নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ১০ মাসের বেশি সময় ধরে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। প্রথম ঝড় পেরিয়ে এখন বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় ঝড়ও দেখা দিতে শুরু করেছে। গত ১০ মাস এ রোগের সঙ্গে লড়াই করেছেন ডাক্তার, নার্সসহ জরুরি স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা তিনজন ডাক্তার জার্মান সংবাদমাধ্যম ডার স্পিয়েগেলকে জানিয়েছেন এ সময়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আশঙ্কার কথা। তারই চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো—
‘এটা ভাবা ভুল হবে যে আমরা মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি’
আমাদের ১৮ বেডের আইসিইউতে বর্তমানে ১২ জন কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী আছে। একজন এখানে আছে বসন্তের সময় থেকেই এবং তিনজন আছে গ্রীষ্মকালীন সময় থেকে। সচরাচর গুরুতর অবস্থায় রোগীদেরকে আমাদের ফুসফুসের চিকিৎসা করতে হয়। এরই মধ্যে আমাদের সবচেয়ে কম (২৭ বছর) বয়সে মারা যাওয়া একজন রোগীও রয়েছে।
ভেন্টিলেটরে আমাদের অনেক রোগীকে পেটে ভর দিয়ে শুয়ে থাকতে হয়। আমরা তাদের দিনে একবার পিঠে ভর দিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য। তাদের আল্ট্রাসাউন্ড করে দেখতে হয় এবং দেখতে হয় সব টিউব জায়গামতো আছে কিনা। যদি সব ঠিকঠাক থাকে তবে তাদের আবার পেটের ওপর ভর দিয়ে শুইয়ে দিতে হয়। এটা প্রচুর সময় নেয় বিশেষ করে নার্সদের। কিন্তু ডাক্তারদেরও এসব প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় এবং একজন রোগীর পেছনে অর্ধেক দিন ব্যয় করতে হয়। একজন রোগীর জন্য সাধারণত আমাদের পাঁচজনের প্রয়োজন হয়। ডাক্তারকে রোগীর মাথা ধরতে হয় এবং দুজন করে নার্সকে দুপাশে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। যদি রোগীর কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রয়োজন হয়, তবে আমাদের ষষ্ঠ আরেকজন ব্যক্তির প্রয়োজন হয়, যিনি ডিভাইসের ওপর নজর রাখবেন।
ডাক্তার হিসেবে আমরা ১২ ঘণ্টা শিফটে কাজ করি এবং আমি এখনো অত্যধিক চাপ অনুভব করছি না। কিন্তু আমরা যদি শিগগিরই অধিকসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা করতে চাই, তবে আমাদের আরো অনেক ইনটেনসিভ কেয়ার বেডের প্রয়োজন হবে। আমি উদ্বিগ্ন আছি সামগ্রিক চিকিৎসা সেবার মান হয়তো নিম্নগামী হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ফুসফুসের গুরুতর সমস্যা থেকে বেঁচে ফিরে আসা ব্যক্তিদের খুব অল্পজনই কিন্তু আগের স্বাস্থ্য অবস্থায় ফিরে আসতে পারে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব কমই আলাপ হয়। আর পারলেও সেটা মাস এমনকি কখনো কখনো বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। তাই এটা ভাবা একেবারেই ভুল হবে যে আমরা রোগটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি।
ইয়াওসি লি.: ইন্টারনাল
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক ফর ইনকেশনালজি অ্যান্ড নিউমনোলজি, বার্লিন চ্যারিটে ইউনিভার্সিটি হসপিটাল
‘আমাদের হাতে আর যথেষ্ট স্টাফ নেই’
আমরা এখনো যেকোনো সমস্যা নিয়ে আসা রোগীদের গ্রহণ করছি, সেটা হতে পারে কোমরের সমস্যা, টনসিল কিংবা অন্য কোনো অপারেশন। আমাদের করতে হয় অর্থনৈতিক কারণে। কভিড-১৯-এর রোগীদের জন্য বেড খালি রাখতে ফেডারেল সরকারের ক্ষতিপূরণ দেয়ার যে নীতি তা অক্টোবরের ১১ তারিখ শেষ হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখন নিজেদের খরচে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। রোগীদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে এবং অনেকে অপারেশন এড়িয়ে যাচ্ছে।
