কখন কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে? এটি বিতরণের ন্যায্য উপায়ই বা কেমন হবে? ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনে বৃহস্পতিবার ১৯ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের করা ‘ফেয়ার প্রায়োরিটি মডেল’ প্রকাশিত হয়েছে, যা মূলত একটি নৈতিক কাঠামো। তিনটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে এটা করা হয়েছে: মানুষকে উপকৃত করা ও ক্ষতি হ্রাস করা, দরিদ্র ও স্বল্প আয়ুর দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং বৈষম্য এড়িয়ে যাওয়া।

ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার পেরেলম্যান স্কুল অব মেডিসিনের গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যান্ড চেয়ার অব মেডিকেল এথিকস অ্যান্ড মেডিকেল পলিসির ভাইস প্রভোস্ট এজকিয়েল জে. ইমানুয়েল, যিনি কিনা ফেয়ার প্রায়োরিটি মডেলটি তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে কথা বলেছেন সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সঙ্গে। যেখানে তিনি মডেল এবং তার প্রয়োগ সম্পর্কে আলাপ করেছেন।

জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য নৈতিক কাঠামো অনুসরণ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আমরা জাতীয়তাবাদী পক্ষপাতিত্ব প্রত্যাশা করি এবং অনেক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী পক্ষপাতিত্বের জন্য কিছু শক্ত কারণ রয়েছে। কিন্তু নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এমন চূড়ান্ত পক্ষপাতিত্বের জন্য কোনো ভালো কারণ নেই, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে ভ্যাকসিন দেয়ার আগে নিজের দেশের প্রতিটি নাগরিককে ভ্যাকসিন দিতে হবে। চরম ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের জন্য ভালো কোনো নৈতিক কারণ নেই। ভ্যাকসিন নির্মাতারা নিজেরাই বৈশ্বিকভাবে বিতরণের জন্য যুক্তি দিয়েছিলেন এবং আমাদের কোভ্যাক্সের (বৈশ্বিকভাবে ভ্যাকসিন বিতরণের সংগঠন) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখানে ‘ন্যায্য ও ন্যায়সংগত’র কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। নীতিতত্ত্ববাদী, জনস্বাস্থ্য কর্মী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে আমরা একটা ডিজাইন তৈরির চেষ্টা করেছি।


ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকরা কি ন্যায্য বরাদ্দকে আমলে নেবে?

কীভাবে ভ্যাকসিন বিতরণ করতে হবে, তা নিয়ে তারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তারা কি এটা কেবল সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করবে? কিছু কিছু আবিষ্কারক মনে হয় তেমন। তারা কিছুটা কি কোভ্যাক্সের মতো আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে প্রদান করবে? আমরা মনে করি, অন্তত কিছু প্রস্তুতকারী বিশ্বব্যাপী এই বিতরণ এবং প্রবেশযোগ্যতার গুরুত্ব বুঝতে পারবে। কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সিইও এ কৌশলের পক্ষে দাঁড়াবে। তারা সব সময় বিশ্বের আগ্রহের বিষয়টিকে শীর্ষে রাখে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে বিশ্বব্যাপী চলমান মহামারীর গুরুত্ব বুঝতে হবে, কেবল দেশের ওপর ভিত্তি না করে। 

কেন আপনার মনে হয় যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিতরণের প্রস্তাবে ত্রুটি রয়েছে।

আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে সব দেশকে তাদের জনসংখ্যার শতাংশের ওপর ভিত্তি করে ভ্যাকসিন দেয়া হোক। প্রথমে প্রতিটি দেশের ৩ শতাংশের জন্য, এরপর ২০ শতাংশের জন্য। এটি সমনৈতিক উদ্বেগের নৈতিক নীতি পূরণ করে বলে মনে হয়—মানুষের সঙ্গে একই রকম আচরণ করা এবং জাতি কিংবা লিঙ্গ অথবা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য না করা। এ মুহূর্তে  তাত্ক্ষণিকভাবে যেটা সমস্যা তা হলো বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন হারে ভুগছে। সাধারণত আপনি যখন আন্তর্জাতিক সহায়তা দিচ্ছেন, তখন যারা সবচেয়ে বেশি ভুগছে তাদের দিন।

তারপর এমন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যে আমাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে থাকা মানুষদের বিবেচনায় নিয়ে এটি বিতরণ করা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ বলতে এখানে সামনের সারিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষগুলোকে বোঝানো হচ্ছে। প্রথমত একটি ব্যাপার হচ্ছে, এটা পরিষ্কার যে স্বাস্থ্যকর্মীরা সবাই সমানভাবে উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন নয়, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে। যেখানে কিনা ভালো মানের পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক) ঝুঁকির পরিমাণকে অনেকাংশে নিচের দিকে নামিয়ে আনে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে এ প্রক্রিয়াটি ধনী, উন্নত দেশগুলোর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। কারণ এ দেশগুলোর মাথাপিছু স্বাস্থ্যসেবা কর্মী বেশি এবং বয়স্ক মানুষও বেশি।

প্রশ্ন: ফেয়ার প্রায়োরিটি মডেল তৈরির জন্য আপনারা যে তিনটি নৈতিক মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন তা কিসের ভিত্তিতে নিয়েছেন?

এজকিয়েল: আচ্ছা, আমরা কিন্তু ওগুলো বাছাই করিনি। এগুলো মৌলিক নৈতিক মান, যা কিনা আমাদের সক্রেটিসের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এগুলো আপনি প্রায় প্রতিটি দেশে দেখতে পাবেন। এগুলোকে যাদের প্রায়ই সাধারণ নীতি বলা হয়। প্রত্যেকে মনে করে ক্ষতি কমানো এবং মানুষকে সুবিধা দেয়া উচিত এবং এটি নৈতিক দায়িত্ব। আর এটা খুবই স্পষ্ট বিষয় যে আমাদের উচিত অনগ্রসর মানুষকে সহায়তা করা এবং আমাদের মাঝে এ বোধও আছে যে মানুষ সমানভাবে মূল্যায়িত হতে চায়। আমাদের মানুষের মাঝে বৈষম্য করা উচিত নয়। আমরা এমন নীতির কথা বলছি যা কিনা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য। এমনকি আপনার বিশেষ নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যেমনই হোক না কেন।

এ বিষয়টিতে আরেকটু বলবেন?

আপনি যখন এ নৈতিক মানগুলো নির্ধারণ করবেন, এখান থেকে বিতরণের কোনো সিদ্ধান্ত আপনি নিতে পারেন? আমরা যুক্তি দেখিয়ে বলেছি, এ মানগুলো ভ্যাকসিন বিতরণের তিনটি ধাপকে সামনে আনে। এগুলো আমরা করেছি ক্ষতির পরিমাণ কতটা গুরুতর, তা প্রত্যাহারযোগ্য কিনা কিংবা আপনি যদি লোককে ভ্যাকসিন বিতরণ না করেন তবে আপনি অন্য উপায়ে ক্ষতিপূরণ দিতে পরেন কিনা, এসবের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এ বিশ্লেষণে মৃত্যু হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। আপনি কখনো কারো মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ দিতে পারবেন না। এটা পরিষ্কারভাবে অপরিবর্তনীয়।

প্রথম ধাপে আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মৃত্যুর সংখ্যাকে কম রাখা, সেটা হতে পারে সরাসরি কভিড-১৯-এর কারণে এবং পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উপচে পড়ার কারণে। দ্বিতীয় ধাপে আমরা চাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিচ্যুতি কমাতে, যা কিনা মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এটা অনেকদিন থাকতে পারে এবং অপরিবর্তনীয়। কিন্তু সেগুলো আমরা অন্যভাবে পুষিয়ে নিতে পারি।

ভবিষ্যতের অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের জন্য এ কাঠামোর মাধ্যমে কী শিক্ষা লাভ করা যায়?

আমি মনে করি এ কাঠামো বিশ্বব্যাপী অন্যান্য মহামারীর জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে, কারণ প্রধান নৈতিক মূল্যবোধগুলো কী এটি তা বোঝায়। তত্ত্ব ও অনুশীলন হাতে হাত রেখে চলতে পারে। এরপর এপিডেমিওলজি নির্ধারণ করবে হটস্পট কোনটা এবং আপনাকে কোথায় প্রথমে ভ্যাকসিন বিতরণ করতে হবে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান