করোনাভাইরাস নামক টার্মটি বৈজ্ঞানিক লিটারেচারে প্রথম দেখা যায় ১৯৬৮ সালে। ছোট একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল নেচার জার্নালে। একদল ভাইরোলজিস্টের কাছ থেকে একটি চিঠি এসেছিল, যেখানে সে সময় আবিষ্কৃত শ্বসনতন্ত্রের একটি সংক্রামক রোগকে নির্দেশ করতে এই টার্মটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

অপেক্ষাকৃত নিরীহ ও নতুন ধরনের এ সংক্রমণ বায়োমেডিকেল গবেষণায় দীর্ঘদিন তেমন পাত্তাই পায়নি। করোনাভাইরাসকে তাই আলোয় আসতে সময় লাগে ৩৫ বছরের বেশি। ২০০২ সালের শেষ দিকে চীনের গুয়াংডং প্রদেশে শ্বসনতন্ত্রের নতুন ধরনের ভাইরাসের উত্থানের কথা শোনা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ঘটনার পর এটিকে করোনাভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করে। পরে দুর্দান্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বিশ্বব্যাপী ল্যাবরেটরিগুলোর মধ্যে এক ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে করোনাভাইরাসকে বোঝার চেষ্টা করা হয়। ২০০৩ সালের মে মাসে একটি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সও পাওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু যখনই সার্স মহামারী শেষ হয়ে যায়, করোনাভাইরাসও মানুষের ভাবনা থেকে মুছে যেতে শুরু করে। গবেষণাও থেমে যায়। এরপর ২০০৭-০৮ সালে এটি ফের সামনে আসে। যখন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংক্রামক রোগ দেখা দেয়। এই রোগটির নাম ছিল মার্স।

আর এবার এটি ফের সামনে এল সার্স-কোভ-২ নামে। যার সংক্রমণের তীব্রতা এত বেশি যে গোটা দুনিয়াকে লকডাউনে যেতে হয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংকটও নজিরবিহীন এক রূপ নিয়েছে। ২০০৩ সালের মহামারী থেকে কেউ শিক্ষা নেয়নি। রাজনীতি দ্বারাই জনস্বাস্থ্যের প্রতিক্রিয়া নির্ধারিত হচ্ছে। উহানের প্রাদুর্ভাবের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে চীনের প্রভাব লক্ষ করুন। যার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণাও দেন।

পরিহাসের ব্যাপার হচ্ছে সার্সের পর যখন ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের খবর আসছিল তখন ২০০৩ সালের মে মাসে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ব্যারি ব্লুম সায়েন্স ম্যাগাজিনে একটি কলাম লিখেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেন, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। এখানে শিক্ষাটা হচ্ছে রোগের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে সাহায্য করার এটাই প্রকৃত সময়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসা। যদি আমরা এপিডেমিওলজি বিশেষজ্ঞ তৈরিতে সহায়তা করি, গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ল্যাবরেটরির শক্তি বৃদ্ধি এবং ল্যাবগুলোকে দেশের ও বিশ্বের সেরা ল্যাবগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সহায়তা করি তবে আমরা একটি সত্যিকারের স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হব। এই বিনিয়োগ আমাদের দেশকে রক্ষা করবে এবং অন্য যেকোনো বৈশ্বিক মহামারীকে থামাতে সক্ষম হবে। যার ফলে বেঁচে যাবে লাখো মানুষের জীবন। সে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মস্বার্থের যে ভাবমূর্তি তা বদলে গিয়ে মানবিক স্বার্থের বিষয়টি সামনে আসবে।

সেই ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের মূল রক্ষক হিসেবে সামনে আসে। কিন্তু আজকে নভেল করোনাভাইরাসের উত্থান দেখিয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব কীভাবে এমন সংগঠনকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। এই ভাইরাস উন্নত দেশগুলোর জন স্বাস্থ্যের বিপর্যস্ত অবস্থাকেও সামনে এনেছে। মূলত প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে হ্রাস করার যে দৃশ্য তা যেন নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ হতে পারে। সরকারগুলোর ভুল জায়গায় জোর দেয়ার বিষয়টি বেশ স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। অনেক বিশ্বনেতা অহংকার ও অজ্ঞতার অভূতপূর্ব সমন্বয় দেখিয়েছেন, রাজনৈতিকভাবে যা হয়তো অপরাজেয় ছিল। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে মুখোমুখি হতে গিয়ে তাদের বিজয় আর অব্যাহত থাকেনি।

সাধারণ মানুষ এই সংকটে পড়ে নতুন কিছু টার্মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। যেমন সামাজিক দূরত্ব, স্যানিটাইজিং, আরও (ভাইরাসের সংক্রমণের তীব্রতা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়)। অথচ কিছুদিন আগেও ভাইরাসজনিত রোগ নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না।

এদিকে ভাইরাস, ভ্যাকসিনের মতো বিষয়গুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে বিজ্ঞানের কাছ থেকে সমাধান পাওয়ার জন্য। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বাস্তব সমাধানের জন্য মৌলিক জ্ঞানের চর্চা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। যা কিনা ভারত (আরো অনেক দেশে) কয়েক বছর ধরে অবহেলিত হয়ে আসছে। ইমিউনোলজি, ভাইরোলজির মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে অপর্যাপ্ত সহায়তার চড়া মূল্য এখন শোধ করতে হচ্ছে। তার বিপরীতে সরকারি এজেন্সিগুলোর স্বল্পমেয়াদি ‘কভিড গবেষণা’র যে তাত্ক্ষণিক উদ্যোগ তা আসলে অবাস্তব। যা কিনা চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় অবিবেচনাপ্রসূত প্রতিক্রিয়াও।

চোখের সামনে এখনো কোনো ড্রাগস বা ভ্যাকসিন নেই। রাজনীতিবিদ এবং তাদের উপদেষ্টারাও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভাইরাস সঙ্গে থাকবে ধরে নিয়ে। তবে মাইক্রোবিয়াল রোগজীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াইয়ের মাধ্যমেই মানুষের ইমিউনিটির মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় অবশ্য মনে রাখতে হবে। যা বলেছিলেন মাইক্রোবায়োলজির পুরোধা ব্যক্তি জশুয়া লেডেরবার্গ। তিনি বলেন, প্যারাডক্সিক্যালি স্যানিটেশন এবং ভ্যাকসিনেশনে উন্নতি কখনো কখনো আমাদের ভঙ্গুর করে দিতে পারে, কারণ তা মানবজাতির বৃহত্তর অংশকে মাইক্রোবিয়াল অভিজ্ঞতার সামনে প্রতিরক্ষাহীন হিসেবে হাজির করতে পারে।

আউটলুক ম্যাগাজিন