নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী এখন গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এর চূড়ান্ত নেতিবাচক ফল ভোগ করছে বিশ্ববাসী। তবে এর মাঝে ভারত আরো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেটি হচ্ছে নগরের আগ্রাসনে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভালো থাকা কীভাবে নিশ্চিত হবে।
মুম্বাই, দিল্লি ও আহমেদাবাদের মতো কর্মসংস্থানের বড় কেন্দ্রগুলো ভাইরাসের লাগাম টানতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু এ সমস্যা যারা ঘিঞ্জি বস্তিতে থাকে তাদের জন্য আরো অনেক বেশি জটিল। যেখানে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি স্রেফ বিলাসিতার বিষয়। পাশাপাশি দরিদ্র ও অভিবাসী—এই কর্মহীনরা অদূর ভবিষ্যতে এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
এ অবস্থার প্রতিকার অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। সম্ভবত এ সমস্যার কোনো নতুন ধরনের সমাধানের প্রয়োজন নেই। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী যেমনটা বলেছিলেন: ‘গ্রাম স্বরাজ’—তার জাদুকরী মাদুলি, যেখানে কিনা তিনি আজীবন ভারতের অনেক অসুস্থতার উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছেন।
স্বরাজের বা স্বশাসনের তার যুগান্তকারী ধারণাটি আদি ভারতীয় সমাজ, এর গ্রাম এবং স্বশাসনের প্রয়োগের ভিত্তি থেকে উদ্ভূত।
গান্ধী তার আদর্শ গ্রামটিকে স্বনির্ভর গ্রাম হিসেবে কল্পনা করেছিলেন। নিজের প্রয়োজনের জন্য এটি তার প্রতিবেশীদের আনুগ্রহ থেকে স্বাধীন থাকবে। যারা এর ওপর নির্ভরশীল তারা আবার পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল।
১৯২৯ সালে গান্ধী ইয়ং ইন্ডিয়ায় লিখেছিলেন, আমি নিশ্চিত যদি ভারত সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জন করতে চায় এবং ভারতের মাধ্যমে গোটা বিশ্ব তবে আজ অথবা কাল একটি সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে। আর সেই সত্য হলো যে মানুষকে গ্রামে গিয়ে বাস করতে হবে। শহরে না, প্রাসাদে না বরং কুঁড়েঘরে। তিনি আরো লিখেন, আমরা গ্রামীণ সভ্যতার উত্তরাধিকারী। আমাদের দেশের বিশালতা, আমাদের জনসংখ্যার আধিক্য, এর পরিস্থিতি এবং জলবায়ু, আমার মতে এগুলো গ্রামীণ সভ্যতার জন্য নির্ধারিত। একে উপড়ে ফেলা বা একে বদলে নগর সভ্যতা নির্মাণ করা আমার কাছে অসম্ভব বলে মনে হয়।
লকডাউনের পর যে চিত্রটা আমরা দেখতে পাই তা হলো প্রচুর মানুষ হেঁটে, বাসে ও ট্রেনে করে গ্রামে ফিরছে। নগরের অভিবাসীরা জানে খাবার ছাড়া তাদের পক্ষে শহরে টিকে থাকা সম্ভব না। অন্যদিকে গ্রামে তাদের জন্য বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত খাবারের সরবরাহ আছে এবং থাকার জায়গায়ও তাদের কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না। যা-ই হোক, শহুরেদের যদি তাদের জায়গায় কাজ না থাকে, তবে তাদের পরিবার থেকে দূরে থাকারও কোনো কারণ নেই। শহরে তারা কম আয়ের, বিপজ্জনক কাজ করে থাকে। যা কিনা পরিচয় ও আইনি সুরক্ষার অভাবে আরো জটিল হয়। তাদের জন্য গ্রাম এখনো সামাজিক নিরাপত্তাসহ অপেক্ষাকৃত ভালো বিকল্প।
ভারতের শ্রমশক্তির এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ১০০ মিলিয়ন হচ্ছে অভিবাসী শ্রমিক, মানে বাসস্থান থেকে ভিন রাজ্যে বা নগরে গিয়ে তারা কাজ করে। যার বেশির ভাগই আসে বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে। তবে লকডাউনের পর উত্তর প্রদেশের প্রায় অর্ধমিলিয়ন শ্রমিক বাড়ি ফিরে গেছে। তাদের আর্থিকভাবে স্বাধীন করার জন্য প্রদেশের সরকার উচ্চপদস্থ বেসরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে, যেন গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করা যায়। এই কমিটিকে সার্বিক প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিয়ে অভিবাসীদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নিতে বলা হয়েছে।
উত্তর প্রদেশের সরকার শুরুর দিকে যেসব উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে তার অন্যতম হচ্ছে বন্ধ মিলগুলো খুলে দেয়া। বিশেষ করে সেগুলো যা কিনা খাবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। যেমন ময়দা ও তেলের কারখানা। এটি ডেইরির মতো ছোট ইউনিটগুলোকে ফিরিয়ে এনেছে, তাদের নিরাপত্তা প্রদান করেছে এবং স্থানীয় শ্রমশক্তিকে সাহায্য করেছে। অবশেষে এর ফলে বাইরের বাজারগুলোয়ও খাবার সরবরাহ করা গেছে।
সরকার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলোও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। যার কিনা প্রদেশে ৭০ লাখ ইউনিট রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় অংশীদারও তারা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সিদ্ধার্থ নাথ সিং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শতাধিক কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। যারা কিনা রাজ্যে তাদের বর্তমান ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করার আগ্রহ দেখাচ্ছে। মন্ত্রী বলেছেন, তারা শ্রম আইনেও কিছু শিথিলতা আনার কথা বলেছে।
গ্রাম অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুললে মানুষ নিজেদের কমিউনিটিতে থাকতে সক্ষম হবে। ছোট ইন্ডাস্ট্রি, স্থানীয় মিল, কটেজ ও বাড়িতে উৎপাদিত পণ্য এটি সম্ভব করতে পারে; যদি কার্যকর বণ্টন পদ্ধতি এবং সহায়ক আইনের দ্বারা একে সমর্থন করা যায়।
তবে আধুনিক ভারতের নগরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও অর্থনীতির খোঁজে আদর্শ গ্রামের ধারণা হারিয়ে যেতে বসেছে। যদিও তা একেবারে হারিয়ে যায়নি। কভিড-১৯ সাহায্য করতে পারে আদর্শ গ্রামের চর্চা শুরু করার ব্যাপারে। এবার আমরা চাইলে ভুলগুলো শুধরাতে পারি।
হিন্দুস্তান টাইমস





