সবাই জানতে চায় অন্য দেশের তুলনায় কতটা ভালোভাবে তার দেশ নভেল করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু আপনাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে আপনি একই জিনিসের মাঝে তুলনা করছেন। উদহারণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯-এ মৃতের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। ১১ মে পর্যন্ত যা ছিল ৮০ হাজার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যাও আবার ৩৩০ মিলিয়ন। অন্যদিকে পশ্চিম ইউরোপের পাঁচটি দেশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের সম্মিলিত জনসংখ্যা আবার ৩২০ মিলিয়ন। ১১ মে পর্যন্ত সেই পাঁচটি দেশের সম্মিলিত মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার। যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি। তাই স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান মোটেই পুরো গল্প তুলে ধরতে পারে না।
ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের ডাটা সায়েন্সের প্রফেসর রাওল্যান্ড কাও বলেন, তুলনাকে কার্যকর করতে হলে দুটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। ডাটাগুলো একই বিষয় তুলে ধরছে কিনা এবং মহামারীর ধরন যদি আলাদা হয় তবে দুটি আলাদা সংখ্যাকে তুলনা কোনো অর্থ বহন করে কিনা?
মৃত্যু গণনা
প্রথমে কিছু সংখ্যায় চোখ ফেলা যাক। কীভাবে দেশগুলো কভিড-১৯-এর মৃত্যুর রেকর্ড রাখছে তার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্স ও জার্মানি কেয়ার হোমের মৃতদের সংখ্যাও তাদের তালিকায় প্রতিদিন যোগ করে। অন্যদিকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইংল্যান্ড কেবল হাসপাতালে মৃতদের সংখ্যা উল্লেখ করেছে। এর পর থেকে অবশ্য তারাও কেয়ার হোমে মৃতের সংখ্যা যোগ করতে শুরু করেছে।
আরেকটি জটিলতা হচ্ছে মৃত্যু গণনার কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই। ফলে পরিসংখ্যানের খাতিরে কাউকে পরীক্ষা করার দরকার আছে, নাকি ডাক্তারের সন্দেহই যথেষ্ট? জার্মানি কেয়ার হোমের মৃতদের মাঝে কেউ করোনা পজিটিভ হলে তাকে গণনায় রাখে। অন্যদিকে বেলজিয়ামে ডাক্তারদের কাছে সন্দেহভাজন হলেই মৃতের তালিকায় যোগ করে।
মৃত্যুহার
মৃত্যুহারের ওপর অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া হচ্ছে কিন্তু এটি নির্ণয়েও পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে। একটি অনুপাত হচ্ছে কভিড-১৯ পজিটিভ হওয়াদের মাঝে কতজন মারা গেছে। যদিও পরীক্ষা ক্ষেত্রেও দেশে দেশে ভিন্নতা আছে। যুক্তরাজ্যে কেবল সেসব মানুষকেই পরীক্ষা করা হচ্ছে যাদের অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে প্রাদুর্ভাবের শুরুতে তেমনটাই হয়ে আসছিল। এক্ষেত্রে যেসব দেশে বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে তার তুলনায় এখানে মৃত্যুহার অনেক বেশি দেখা যাবে। কারণ বিস্তৃত পরীক্ষার ফলে এমন রোগী পাওয়া যাবে যাদের মাঝে মৃদু উপসর্গ রয়েছে অথবা কোনো উপসর্গই নেই।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় কতজন মানুষ মারা গেছে সেটি। যেমন প্রতি মিলিয়নে কতজন লোক মারা গেছে সেটি। তবে এটি নির্ধারিত হয় প্রাদুর্ভাবের কোন পর্যায়ে একটি দেশ অবস্থান করছে তার ওপর। যদি কোনো দেশের প্রথম আক্রান্তের সংখ্যা মহামারীর প্রথম দিকে শনাক্ত হয়, তবে এর মৃতের সংখ্যা বাড়তে সময় লেগেছে বেশি।
রাজনৈতিক কারণ
অন্য আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোর কাছ থেকে যেসব তথ্য আসছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা। চীন ও ইরান তাদের মৃত্যুর যে হিসাব দেখিয়েছে তা কি সঠিক? সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারি না। জনসংখ্যার প্রতি মিলিয়নে চীন যে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখ করেছে তা আশ্চর্যজনকভাবে কম। এমনকি উহানের মৃত্যুর সংখ্যা সংশোধন করার পরও। এখন আমরা চাইলেই কি এ ডাটায় বিশ্বাস রাখতে পারি?
জনসংখ্যাগত কারণ
বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যার মাঝে পার্থক্য রয়েছে। ডেমোগ্রাফি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে মানুষের গড় বয়স অথবা মানুষ কোথায় থাকে তা দেখা হয়। কিন্তু আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মাঝে তুলনা করতে গেলে সমস্যা দেখা দেবে। কারণ আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক কম এবং যার বৃহত্তর অংশ গ্রামীণ অঞ্চলে বাস করে।
বরং ডাবলিং শহরের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের একই আকারের শহর যেমন মার্সেসাইডের মাঝে তুলনা হতে পারে। একইভাবে ইউরোপের বৈশ্বিক শহর লন্ডনের সঙ্গে তুলনা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জায়ান্ট সিটি নিউইয়র্কের। পাশাপাশি বয়সের ভিত্তিতেও আপনার তুলনা একই শর্তে হচ্ছে কিনা তাও নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপ ও আফ্রিকার মাঝে তুলনাও খুব একটা কাজে আসবে না। কারণ ইউরোপের চেয়ে আফ্রিকার জনসংখ্যায় তরুণদের সংখ্যা অনেক বেশি। আর আমরা জানি বয়স্ক লোকের কভিড-১৯-এ মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেশি।
স্বাস্থ্যসেবার ভিন্নতা
অন্যদিকে ইউরোপীয় অনেক দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়ে অনেক উন্নত। যা কিনা একটি দেশ করোনাভাইরাস দ্বারা কতটা বাজেভাবে আক্রান্ত হতে পারে তাও নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন কোনো দেশ সামাজিক দূরত্বের নীতিসমূহ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কতটা সফল তাও কারণ হিসেবে কাজ করে।
পরীক্ষা
যেসব দেশ মহামারীর শুরুতে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করেছে এবং আক্রান্তের কন্টাক্ট ট্র্যাক করেছে তারা দেখা গেছে এখন পর্যন্ত ভাইরাসের গতি শ্লথ করার ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে বেশি সফল। জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মৃতের সংখ্যা সেজন্য দেখা গেছে অনেক কম। জনসংখ্যার মাথাপিছু পরীক্ষার সংখ্যা মৃত্যুহার কমানোর পূর্বাভাস দেয়ার জন্য বেশ দরকরি পরিসংখ্যান। তবে পরীক্ষার সব ডাটা একই রকম না। কোনো কোনো দেশ কেবল পরীক্ষা করা লোকদের সংখ্যা হিসাব করে। আবার অন্য অনেকে সর্বমোট কতটি পরীক্ষা করা হয়েছে তা হিসাব রাখে (অনেককে একাধিকবার পরীক্ষা করা হয়ে থাকে)।
প্রফেসর স্যার ডেভিড স্পিয়েগেলটারের মতে, এভাবে বিভিন্ন দেশের মাঝে র্যাংকিং তৈরি করে কার অবস্থা বেশি খারাপ দেখানো একেবারেই বোকামি। তবে প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার আগে কোন দেশ বেশি ভালো করেছে, সে সম্পর্কে কিছু বোঝা যাবে না। শেষ হওয়ার পর আমরা পরবর্তী সময়ের জন্য শিক্ষা নিতে পারব।
বিবিসি





