বিবর্তনগতভাবে ভয় আমাদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা আমাদের নিরাপদ পরিস্থিতি এবং হুমকির মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে সাহায্য করে। ফলে দ্রুত হুমকির আকার নির্ণয় করা যায় এবং লড়াই করা নিয়ে পরিকল্পনা করা যায়। ভয়ার্ত পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করতে পারি, যাতে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শত্রুকে এড়ানো যায়।

কয়েক মাস ধরে গোটা বিশ্ব কভিড-১৯ নামে অদৃশ্য এক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা আমাদের সাধারণ লড়াইকে (হার্ড ইমিউনিটি) কিংবা ফ্লাইটের (সামাজিক দূরত্ব) কৌশলকে ব্যবহার করি। দুটি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সামষ্টিক প্রচেষ্টা দরকার। এ ভয়ের স্থায়ী প্রকৃতির কারণে একটি জেনারেশনাল ট্রমা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা দেশবিভাগকে বিবেচনা করা হয় জেনারেশনাল ট্রমা তৈরির জন্য। সেই সময়ের গল্প ও ছবির কারণে তার প্রভাব কয়েক দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের কারণে ট্রমা হতে পারে। এটা সামনে আসে বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি, হতাশা, অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ব, প্যানিক ও গুরুত্বপূর্ণভাবে ক্ষতির কারণে। এটা জীবন কিংবা চাকরি অথবা মূল্যবান সময়ের ক্ষতি হওয়ার কারণে হতে পারে। ট্রমা সম্পর্কিত সাহিত্য দেখায় যে অস্পষ্ট ক্ষতির জন্য সহনশীলতার বিকাশ ঘটানো কঠিন। কখনো এই মানসিক আঘাত আরো খারাপ হতে পারে যদি উৎস অজানা হয়, যেমনটা মহামারীর সময়ে হয়ে থাকে। যেখানে পৃথিবী অজানা প্রশ্ন নিয়ে সংগ্রাম করছে।

ট্রমার আকার

বহু শতাব্দী ধরে মানুষের একটা সহজাত আকাঙ্ক্ষা ছিল যে অপ্রীতিকর কোনো কিছুর উপস্থিতিকে যুক্তিযুক্ত করা, উদাহরণস্বরূপ ভূত। যখন আমরা কভিড-১৯ কে অদৃশ্য ভূত বলে ডাকছি, তখন বিজ্ঞাপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনগুলো মারণঘাতী এই ভাইরাসের একটি আকার দেয়ার চেষ্টা করছে। এর উপস্থিতি বেশ অপ্রীতিকর এবং এর কুিসত স্পাইকসমৃদ্ধ। করোনা হেলমেট ও রাস্তায় যমরাজসহ নানা ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

এসব চিত্র সম্ভবত খুব ভালোভাবেই উদ্দেশ্যপূর্ণ। সেগুলো সচেতনতা তৈরি করে এবং পরিহারের প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য এই ভয় খুব দরকারি। কিন্তু এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পরিণাম ভোগ করতে হয়। আমরা একটা অদৃশ্য ভূতকে চেহারা দিতে চাচ্ছি, যা আমাদের সামাজিক স্মৃতির অংশ, সম্ভবত এটি আমাদের নিজস্ব এপিসোডিক জেনারেশনাল  ট্রমা তৈরি করছে।

গিনা নরদিনি তার আর্টিকেল ‘হান্টেড বাই হিস্ট্রি’তে এই প্যাটার্নকে ব্যাখ্যা করেছেন মিডিয়া প্ররোচিত মাধ্যমিক ট্রমা হিসেবে। যা আমরা সম্ভবত সরাসরি অভিজ্ঞতায় লাভ করি না কিন্তু তবুও গভীর মানসিক প্রভাব থাকতে পারে। ইমেজের একটি বিশেষ শক্তি আছে ভয়কে বাস্তবিক করে তোলার এবং আমাদের উপলব্ধির বাস্তবতাতে নিয়ে আসার। জনগণের পাশাপাশি সাংবাদিকরাও বারবার এসব ট্রমাটিক চিত্র নিউজরুমে দেখানোর মাধ্যমে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের উপসর্গে ভুগতে শুরু করেন।

করোনাভাইরাসকে আমাদের মানসিকতা, ভয় ও দুঃস্বপ্নগুলোতে সহজে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্ভট স্বপ্নের বর্ধিত উল্লেখ রয়েছে। স্বপ্ন আমাদের মানসিক অবস্থার একটা উপস্থাপন। অদৃশ্য ও বিমূর্ত হুমকি এবং ট্রমা প্রায়ই স্পষ্ট চিত্র ও অর্থ গ্রহণ করে। আর আমাদের ঘুমের ধরনকে প্রভাবিত করে।

ডেইরড্রে বারেট—যিনি স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা করেন, সাম্প্রতিক সময়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা করেছেন—তিনি জানান, যারা গবেষণায় অংশ নিয়েছেন তাদের অনেকেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দেখার পাশাপাশি রূপক অনেক কিছুও দেখেছেন যেমন দানব, জম্বি ও গণশুটার। ফলে যখন ভাইরাস শরীরকে আক্রান্ত করে, সম্পর্কিত চিন্তা ও চিত্রগুলো আমাদের চিন্ত্রন প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ করিডোরকে ঘিরে ফেলে।

মহামারীকালে আমরা আমাদের মৃত্যু সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হচ্ছি এবং ক্রমাগত নিজের পছন্দের মানুষদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছি। এটি সম্ভাব্যভাবে বাহক হওয়ার এবং অন্যকে ক্ষতি করার অপরাধবোধকে জাগ্রত করে। মহামারীর সময়ে কিংবা পরবর্তী সময়ে বেঁচে যাওয়ারা অপরাধবোধে ভুগতে পারে যে তারা পছন্দের মানুষকে বাঁচাতে পারেনি অথবা শেষ বিদায়টুকুও জানাতে পারেনি। এগুলো বেশ জটিল আবেগ এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে মহামারীর সময়ে এগুলো আমদের বহন করতে হবে। এগুলো থাকবে।

এটা উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ যে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করা সত্ত্বেও এই অভিজ্ঞতার একটি ‘সম্মিলিত স্বীকৃতি’ রয়েছে, যা আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সমাজকে সুস্থ করার সুযোগ প্রদান করে।

স্ক্রলডটইন