‘এ সময়ে এসে আমি আমার সিনিয়র সহকর্মীদের শিক্ষিত করার আশা হারিয়ে ফেলেছি।’
সম্প্রতি একটি অনলাইন ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব সম্পর্কিত লম্বা বিতর্কের পর আমি মজা করে কথাটা বলেছিলাম।
‘এমন কথা বন্ধ করুন’,
অন্যরা প্রতিবাদ করে বললেন। তবে সত্যি কথা হচ্ছে, আমার আশা আছে। যে আশা সরাসরি তরুণ প্রজন্মের কাঁধে অর্পিত হয়েছে, যাদের মধ্যে কুসংস্কারের বোঝা নেই। আমাদের জুনিয়র সহকর্মীরা নতুনত্বের আলোকবর্তিকা বহনের জন্য যথেষ্ট পক্ষপাতহীন। মাটিকে যেভাবে আকার দেয়া হয়, তারাও নতুনকে ঠিক সেভাবে আকার দেয়ার মতো উদ্যমী এবং ভয়হীন। পাশাপাশি তারা এটাও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে ভবিষ্যৎ অতীতের চেয়ে আলোকিত হতে পারে।
কভিড-১৯-এর কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজেট সংকুচিত হয়ে নিয়োগ স্থগিত হয়ে যাওয়া একাডেমির ভবিষ্যেক একধরনের বিপন্নতার মাঝে ফেলে দিয়েছে। সে সঙ্গে চাকরির সুযোগ হ্রাস পাওয়া পোস্টডক্টরাল ফেলো এবং জুনিয়র শিক্ষকদের ক্যারিয়ারকে হুমকিতে ফেলেছে। মার্চ ২০২০ সালে কিছু অনুষদের নিয়োগ পরিকল্পনা কোনো ধরনের প্রস্তাবনা ছাড়াই বাতিল হয়েছে। এমনকি নতুন কোনো নিয়োগের সূচিও এখন পর্যন্ত আর ঠিক করা হয়নি। এসব পরিস্থিতিকে এখন এসে আরো কঠিন করে তুলেছে।
অবশ্য বর্তমান অর্থনৈতিক দৈন্য অবস্থা যদি আরো কয়েক বছর ধরে অব্যাহত থাকে, তবে তা ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে থাকা একদল বিজ্ঞানীকে একাডেমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করবে। এরই মধ্যে অনেকেই এখান থেকে ছেড়ে যেতে শুরুও করেছে। যদি এমনটা ঘটে, তবে তা বিজ্ঞানের ওপর একটি স্থায়ী আঘাত নিয়ে আসবে। এখানে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে। ‘গ্লাসনস্ত’-এর সময় অনেক বিজ্ঞানী সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে যাওয়ার পর যে শিক্ষাটি কর্তৃপক্ষ পেয়েছিল তা হলো, প্রতিভাবান মানুষদের সংখ্যা আকস্মিভাবে হ্রাস পাওয়ার পর সেই অবস্থা থেকে পুনরুত্থান ঘটানো কঠিন।
সামনের বছরগুলোতে এনএসএফ, নাসা, ডিওই কিংবা ব্যক্তিগত ফাউন্ডেশনগুলোকে অবশ্যই জুনিয়র গবেষকদের প্রতি জরুরি সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে, যাদের কিনা ব্রিজ তহবিলের জন্য আরো এক কিংবা দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে। এটা আমাদের ভবিষ্যতের কঠিন সময়ে এক ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
কিন্তু একাডেমির জন্য চ্যালেঞ্জটি স্নাতকোত্তর চাকরি থেকে স্নাতক পূর্ববর্তী শিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মহামারীকে দমন করার জন্য একটি কার্যকর ভ্যাকসিন আসার পর শিক্ষাব্যবস্থা কি সরাসরি ক্লাসে ফিরতে পারবে কিংবা শিক্ষার্থীরা কি স্বল্প খরচে নিজেদের পছন্দমতো জায়গা থেকে অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত হতে পারবে? এর উত্তর নির্ভর করবে সামনের বছরগুলোতে অনলাইন শিক্ষার সরবরাহ এবং চাহিদার ওপর।
মৌলিকভাবে, অন্তর্নিহিত প্রশ্ন হচ্ছে শিখন প্রক্রিয়াটি কি অনেকটাই তথ্যের স্থানান্তর সম্পর্কিত নাকি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক মিথষ্ক্রিয়াও বটে? একজন চাইলে দরকার মতো দুদিক থেকেই তর্ক করতে পারেন। একটি সমঝোতার সাময়িক গতি হতে পারে অনলাইন ক্লাসের উেসর পরিবর্তে যেসব ভিন্ন জায়গায় সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া সংগঠিত হয় সেখানে। এরই মধ্যে এখনই অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় ভাগাভাগি করে অ্যাপার্টমেন্ট নিয়েছে। এটা হতে পারে হাওয়াইয়ের সমুদ্র সৈকতে কিংবা তাদের প্রিয় শহরের পছন্দসই কোনো স্থানে। এমনটা অবশ্য এরই মধ্যে দেখা গেছে। বলা যায়, সব জায়গাতেই ক্লাস হতে পারে, কারণ ক্লাসই হচ্ছে অনলাইনে।
এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গৃহস্থালির দায়িত্বের দিকে কভিড-১৯ একটি বাধ্যতামূলক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। যেখানে শিশুদের এবং বৃদ্ধদের দেখাশোনা করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত, যা কিনা অনেক বিজ্ঞানীর উৎপাদনশীলতার দিক থেকে অনিবার্য ক্ষতি নিয়ে এসেছে। এ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ল্যাবভিত্তিক গবেষণাগুলোর ওপর। যেখানে শারীরিক উপস্থিতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘরোয়া কজে আবদ্ধ হয়ে পড়া মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাকেও বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার কোনো ক্ষেত্রে এ মহামারী অর্থনৈতিক বৈষম্যকে বৃদ্ধি করেছে, হুমকিতে ফেলেছে লৈঙ্গিক সমতাকেও। অনেক বাসায় ঘরোয়া কাজে নারীদের অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে হচ্ছে। এসব সমস্যাকে অবশ্যই একাডেমিক প্ল্যানিং কমিটির দ্বারা উল্লেখিত হতে হবে, যা কিনা কলেজের পদোন্নতি এবং চাকরির মেয়াদের নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলবে। এটা করা হবে মূলত বৈচিত্র্য এবং সমতাকে নিশ্চিত করার জন্য।
কিন্তু গত কয়েক মাসে অনলাইন যোগাযোগগুলো ছোটখাটো অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রস্তাব করতে পেরেছে। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইন কনফারেন্স ভ্রমণের সময় ও খরচ বাঁচায়। এখন দর্শকদের সম্পৃক্ত করতে অনলাইন কনফারেন্স পরিবর্তিত হয়েছে বিতর্ক ও সংলাপের দিকে। যেখানে রেকর্ডেড লেকচার ভিডিও সরবরাহ করা হয়, যা কিনা সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
‘জুম’
প্রযুক্তি সামনে আসার হাজার বছর আগে প্রশ্ন-উত্তর ধরনের যে সংলাপ তা করে দেখিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস। যেটি তিনি ব্যবহার করেছেন শেখার সেরা উপায় এবং সমালোচনামূলক চিন্তাধারাকে উদ্দীপ্ত করার জন্য। কনফারেন্সের সুবিধার পাশাপাশি, বিরক্তিকর প্রশাসনিক মিটিংগুলো এখন আর সময়ের অপচয় নয়। নিষ্ক্রিয় অংশগ্রহণকারীরা নীরবেই ক্লাস করার সময়ে নিজেদের কম্পিউটারে অন্য কাজগুলো চালিয়ে যেতে পারেন। আরো সাধারণভাবে বললে, অপ্রত্যাশিত দর্শকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ না হওয়ার কারণে প্রথমবারের মতো আমাদের অনুমতি দেয় অভ্যন্তরীণ একটা প্রশান্তি লাভ করতে। অনেক আগে যেমনটা প্রস্তাব করেছিলেন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ফাইরহো ও এপিকিউরাস। এটি মাথায় রেখেই আমি সামাজিক দূরত্ব ট্রেন্ডে পরিণত হওয়ার আগে তার পক্ষে কথা বলে আসছিলাম।
যে উপায়েই হোক না কেন একাডেমিক জীবন আজীবনের জন্য বদলাতে যাচ্ছে। কভিড-১৯ দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতিকে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে আরো ভালো বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। নির্দিষ্ট মাত্রার একটি ধাক্কা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর সুযোগ করে দেয়। আমাদের পথনির্দেশক মূলনীতিগুলোর সঙ্গে এবং প্রশাসনিক অদক্ষতাকে ত্যাগ করে এটিকে আরো ভালোভবে সূত্রবদ্ধ করা যেতে পারে। এটা করতে হলে আমাদের তরুণ সহকর্মীদের কাছ থেকে ধারণা পাওয়া জরুরি। যার প্রভাব কিনা প্রাথমিকভাবে তাদের ওপরই পড়বে। এখন এটা নিশ্চিত করা জরুরি যে তারা বর্তমান অর্থনৈতিক ধাক্কায় টিকে থাকতে পারবে এবং বিপরীতে একাডেমির একটি আরো ভালো সংস্করণ সামনে আনতে পারবে, যা আসবে, প্লেটোনিক একাডেমির প্রাথমিক সংস্করণের পর থেকে উন্নতির সুন্দর সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





