গুস্তাভো কাবরাল ডি মিরান্ডা শিশু বয়সেই স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতেন। সে সময় মেলায় আইসক্রিম ও আম বিক্রি করতেন তিনি। আবার কখনো কখনো মাংসের দোকানেও কাজ করেছেন। ২২ বছর বয়সে তিনি সিদ্ধান্ত নেন কাজ থামিয়ে বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করবেন। অনেকেই তখন বলেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার জন্য নয়। কিন্তু সেই কাবরাল এখন ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোতে ইমিউনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি আজ সেই সব লাতিন বিজ্ঞানীর একজন, যারা কিনা কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য লড়াই করছেন।

এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কোনো ধরনের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচিত একাধিক দল অবশ্য এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। যাদের বেশির ভাগই চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি থেকে সহায়তা পাচ্ছে। যাদের অনেকেই ভ্যাকসিন মানবদেহে ট্রায়াল শুরু করেছে। কিন্তু কাবরালের মতো গবেষক চান বিকল্প পরিকল্পনা করে রাখতে। যাতে কোনো কারণে সামনে থেকে যারা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা ব্যর্থ হলে, অন্যভাবে সফলতা অর্জন করা যায়। আবার এমনও হতে পারে যে সেই কোম্পানির আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনগুলো নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে নাও পৌঁছতে পারে। সেক্ষেত্রেও যাতে নিজেদের বিকল্প পরিকল্পনাকে কাজে লাগানো যায়, সেটি নিয়ে ভাবছেন কাবরালরা। অর্থাৎ কাবরালদের মূল্য লক্ষ্য হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে লাতিন আমেরিকাকে বিদেশী ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মুক্ত করা।

লাতিন আমেরিকা বর্তমানে কভিড-১৯-এর মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় অন্য কোনো দেশে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করা তাদের উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ অতীতেও দেখা গেছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর অগ্রাধিকার পায় ধনী দেশগুলো।

ডিউক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ বিশেষজ্ঞ গাভিন ইয়ামেই বলেন, কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার না হলেও আমরা এখনই কিছু মনোপলি আচরণ দেখতে পাচ্ছি। কিছু ধনী দেশের সরকার এখন থেকেই চেষ্টা করছে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক কোম্পানি কিনে নিতে বা তাদের বড় একটি সাপ্লাই নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে।

মাইক্রোবায়োলজিস্ট মারিয়া এলেনা বোটাজ্জি বলেন, লাতিন আমেরিকায় আমরা নিজেরাই কেবল পারি নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে। কেউ আমাদের বাঁচাতে আসবে না।

অনেকগুলো দল ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ডোজের প্রয়োজন হবে এবং একটি কোম্পানির পক্ষে এত বেশি পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, বলছিলেন বুয়েনস এইরেসের একটি ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ফার্নান্দো লবোস।

যে কারণে কী হচ্ছে তা বসে বসে দেখার চেয়ে লাতিন আমেরিকার গবেষকরা এখন মহামারী থেকে বাঁচার নিজস্ব উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।

ইউরোপে পাঁচ বছর ভ্যাকসিনের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনার পর কাবরাল ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্রাজিল ফিরে আসেন। এর আগে তিনি চিকুনগুনিয়াসহ একাধিক রোগের ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করেছেন। এরপর কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়লে তিনি সেখানেও অবদান রাখার চেষ্টা করছেন। তার দল কাজ করে নিরীহ ও ভাইরাসের মতো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ল্যাবে তৈরি কণা নিয়ে।

মূলত এখানে ভ্যাকসিনের ধারণাটি হচ্ছে ইমিউন সিস্টেম দ্বারা এমন অ্যান্টিবডি তৈরি করা যা কিনা সংক্রমণের সময় করোনাভাইরাসকে আটকে দেবে।

