নভেল করোনাভাইরাসের এই মহামারীকালেও মিলওয়াকের রাস্তায় অনেক আন্দোলনকারী হাজির হয়েছিলেন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’
আন্দোলনের সমর্থনে। ঘরে থাকার নির্দেশ তোয়াক্কা না করে যারা আওয়াজ তুলেছিলেন পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে। এভাবে তারা নিজেদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিলেন।
কৃষ্ণাঙ্গ নারী জডিয়ান যিনি এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তিনি বলেন, মহামারীকালীন পরিস্থিতি আপনাকে হাজারো মানুষের সঙ্গে রাস্তায় নামতে দিতে চাইবে না। কিন্তু সমাজে পার্থক্য গড়ে দিতে জডিয়ান এবং আরো প্রতিবাদকারী এই ঝুঁকি গ্রহণ করেছেন। এ মুহূর্তে কভিড-১৯ মহামারী গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করে রেখেছে। প্রতিদিন অনেকে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেক মারা যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাইরে খেতে যাওয়া কিংবা সামাজিক মেলামেশা বেশ জটিল এক অবস্থায় পড়েছে। যখন এটা প্রত্যাখ্যান করা হয় যে এই রোগ আমাদের আক্রান্ত করতে পারে, তখন এটা আমাদের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করেছে। এমনকি যারা এটা মানত যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে, তারাও সামাজিক ভিড়ে জড়ো হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছিল। সামাজিক হওয়ার প্রথাকে এজন্য হয়তো আমরা দোষারোপ করতে পারি।
হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা মিথস্ক্রিয়ার মাঝেই নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছিল। সমাজকাঠামোর বিকাশের মাধ্যমেই তারা নিজেদের রক্ষা করার উপায় বের করেছিল। যা তাদের এবং তাদের বংশধরদের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে। আদিম সম্প্রদায় এবং আমাদের প্রজন্মের মস্তিষ্ক দুটোই বেশ জটিল ছিল। যা কিনা বিকশিত করেছিল যোগাযোগের উপায়কে।
কোটি বছর ধরে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি, যা কিনা মানব মস্তিষ্ককে এর প্রতি আসক্ত করে তুলেছে। সামাজিকীকরণের তাগিদ কাটিয়ে ওঠার অর্থ সহস্র বছর ধরে বিবর্তিত হতে থাকা প্রোগ্রামিংয়ের বিরুদ্ধে যাওয়া।
বিবর্তনবাদী নৃবিজ্ঞানী ডানবার বলেন, অনেক প্রাণী প্রজাতির মতো আমরা মানুষও তীব্রভাবে সামাজিক। আমরাও প্রতিদিনকার সমস্যা সমাধানের জন্য যৌথ সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। এটাই সর্বোত্তম অভিযোজন।
মহামারীকালে করোনাভাইরাস আমাদের সামাজিক মিথষ্ক্রিয়াকে তার বিস্তৃতির জন্য ব্যবহার করেছে। অবশ্য সেই একই বিবর্তনবাদী চালকের ভেতর দিয়ে আরো কিছু বিষয় বিকশিত হয়েছে। যেমন পরোপকার এবং অন্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
মানুষ কীভাবে সামাজিক হলো
সময়ের পরিক্রমায় আমাদের পূর্বপুরুষরা ধীরে ধীরে সামাজিক হতে শুরু করে। কেবল খাবারের সন্ধানে নয়, অনেক সময় একে অন্যকে সাহায্য করা এবং কখনো শিশুদের বড় করার জন্য তারা সামাজিক হতে শুরু করে। যারা এসব অভ্যাস মেনে চলত না তারা সম্প্রদায়ের সুরক্ষা বলয় থেকে ছিটকে পড়ত। কোনো অভ্যাস প্রাণীর মাঝে স্থায়ী হলে তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যেতে থাকে। এক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটল।
সামাজিক আচরণ আদিম সম্প্রদায়কে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করে তুলল। যার অনেক কিছু জিনগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক মানুষের মাঝেও রয়ে গেছে।
ভাগাভাগি করা
বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানী মিকেইল টোমাসেল্লো বলেন, আরেকটি জটিল সমস্যা হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির দিকে চালিত হওয়ার প্রবণতা। এমনকি একটি শিশু যখন কথা বলতে পারে না, তখন আঙুল দিয়ে পাখি দেখিয়ে আপনাকে দেখতে বলে। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করা খুব প্রয়োজন।
এই আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে সহযোগিতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনবাদী সুবিধা। আর অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির কারণে বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় মানুষ নিজেকে বিকশিত করে এতদূর পৌঁছেছে। অনেক গবেষণা বলছে, মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে অনেক বেশি পরোপকারী। মানুষ তার খাবার ও শ্রম ভাগাভাগি করে। এছাড়া আমরা সহমর্মিতা দ্বারাও চালিত হই।
অবশ্য এখানে সীমাবদ্ধতাও আছে। আমরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে কারো সঙ্গে সম্পর্কিত হলে তার প্রতি পরোপকারিতা প্রদর্শন করি। দলগুলোর মাঝে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষরাও যারা তাদের রক্ষা করতে পারবে তাদের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন তারা ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য নির্ধারণ করে, একসঙ্গে কাজ করে এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বিকল্প সামাজিকীকরণ
আধুনিক মানুষের জন্য সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির প্রবণতার বিরুদ্ধে যাওয়া মানে আদিম প্রবণতার বিরুদ্ধে যাওয়া। যদিও তা অসম্ভব নয়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ উদাহরণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বলেন, যা আমাদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি ভাগাভাগি করার প্রধান হাতিয়ার। যদিও ডিজিটালি যুক্ত হওয়া সশরীর যুক্ত হওয়ার মতো এক বিষয় না। দুটো বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। তবে সামাজিকীকরণের এটা একটা উপায় হতে পারে। যদিও খুব বেশি সময় যাতে এখানে ব্যয় না হয় তাও খেয়াল রাখা দরকার। অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের বিদ্যমান সম্পর্ককে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে সংক্ষেপে অনূদিত