মূলত হাসপাতালের কর্মীদের উপস্থিতি নিয়ে আমাদের এখন সংকটে পড়তে হচ্ছে। যেসব ব্যক্তির ঠাণ্ডার সমস্যা দেখা গেছে কিংবা গলা ব্যথার উপসর্গ দেখা গেছে তাদের সতর্কতামূলকভাবে বাসায় থাকতে হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে সচরাচর যত মানুষ অসুস্থ থাকে তার চেয়ে বেশি আমাদের এখন দেখতে হচ্ছে। এমনকি পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে আরো শোচনীয়। পাশাপাশি ভালো না থাকার পরও যারা কাজে ফিরে আসছে তাদের তখন অবশ্যই কভিড-১৯ টেস্ট করাতে হবে। পরীক্ষা পজিটিভ এলে আমাদের তখন সব যোগাযোগ ট্রেস করতে হয় এবং অন্য সহকর্মীদেরও কোয়ারেন্টিনে পাঠাতে হয়।
হামবুর্গে রোগী ও কর্মচারী কোথায় থাকে তার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জড়িত। স্বাস্থ্য অফিস একদম ভিন্ন নির্দেশনা জারি করেছে। আমাদের এমন একটি উদ্ভট পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হচ্ছে যেখানে যার কভিড হয়েছে, সে হয়তো কোয়ারেন্টিন থেকে ফিরে এসেছে, কিন্তু যারা নেগেটিভ এসেছে তাদের হয়তো আরো অতিরিক্ত তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে।
যখন একজন সংক্রমিত ব্যক্তির কারণে আটজন নার্স ১৪ দিনের
জন্য অনুপস্থিত ছিল, ফলে আমাদের দুদিনের মধ্যে তাদের ওয়ার্ডে বেড সংখ্যা ৩৪ থেকে ২০-এ নামিয়ে আনতে হয়েছিল। যার অর্থ হচ্ছে আমাদের আগে থেকে থাকা রোগীদের ছেড়ে দিতে হয়েছিল এবং নতুন রোগীর ভর্তি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এর ফলে আমাদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণ স্টাফ থাকল না এবং নার্সিং কেয়ারের ন্যূনতম যেসব নীতি তাও লঙ্ঘিত হচ্ছিল। এই ন্যূনতম নীতি অবশ্য মার্চেই বাতিল করা হয়েছিল কিন্তু আগস্টে আবার তা বহাল করা হয়। যদি দ্বিতীয় ঝড় বেড়ে যায় তবে এটি হয়তো আবার সরে যাবে। পাশাপাশি সরকারকেও হয়তো আবারো আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে, যদি হাসপাতালগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হয় এবং সঠিক সেবা নিশ্চিত করতে হয়।
হেলমুট বুরে, প্রধান ফিজিশিয়ান, গেরিয়াট্রিক ক্লিনিক, হামবুর্গ
‘প্রতি তিনজনের একজন মারা গেছে’
আমরা বর্তমানে ১১৪ জন রোগীর চিকিৎসা করছি, যারা কভিড-১৯-এ আক্রান্ত, যেখানে ৩১ জন আইসিইউতে আছে। গ্রীষ্মে কয়েক সপ্তাহে আমাদের হাতে দুই-তিনজন রোগী ছিল। দুই সপ্তাহ ধরে এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যেখানে কিছু রোগীকে ভেন্টিলেটরে রাখার প্রয়োজনও পড়েছে, যাদের উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতিই ঘটেনি। যদিও তাদের অনেকের ফুসফুস মারাত্মকভাবে আক্রান্ত, তবে অনেক রোগীই প্রথম দিকে কম শ্বাসকষ্ট বোধ করে। পাশাপাশি কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থাকে, তবে তাদের কিডনি ফেইলিওরের মতো অঙ্গহানির ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া কভিড-১৯-এর রোগীদের রক্ত জমাট বাঁধার হারও অন্যদের চেয়ে বেশি, যা স্ট্রোক, থ্রম্বোজ কিংবা এম্বোলিজমের কারণ হতে পারে।
করোনাভাইরাসের প্রথম ঝড়ের সময় আমাদের আইসিইউতে প্রতি তিনজন রোগীর একজন মারা গেছে। তখন থেকে এ রোগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেকের মৃদু উপসর্গ দেখা যায়, কিন্তু তাদের বেশির ভাগই তরুণ এবং অনেকেরই বাড়তি কোনো সমস্যা নেই।
এখনো আমাদের হাতে উপযুক্ত চিকিৎসা নেই। আমাদের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়, সব ধরনের শ্বাসকষ্টের রোগীকে যেমন দেয়া হয় সেভাবে। কিন্তু এমন কোনো বিশেষ ওষুধ নেই যা কভিডের বিরুদ্ধে সরাসরি কাজ করে। অনেকেই রেমডিসিভির নিয়ে কথা বলছেন, কিন্তু তার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
গ্রীষ্মজুড়ে এপিডেমিওলজিস্ট ও ভাইরোলজিস্টরা শরতের ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সব চেষ্টা সত্ত্বেও আমরা প্রথম ঝড়ে অনেক বেশি রোগীকে সাহায্য করতে পারিনি। আমি বুঝতে পারছি না কেন এখনো অনেকে এ রোগের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারছেন না।
থোর্সটান বার্নার, ডিরেক্টর, ক্লিনিক ফর অ্যানেস্থেসিওলজি অ্যান্ড ইন্টেনসিভ কেয়ার, ইসেন ইউনিভার্সিটি হসপিটাল।
ডার স্পিয়েগেল