কারণ এই কণাগুলো মানবদেহে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে না। এদের ভাইরাসের দুর্বল সংস্করণ দ্বারা তৈরি ভ্যাকসিনের চেয়ে নিরাপদও বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া এখানে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কিনা হেপাটাইটিস বি এবং পেপিলোমাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। কাবরালের দল এখন প্রাণীদেহে পরীক্ষা শুরু করেছে এবং আরো কিছু ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক দলও এই পথে হাঁটছে।

কাবরাল মনে করেন, ব্রাজিল নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সক্ষম। কেবল তাই নয়, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর বিপুল উৎপাদনের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবহারের পর প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পাঠাতে পারবে। এই দেশটিই লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন উৎপাদক দেশ। গত কয়েক দশকে এ বিষয়ে বেশ উন্নতি করেছে দেশটি।

ভ্যাকসিনোলজিস্ট লুসিয়ানা লেইটে বলেন, নতুনত্বই হচ্ছে মূল বিষয়। যদি প্রচলিত পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্বে তখন বিকল্প  প্রয়োজন হবে। এজন্য অবশ্য কাবরাল আশা করেন সরকারকে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়াতে হবে।

কয়েক সপ্তাহ আগে লরা পারোমারেস নামে ইউনিভার্সিটি অব মেক্সিকোর একজন বায়োটেকনোলজিস্ট, ভাইরাস জাতীয় কণা ব্যবহার করে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সহায়তা পাওয়ার জন্য এক সহকর্মীর কাছে হাজির হন। কিন্তু সেই সহকর্মীর কাছ থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়ায় বেশ অবাক হয়েছিলেন লরা। সেই সহকর্মী লরাকে বলেন, লরা আমি তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু আমি জানি না কেন তুমি তোমার সময় নষ্ট করছ। যখন প্রথম সফল ভ্যাকসিন বিদেশ থেকেই আসবে, তবে কেন শুধু শুধু চেষ্টা করা।

এ রকম কথা লরাকে অনেক শুনতে হয়েছে। কিন্তু এতে মেক্সিকোর ভ্যাকসিন উৎপাদনের ইতিহাসকে অবজ্ঞা করা হয়। অথচ চার দশক ধরে মেক্সিকো জাতীয় টিকাদান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন নিজেরাই তৈরি করেছে। তবে ৯০ দশকের শেষ দিকে সরকার ভ্যাকসিন তৈরির এই প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিয়ে সেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ব্রিমেক্সকে প্রতিস্থাপন করে। এরপর থেকে ভ্যাকসিন উৎপাদন কমতে থাকে। এখন এসে মেক্সিকো কেবল ইনফ্লুয়েঞ্জা ও হেপাটাইটিস বির ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করে।

পালোমারেস জানান, যদি তার ভ্যাকসিন সার্স-কোভ-২-এর বিরুদ্ধে কাজ করে তবে এটি উৎপাদনের প্রয়োজনে ব্রিমেক্সের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন তিনি। এছাড়া অন্য একটি বিকল্প হচ্ছে বিদেশী কোম্পনির সহায়তা প্রার্থনা করা। আরেক বায়োটেকনোলজিস্ট জোসে ম্যানুয়েল অগালিয়ার ও তার সহকর্মীরা এরই মধ্যে কানাডিয়ান কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করেছেন। তারা প্রাণীদেহে পরীক্ষা শেষ হলে মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করবেন।

অগালিয়ার বলেছেন, যদি তারা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় কার্যকর ফল লাভ করেন এবং যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ পাওয়া যায় তাহলে তারা তিন মাসের মধ্যে বহুল পরিমাণে উৎপাদনে যেতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ভ্যাকিসন আবিষ্কারের দৌড়ে মেক্সিকোও ভালোভাবে শামিল থাকতে পারবে। 

ব্রাজিল ও মেক্সিকো ছাড়া চিলি ও পেরুতেও চলছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা। যদি ধনী দেশগুলোর বাইরে লাতিন এই দেশগুলো সফলতা লাভ করে তবে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাজটিকে অনেক সহজ করে দেবে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক