এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভ্যাকসিন আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। এটা কীভাবে কাজ করে তা সন্ধানের জন্য বিজ্ঞানীরা এখনো ছোটাছুটি করছেন। নির্দিষ্ট কিছু ভ্যাকসিন আবার এক ধরনের গোপন বোনাস সুরক্ষা সরবরাহ করে আসছে। রহস্যময় এ প্রভাবগুলো কেবল যে আমাদের শৈশবে রক্ষা করতে পারে, তা নয়। সেগুলো আমাদের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ গিনি-বিসাউয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গুটিবসন্তের ভ্যাকসিনের দাগযুক্ত মানুষদের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল। ডেনমার্কে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন, শৈশবে যক্ষ্মার টিকা নেয়া মানুষরা ৪৫ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত প্রাকৃতিক কারণে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ কম ছিল। এটা কুকুরের ক্ষেত্রেও সত্য দেখা গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি পরীক্ষা দেখা গেছে, জলাতঙ্কের টিকা দেয়া কুকুরগুলোর বেঁচে থাকার হার অনেক বেশি ছিল, যদিও প্রত্যাশা ছিল সেটা কেবল জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
এছাড়া টিকাগুলোর মূল কাজের বাইরে আরো যেসব সুরক্ষা দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে অ্যালার্জির তীব্রতা হ্রাস করা, নির্দিষ্ট ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং আলঝেইমার রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করা। কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে প্রথমিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে যক্ষ্মার ভ্যাকসিনও পরীক্ষা করা হচ্ছে। যদিও দুটি রোগের পেছনে থাকা অণুজীবগুলো সম্পূর্ণ আলাদা এবং একটি জীবাণু ও আরেকটি ভাইরাসের মাধ্যমে সংক্রমিত করে।
কয়েক দশক গবেষণার পরও কিছু ভ্যাকসিনের এ উপকারী ও রহস্যময় প্রভাবগুলোর পেছনের কারণগুলো খোলাসা করা যায়নি। বহু শতাব্দী আগে থেকে যক্ষ্মা মানুষদের হত্যা করে আসছিল। এরপর ফরাসি ব্যাকটেরিওলজিস্টস অ্যালবার্ট ক্যালমেট ও ক্যামিল গুইরিন বিসিজি টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯২১ সালে এটা প্রথম একটি শিশুর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং ১৯৫০-এর দশকে স্পষ্ট হয়েছিল যে এটা গেম চেঞ্জার। এ টিকাটি যক্ষ্মার সবচেয়ে গুরুতর রূপগুলো প্রতিরোধে ৭০-৮০ শতাংশ কার্যকর বলে মনে করা হয়। বিসিজি কেবল মৃত্যুহার হ্রাস করে না, এটা যক্ষ্মার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন ফ্লু, রক্তদূষণ ও হার্পিসের মতো সংক্রমণ থেকেও সুরক্ষা দেয়।
এমন সুরক্ষা দেয়ার পেছনে একটি কারণ হতে পারে অচেনা আক্রমণকারীদের শনাক্ত করতে প্রতিরোধ ব্যবস্থার অণু বা অ্যান্টিজেন শেয়ার করা। যেমন বিসিজি টিকা শরীরকে একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, যা অন্য একটি ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসেও পাওয়া যায়। একই অ্যান্টিজেন হওয়ায় টিকাটি সেই ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসকেও আটকে দিতে পারে। কিন্তু এত বৈচিত্র্যপূর্ণ সংক্রমণে একই অ্যান্টিজেন থাকাও অসম্ভব বলে মনে হয়।
আরেকটি ধারণা হলো টিকাগুলো অসাবধানতাবশত আরো সাধারণ ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সরবরাহ করে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোর প্রমাণগুলো অবশ্য এ ধারণাকে সমর্থন দিয়েছে। একদল প্রাপ্তবয়স্ক তরুণের মধ্যে অর্ধেককে বিসিজি টিকা ও বাকি অর্ধেককে প্ল্যাসেবো দেয়া হয়েছিল এবং এরপর তাদের যক্ষ্মা ব্যতীত অন্য রোগজীবাণুগুলোর সংস্পর্শে আনা হয়েছিল। পরীক্ষায় যক্ষ্মার টিকাপ্রাপ্তদের চেয়ে টিকা না পাওয়া তরুণদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয় হলো বিসিজি এখন মূত্রাশয় ক্যান্সারের একটি মানসম্পন্ন চিকিৎসা।
বিবিসি





