পূর্ব জার্মানির রাজ্য থুরিনগিয়ার গভর্নর বডো রামেলো তার অফিসে বসে বাস নিয়ে কথা বলছিলেন। দুটি বাস যার প্রথমটি হাঙ্গেরির লেক বাল্টন থেকে স্কুল শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়েছিল এবং অন্যটি অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের বাড়ি নিয়ে আসার জন্য তুলে নিয়েছিল চেক রিপাবলিকের স্পা টাউন ফ্রানটিসকোবি থেকে। দুটি বাসেই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত মানুষ ছিল। রামেলো বলেন, অবসরপ্রাপ্তদের মাঝে এটি ছড়িয়েছে বেশ তীব্রভাবে কিন্তু শিশুদের মাঝে ততটা নয়।

যদি আপনি এই দুটি বাস ভ্রমণকে ভাইরাসের আচরণের প্রতিনিধি হিসেবে ধরে নেন, তবে এটি সমানে আনে মহামারীকালের শুরুতে রাজনীতিবিদদের দুটি উল্লেখযোগ্য ভুলকে। যেখানে একটি ছিল সার্স-কোভ-২-এর বিস্তৃতি থামাতে ডে কেয়ার সেন্টার এবং স্কুল বন্ধ করা। বিপরীতে বয়স্কদের বিশেষ সুরক্ষার বিষয়টি খারিজ করা হয়।

কিন্তু মহামারীর শুরুতে পরিস্থিতি এতটাই নতুন এবং অনিশ্চিত ছিল যে ‘ভুল’ শব্দটি তেমন প্রভাব ফেলে না, যেমনটা এটি সচরাচর করে থাকে। এ ধরনের ভুল অমার্জনীয় হয়ে যায় যখন এর থেকে কোনো শিক্ষা না নেয়া হয়।

তারা আসলে ব্যবস্থা কী নিয়েছিল? সাত মাস মহামারীর অধীনে লড়াই করেছে জার্মানি এবং এর ছায়ার নিচেই ঢাকা পড়েছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কঠিন একটি বসন্ত এবং তুলনামূলক স্বস্তির গ্রীষ্ম কাটানোর পর দেশটি এখন শরৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। কেউ জানে না কী ঘটতে যাচ্ছে। ক্রিসমাসে গিয়ে প্রতিদিন ১৯ হাজার ২০০ সংক্রমণ দেখার সম্ভাবনার কথা বলেছেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেল।

কিন্তু এখন আমরা জানি যে সংক্রমণের সংখ্যা এককভাবে করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছু বলে না। যদিও জার্মানির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মিডিয়ার জন্য এ সংখ্যা এখনো মনোযোগের কেন্দ্রে। তো আমরা আসলে কী শিখলাম।

সব মিলিয়ে ভাইরাস, এর আচরণ এবং প্রভাব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য ভিত্তিও অনেক মজবুত হয়েছে। এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। যে কারণে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশ্ন থাকছে। কোনটি যৌক্তিক? স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও উন্নতি উদ্বেগের এ ত্রয়ীর মাঝে কোন সিদ্ধান্তটি নেয়া সঠিক? স্বাস্থ্য অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়ার বিষয়। কিন্তু স্বাধীনতা ও উন্নতির লক্ষ্যে দ্বিতীয় লকডাউন এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সন্দেহ পোষণকারী

আপনি যদি রেনে গোটশালককে বলেন জার্মানি সৌভাগ্যবান, কারণ মহামারী এখানে সেভাবে আঘাত হানতে পারেনি। তখন তার উত্তর, না এটা তা নয়। এটা ভাগ্য না। এটা মূলত কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেম। হাসপাতালে যথেষ্ট পরিমাণ বেড আছে এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সংক্রমণ চিহ্নিত করার উপযুক্ত ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে শুরুর দিকের কন্টাক্ট ট্র্যাকিং, যা কিনা সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল।

অবশ্য তার প্রতিক্রিয়ার মাঝে আত্মসম্মানের বিষয় জড়িত। গোটশালক ইনফেকশনোলজিস্ট ও ফ্রাংকফুর্ট শহরের পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টের প্রধান।

২০০৩ সালে সার্স সংক্রমণের সময় গোটশালক হংকং উড়ে গিয়েছিলেন। বিস্তৃতভবে মাস্কের ব্যবহারের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য কর্তাদের অন্যান্য বিধি ভাইরাসকে অদৃশ্য করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি বলেন, এর ফলে বাতাসে ভাসমান অন্যান্য ভাইরাসের বিস্তৃতিও কমানো গিয়েছিল। এ শিক্ষা যা দেখায় তা হলো, যদি মানুষ নিয়মিতভাবে মাস্ক পরে তবে দুঃস্বপ্ন কয়েক মাসেই শেষ হতে পারে।

অ্যাঙ্গেলা মেরকেল এবং চ্যান্সেলারি চিফ অব স্টাফ হেলগে ব্রাউন শুরুতে একমত ছিলেন না। তারা উল্টো ভেবেছিলেন মাস্ক বিপরীত ভূমিকা রাখবে। পরিবর্তে তারা মাঝারি মানের লকডাউন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

গোটশালক সে সময় এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি বলেন, আমাদের পরিষ্কার হতে হবে আমরা এখানে কী নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা কথা বলছি অসুস্থতা নিয়ে যা ৮০ শতাংশ লোকের কোনো সমস্যা করে না। খুবই স্বল্পসংখ্যক মানুষ এতে মৃত্যুবরণ করেছে। জার্মানিতে এটা ছিল ০.৪ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত।

এর কারণ কি জার্মানি যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সেগুলো? নাকি জার্মানি লকডাউন ছাড়াও তুলনামূলকভাবে এ রকম থাকত? অবশ্য এ আলোচনার হয়তো কোনো শেষ নেই।

গোটশালক প্রস্তাব করে বলেন, বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা লোকদের রক্ষা করার কথা। অর্থাৎ বয়স্ক লোকদের এবং যাদের আগে থেকে সমস্যা আছে তাদের রক্ষা করা, অন্য কথায় বলতে গেলে দুই নাম্বার বাসের লোকদের রক্ষা করা।

তিনি বলেন, জনগণের বড় একটি অংশ সরকারের নেয়া বিধিনিষেধগুলোর ওপর বেশ আস্থাও স্থাপন করেছে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী

সকালগুলো বাজে, বলেছেন আরমিন লাশেট ও মার্কুস সোডার। এ দুজন ছিলেন মহামারীর বিরুদ্ধে জার্মানির লড়াইয়ের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। লাশেট উত্তর রিনে-ওয়েস্টফিলিয়ার কনজারভেটিভ গভর্নর। সোডার একই দায়িত্ব পালন করছেন বাভারিয়ায়। তারা দুজনই বলেন, মহামারীকালে সকালে ঘুম থেকে ওঠাটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। বিশেষ করে এজন্য যে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হতো।

তারা ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও অবস্থা যাছাই করতে থাকেন, কারণ এর ভিত্তিতে তাদের করণীয় ঠিক করতে হতো। তারা কদাচিৎই বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেতেন, যা তাদের প্রয়োজন। কিন্তু এর পরও তাদের সিদ্ধান্ত নিতেই হতো। তবে দুজনই অবশ্য ভিন্ন চরিত্রের লোক। সবকিছু নিখুঁত না হওয়ার পরও সোডার নিজের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। বিপরীতে লাশেট সবকিছুকে নিখুঁত ভাবেন না। তিনি বরং তার ভুল নিয়েই কথা বলতে পছন্দ করেন।

সংকটের শুরুতেই জার্মানি স্কুল-কলেজ বন্ধ করার পথে হেঁটেছে। মার্চে এ সিদ্ধান্ত এসেছিল ভাইরোলজিস্ট ক্রিস্টিয়ান ড্রোসটেনের এ সমস্যা নিয়ে আকস্মিকভাবে অবস্থান পরিবর্তনের কারণে। ড্রোসটেন দ্রুতই জার্মান সরকারের শীর্ষস্থানীয় মহামারী বিষয়ক উপদেষ্টায়ও পরিণত হন। লাশেট সে সময় নিশ্চিত ছিলেন না কী করবেন। কিন্তু তিনি জানতেন কিছু একটা করতে হবে। তাই তিনি রাজ্যে স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্তে মত দেন। যদিও তিনি মনে করেন, আজকে এসে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না, কারণ এর মারাত্মক সামাজিক ফলাফল রয়েছে। একটি ভুল যার কাছ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন। তবে সোডার নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আত্মবিশ্বাসী, কারণ তার নীতি ভালোভাবেই গৃহীত হয়েছে। অবশ্য জনপ্রিয়তা বিবেচনায়ও তিনি লাশেটের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

তবে এটা সত্যি যে মহামারীর শুরুতে সোডার যখন কঠোর লকডাউন চেয়েছিলেন, তখন তার কৌশল বাভারিয়া ও দেশজুড়ে ভালোভাবে গৃহীত হয়। অন্যদিকে দ্বিধা ছিল লাশেটের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। যা অবশ্য তার জনপ্রিয়তার পক্ষে কাজ করেনি বলে জানাচ্ছে সাম্প্রতিক জরিপগুলো। তবে দুই বিপরীত চরিত্রের মানুষের তাত্ক্ষণিক ও সাহসী সিদ্ধান্তগুলো জার্মানিকে পথ দেখিয়েছে। যা অন্যদের জন্যও শিক্ষা নেয়ার মতো। যেখানে আরো একটি বিষয় সামনে আসে যে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে ফেডারেলিজমের কাঠামো বরং বেশি ভালো ভূমিকা রেখেছে।

তবে সরকারের তুলনামূলক সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি মহামারী মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে জার্মানির সাধারণ মানুষ। কারণ মাস্ক পরা, দূরত্ব মেনে চলা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পারিবারিক আয়োজনে মিলিত না হওয়া—এসব সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের একার পক্ষে বলবৎ করা সম্ভব না। সাধারণ মানুষকেই এগুলোতে অভ্যস্ত হতে হবে এবং মেনে চলতে হবে।

ডার স্পিয়েগেল থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত