আমাদের ইমিউন সিস্টেমের মধ্যে থাকা ঘড়ি ও ক্যালেন্ডার, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে বা বছরের নির্দিষ্ট কিছু মাসে সংক্রমণের জন্য শরীরকে আরো বেশি সংবেদশনশীল করে তুলতে পারে। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। ইমিউন সিস্টেমের এমন আচরণ সম্পর্কে আরো বেশি জানতে পারলে তা হয়তো সংক্রমণ রোধ করা এবং রোগের চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে আরো বেশি সাহায্য করবে। পাশাপাশি ফ্লু কেন শীতকালে বেশি সংক্রমিত করে এবং মাল্টিপল স্কেলেরোসিস কেন গ্রীষ্মে অধিক খারাপ হয়, সে সম্পর্কেও ভালোভাবে জানা যাবে।

যদিও সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে যে আমাদের ইমিউন কার্যক্রমে মৌসুমি কিংবা দৈনিক সার্কাডিয়ান রিদমের (এটি দিয়ে মূলত কোনো প্রাণীর শরীরিক, মানসিক কিংবা আচরণগত পরিবর্তনকে বোঝায়) প্রভাব আছে। যদিও বড়সংখ্যক মানুষের মধ্যে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এটা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রয়েল কলেজের পোস্টডক্টরাল গবেষক ড. ক্যাথি ওয়াইজ বলেন, শতবর্ষ ধরে এটা স্পষ্ট যে কিছু নির্দিষ্ট রোগের জন্য শীতকালে অধিক সংবেদনশীল। কিন্তু আমরা এখনো জানি না শরীর সেখানে কী ভূমিকা পালন করে। তদন্তের জন্য ওয়াইজ এবং তার সহকর্মীরা প্রায় ইউকে বায়োব্যাংক স্টাডি থেকে ৩ লাখ ২৯ হাজার ২৬১ জনের রক্ত সংগ্রহ করেন। যেখানে তারা দেখতে চেয়েছিলেন দিনের বা মৌসুম যে সময়টাতে এ নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল ইমিউন সেলের ওপর তার কেমন প্রভাব ছিল। তারা শ্বেত রক্তকণিকার অনেকগুলোতে এবং রক্তে প্রদাহ চিহ্নিতকারী অঞ্চলে স্পষ্টভাবে ওঠানামা লক্ষ করেছিলেন। এ পর্যবেক্ষণ জানায়, আমাদের ইমিউন কার্যক্রম দিন বা মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে দুর্বল কিংবা শক্তিশালী হতে পারে। ওয়াইজ বলেন, এটা সেই ধারণাটিকে সমর্থন করে, যা বলে ইমিউন সিস্টেমে অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ও ক্যালেন্ডার থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই যে বৈচিত্র্য তা পরিবেশ কিংবা জীবন ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এমনকি ভিটামিন ডি লেভেলের সঙ্গেও না। ইম্পেরিয়েল কলেজ লন্ডনের ড. রাচেল এডগার বলেন, আমাদের বডি ক্লকের কারণে ইমিউন সিস্টেমে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এটি একটি সহজাত প্রক্রিয়া, যা আমাদের সময় ট্র্যাক করতে সক্ষম করে তোলে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরের সক্রিয় সময়ের শুরুতে লিম্ফ নোডে শ্বেত রক্তকণিকা জমা হয় এবং রক্তে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে ইঁদুরকে তাদের বিশ্রামের দিকে চালিত করে। লিম্ফ নোডে যা ঘটে তা ভ্যাকসিন এবং সার্স-কোভ-২-এর ভাইরাসের ক্ষেত্রে আমাদের ইমিউন প্রতিক্রিয়ার মূল চাবিকাঠি। ইঁদুরের ওপর ও ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে করা পরীক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে এডগার বলেন, সার্স-কোভ-২-এর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন যদি দিনের শুরুতে প্রয়োগ করা হয় তবে তা অধিক কার্যকারিতা দেখাতে পারে।

যদিও এ পদ্ধতি পরীক্ষিত না এবং ওয়েইজ তার ফলাফলগুলোর অতিরিক্ত ব্যাখ্যার ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন। ল্যাবরেটরি অব মলিকিউলার বায়োলজির মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল ড. জন ও’নীল বলেন, এখানে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটি হলো, নিদের বেলাতে সম্ভাব্য রোগজীবাণুগুলো শনাক্তকরণ এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেম অধিক বিকশিত থাকে। কারণ এ সময়টাতে মানুষ সবচেয়ে বেশি রোগজীবাণুর সংস্পর্শে আসে। যিনি এর আগে দেখিয়েছেন যে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতের কাজে জড়িত কোষ দিনের বেলায় ক্ষত সারিয়ে তোলার কাজ আরো দ্রুত করতে পারে। প্রফেসর টামি মারটিনো বলেন, এ অনুসন্ধানগুলো দারুণ। যা নিশ্চিত করে বায়োলজিক্যাল টাইমিং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা জরুরি।

দ্য গার্ডিয়ান