প্রবাদে আছে, প্রয়োজনীয়তা উদ্ভাবনের জননী। একই সঙ্গে অবশ্য আমরা চাইলে ‘নতুনত্ব’ শব্দটিকেও যোগ করতে পারি। নভেল করোনাভাইরাস নামের মহামারীটি বিশ্ব অর্থনীতির গ্রাফকে ক্রমশ নিচের দিকে টানছে। একইভাবে এটি প্রযুক্তি বিশ্বেও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে। তবে খুব সম্ভবত ডিপ টেক ডোমেইনে এর উল্টো দিকও রয়েছে। এই মহামারী আবশ্যিকভাবেই প্রযুক্তির বিস্তৃত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। এতদিন পর্যন্ত এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছিল ‘থাকলে ভালো হয়’ এমনভাবে, কিন্তু এখন সেটি ‘আবশ্যিক’ হয়ে গেছে।

মহামারীর ফলে প্রতিদিন মানুষে-মানুষে যে সংস্পর্শ তা কমে এসেছে। যার সুফলও পাওয়া যাবে। যা কিনা অগমেন্টেড ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটিকে (অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআর হচ্ছে ভার্চুয়াল কোনো বস্তুকে আমাদের চারপাশের জগতের সঙ্গে যোগ করা এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর হচ্ছে একটা চলমান বা স্থির চিত্রকে অন্য কোনো স্থানে দেখা, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব সেখানে নেই) বাড়িয়ে দেবে।

ডিপ টেক মূলত একটি বিষয়গত টার্ম। এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় মূলত জটিল সমস্যাকে সহজ করার লক্ষ্যে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিকস, এআর/ভিআর ইত্যাদিও।

ডিপ টেক স্টার্টআপের জন্য বিজ্ঞান হচ্ছে অনেকটা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির মতো। এর কাজ সমস্যার আদি জায়গা খুঁজে বের করা। যার সমাধান বের হবে কোনো একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দ্বারা।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর)/অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর), মিক্সড রিয়েলিটি (এমআর) এবং এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি (এক্সআর) হচ্ছে নতুন প্রজন্মের তথ্য যোগাযোগের প্রযুক্তি। যাতে থাকে বড় পরিসরে কাজের সুযোগ, প্রভূত শিল্প সম্ভাবনা এবং  প্রযুক্তিগত বিস্তৃতি। যা কিনা কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

ডিপ টেকের ব্যবহারের কারণেই ঘরে বসে কাজ করা সম্ভব হয়েছে, দূরত্ব বজায় রাখার শিক্ষা পাওয়া গেছে, ঘরে বসে ফিটনেসের কাজ করা গেছে, বিনোদনে নিমজ্জিত হওয়া গেছে এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ তৈরির যে উপায় তা আমাদের নতুন বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি মহামারীর এই সময়ে জরুরি চিকিৎসাকাজেও দ্রুততম সময়ের মাঝে সাড়া দিয়েছে ডিপ টেক।

তাই অনেক ব্যবসা যখন লকডাউন ও বিধিনিষেধের কারণে ভুগছিল তখন বিভিন্ন দেশে ব্যবসা চালু রাখার জন্য উচ্চ চাহিদা দেখা গেছে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির। অনেক ক্ষেত্রে এআর/ভিআর, এমআর ও এক্সআরের ব্যবহারও দেখা গেছে।

এ পর্যায়ে এসে আলোচনাগুলো এখন আর সীমাবদ্ধ নয়। রবং তার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, শিল্প বাস্তুতন্ত্র এবং সংহত উদ্ভাবনের অভিজ্ঞতা অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে এবং প্রয়োগে জোর দিতে হবে।  উদাহরণস্বরূপ এআর/ভিআর প্রযুক্তি মেডিকেল গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। যেখানে মানুষের অমূল্য জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। গত মার্চে ভিআর হেডসেট প্রস্তুতকারক ‘এইচটিসি’ একটি ‘ভাইভ ইকোসিস্টেম কনফারেন্সের আয়োজন করেছিল’। কিন্তু সে সময় অনেক বড় বড় অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভিআর এ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে। যেখানে ৫৫টির বেশি দেশ থেকে ২ হাজার মানুষ নিবন্ধন করেছিল। এটি ছিল প্রথম কোনো ফিজিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির প্রোগ্রাম, যা কিনা ভিআরে পরিবর্তিত হয়েছে।

একইভাবে ডায়নামিকস ৩৬৫ রিমোট অ্যাসিস্ট সফটওয়্যার হলোলেন্স ও মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত আদান-প্রদান করেছেন। এর আগে এটি ব্যবহার করা হতো ফিল্ডের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্রেনিং দেয়ার জন্য। কিন্তু এখন অনেক জায়গায় এর গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সেসব জায়গায়, যেখানে মেডিকেল বিশেষজ্ঞ তাত্ক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকেন না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক ড. টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইসাসের মতে, এ প্রাদুর্ভাব মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সংহতির একটি পরীক্ষা। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন যে এই সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষকে এখন একসঙ্গে এসে লড়াই করতে হবে এবং গবেষণা হচ্ছে সাড়া দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায়। এখন আপনি বিশ্বব্যাপী ডিপ টেক ইন্ডাস্ট্রি নিশ্চিত করার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এবং গবেষণা অব্যাহত রেখে মানুষের যন্ত্রণা দূর করতে পারেন।

২০১৬ সালের একটি রিপোর্ট বলছে, ২০২০ সালে সফটওয়্যার যুক্ত ডিপ টেকের আয় হবে ১৩.১৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এই রাজস্ব আসবে ভিডিও গেমস, লাইভ ইভেন্টস, ভিডিও বিনোদন, রিটেইল রিয়েল স্টেট, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা, মিলিটারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে। সে সময় ডিপ টেক আবশ্যিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হবে।

আউটলুক থেকে অনূদিত চুম্বকাংশ