গত কয়েক সপ্তাহে উপসর্গহীন রোগীদের কভিড-১৯ পরীক্ষা না করানোর ব্যাপারে উৎসাহ দিয়ে ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) নেয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে ব্যাপকভাবে ক্ষোভ দেখিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য নীতি, শিক্ষা প্রচার এবং সংক্রমণ রোধের কৌশল নির্ধারণের জন্য ডায়গনস্টিক টেস্টিং এজন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি দুনিয়াব্যাপী টেস্টিং পদ্ধতি তদন্ত করেছি, আমি আশঙ্কা করছি বেশি টেস্টের ওপর জোর দিতে গিয়ে এ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু থেকে আমাদের দৃষ্টি সরে যাচ্ছে।

অনেক সরকার পরীক্ষার ওপর তাদের প্রত্যাশা নিবদ্ধ করেছে। যুক্তরাজ্য সরকার পরিকল্পনা করছে অক্টোবরের শেষ দিকে গিয়ে প্রতিদিন পাঁচ লাখ টেস্ট সম্পন্ন করার। যা কিনা বর্তমান সংখ্যার চেয়ে দ্বিগুণ। ভারতের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিদিন এক মিলিয়ন টেস্টের ঘোষণা দিয়েছে। নীতিনির্ধারকরাও চেষ্টা করছেন এ সমস্যা থেকে বেরুতে অভিনব উপায় চেষ্টা করে দেখতে। ডায়াগনসিসের গতিকে ত্বরান্বিত করতে ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) ১.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু এমন বিস্তৃত পরীক্ষা কোনো উপকার করে না যদি তা অগোছালো, জটিল ও অসম সামাজিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।

এপ্রিলের শুরুতে যুুক্তরাজ্য সরকার কয়েক হাজার সেলফ-সোয়াভ কিটস ঘরে ঘরে পাঠায়। কিন্তু নানা কারণে দুই-তৃতীয়াংশ টেস্ট হতেই পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্য সরবরাহকারীরা বিকল্প ল্যাবরেটরিগুলোর দিকে যেতে পারবেন না। এমনকি যদি কোনো মনোনীত ল্যাবে অত্যধিক চাপে থাকে কিংবা কম দক্ষতা প্রদর্শন করে তবুও।

বৈষম্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অবিশ্বাস এবং অন্য জটিলতাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্যান্য ধনী দেশে সাদাদের পরীক্ষা করানো সহজ। কিন্তু জরুরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি—মুদি দোকানে কর্মরত কর্মী, বাস ড্রাইভার এবং ক্লিনারদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ লোকই অশ্বেতাঙ্গ ও দরিদ্র। যাদের সংক্রমণের অনেক বেশি ঝুঁকি থাকে। সেজন্য তাদের টেস্ট করার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয় কিন্তু তারা সুযোগ পায় সবচেয়ে কম। সিডিসির নির্দেশনা পরিবর্তন সম্ভবত এ বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে দেবে।

এর বাইরে যা তা হলো কয়েক দশকের বৈষম্য ও দুর্ব্যবহারের পর অশ্বেতাঙ্গ মানুষগুলো টেস্ট করাতে, কন্টাক্ট ট্রেসারের জন্য ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ব্যাপারে যুক্তিযুক্তভাবে দ্বিধাবোধ করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে অনেকেই অন্যায্যভাবে নজরদারির শিকার হয়েছে।

সর্বশেষে টেস্ট-ট্রেস-আইসোলেট এ পদ্ধতি কেবল সেক্ষেত্রেই যৌক্তিক মনে হয় যারা বড় বাড়িতে থাকে এবং দূর থেকে কাজ করতে অভ্যস্ত। কিন্তু যারা ভিড়সম্পন্ন অ্যাপার্টমেন্টে থাকে এবং যারা বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ পায় না তাদের জন্য ‘আইসোলেশন’ রীতিমতো অসম্ভব।

কভিড-১৯ নিয়ে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বেশ শিক্ষণীয়। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছিল দেশটি বেশ সফল হতে যাচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না দেশটির নেতারা বুঝতে পারল যে অভিবাসী শ্রমিকদের মাঝে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ শ্রমিকরা ডরমিটরিতে থাকে, যেখানে একসঙ্গে অনেক মানুষের বাস। সিঙ্গাপুর দ্রুত ডায়াগনস্টিক সুবিধা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ৩ লাখ ৩২ হাজার শ্রমিককে পরীক্ষা করতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ মাস। যেখানে ৫২ হাজার ৯৬৮ জন শ্রমিক টেস্টে পজিটিভ আসে। যা কিনা দেশটির সম্মিলিত করোনা আক্রন্তের সংখ্যার চেয়ে ৯৬ শতাংশ বেশি।  এরপর শ্রমিকদের বেশির ভাগকে ডরমিটরিতেই রাখা হয়। উদ্বেগ ও হতাশা বাড়তে থাকে এবং রোগও স্থির থাকে।

তবে একটা ভালো সংবাদ হচ্ছে অনেক সরকার এ বৈষম্যজনিত সমস্যাগুলোকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সেটি বিবেচনায় নিয়েই তারা সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে।

নেচার