন একজন রাজনীতিকের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যার নেতৃত্বের ধরনটি ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণাত্মক, উদ্বেগহীন ও সতর্ক হিসেবে পরিচিত। ৩০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় বর্তমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে শান্ত ও যুক্তিযুক্ত চিন্তার জন্ম দিয়েছেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ মেরকেল। এটা রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক দুভাবেই কাজে দেবে বলে মনে হচ্ছে।
১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী মেরকেল উত্তর বার্লিনের ছোট্ট একটি শহরে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা একজন লুথেরান যাজক। ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল ধ্বংসের সময়ে কোয়ান্টাম রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী মেরকেল একজন গবেষক ও বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করতেন। এরপর তিনি তার এলাকায় গঠিত একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে যোগদানের জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। এভাবেই নিঃশব্দে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল। সময়োপযোগী কৌশল ও দক্ষতার কারণে তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উঠে আসেন এবং ২০০৫ সালে জার্মানির ফেডারেল সরকারের প্রধান চ্যান্সেলারিতে যোগ দেন। একজন নারীর পক্ষে এভাবে দ্রুত উঠে আসাটা নাটকীয় ও অস্বাভাবিক ছিল। এমনকি প্রশিক্ষিত এ বিজ্ঞানীর আইন বা সিভিল সার্ভিসের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। বিজ্ঞান ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে মেরকেল কখনো প্রকাশ্যে কথা বলেননি, তবে সম্ভবত বিজ্ঞান তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি। নতুন তথ্যের বিষয়ে তার বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ, প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বিজ্ঞান অবিচ্ছেদ্য জড়িয়ে রয়েছে।
জার্মানিতে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্ত হয় ২৮ জানুয়ারি। তবে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভাইরাসটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারেনি। এরপর সরকারের দেয়া বিধিনিষেধগুলো দৈনন্দিন জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শিল্প সম্মেলনের মতো বিশাল সমাবেশ বাতিল করায় মানুষ কম বিরক্ত হলেও ১০ মার্চ সিনেমা হল, অপেরা ও কনসার্টের মতো ক্রিয়েটিভ সেন্টারগুলো বন্ধ হওয়ার পর মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় কিছুর অনুপস্থিতি বোধগম্য হতে শুরু করে। ১৮ মার্চ দেশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার পরে মেরকেল টেলিভিশনে বিরল এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যা তার নেতৃত্বকে দৃঢ় করেছে।
ক্যামেরার সামনে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা নিয়ে তিনি আবেগময় একটি বক্তৃতা দেন। তিনি সবকিছু স্বীকার করে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের স্বাভাবিক জনজীবন, সামাজিক একাত্মতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আগে কখনো এভাবে পরীক্ষা দিতে হয়নি।’
বক্তব্যে তিনি গণতন্ত্রের গুরুত্ব ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন এবং মহামারী সম্পর্কে তিনি জোর দিয়ে জানিয়েছিলেন, যে তথ্যগুলো তিনি ভাগাভাগি করছেন, সেগুলো পুরোপুরি গবেষণার ভিত্তিতে। আতঙ্কের এ সময়ে তার যুক্তিযুক্ত নিশ্চয়তা এবং তার মানসিক আবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যান্য দেশের তুলনায় নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব জার্মানি ভালোভাবে মোকাবেলা করেছে বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। পুরো বিশ্বের মতো জার্মানিতেও আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তবে সেটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইতালির মতো নয়।
মহামারী নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য সংস্থাসহ বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থাগুলোর বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করছেন মেরকেল। বায়োমেডিকেল গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্লিন ইনস্টিটিউট অব হেলথ অন্যান্য সংস্থার মতো নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য গবেষণা চালাচ্ছে। এর চেয়ারম্যান অ্যাক্সেল র্যাডল্যাচ প্রাইস বলেছেন, জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে একত্রে কাজ করছে। এছাড়া মেরকেলের নেতৃত্বে একটি সমন্বিত ভূমিকা পালনের জন্য দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল বিভাগকে নিয়ে করোনাভাইরাস টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
দ্য আটলান্টিক





