(গতকালের পর)
৫. আমাদের সিংহভাগ উৎপাদন শ্রমঘন এবং এগুলো কভিড-১৯ ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে অবস্থিত। এ তিনটি এলাকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, আগামী কয়েক সপ্তাহে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও এখানে বেশি। এসব কারখানা দ্রুত খুলে দিলে সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে, যেটা আমরা কেউই চাই না। কিন্তু এসব এলাকায় কারখানা বন্ধ রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল করা যাবে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে সব স্তরের কর্মীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কারখানার মালিকদের নিতে হবে। যেসব কারখানার স্বাস্থ্যনিরাপত্তা সন্তোষজনক হবে, কেবল সেগুলোই খোলা রাখার অনুমতি দেয়া হবে। কারখানার ভেতরে নিয়মিত টেস্টিং, খাবার এবং থাকার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি আপাতদৃষ্টিতে দুরূহ হলেও এ ব্যাপারে কারখানা মালিক ও সরকার উভয় পক্ষই ভেবে দেখতে পারে। থাকা-খাওয়া বাবদ একটি যুক্তিযুক্ত পরিমাণ অর্থ শ্রমিকদের কাছ থেকে কেটে রাখলেও তারা রাজি হবেন। কারণ এ টাকাটা কারখানার বাইরে থাকলেও তাদের পকেট থেকেই যেত। শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে আনার ব্যাপারেও আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এবার তাদের কাজে যোগদান যেন পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল হয়। উপসর্গ লুকিয়ে কেউ যেন কাজে যোগ দিতে না পারেন, সে ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। অনেকেই নীরব বাহক হতে পারেন, তাই টেস্টিং জরুরি।
৬. দেশীয় চাহিদা বাড়াতে হলে মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বাড়াতে হবে। উচ্চবিত্তের হাতে টাকা আছে, অনেকের এই সময়ে খরচ কমে যাওয়ায় সঞ্চয়ও হয়েছে। টাকা নেই গরিবের হাতে, তাদের সঞ্চয়ও ফুরিয়ে গেছে। কভিড-১৯-এ গ্রামের চেয়ে শহুরে দরিদ্ররা খুব সম্ভবত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনানুষ্ঠানিক খাতের স্বনিযুক্ত, দিনমজুর এবং অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী, যারা সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে আছেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পহেলা বৈশাখ ও ঈদের বেচাকেনানির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা হবেন। অনানুষ্ঠানিক খাতের পাশাপাশি খাত হিসেবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা মনে হয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই খেয়েছে। তাই এগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। দ্রুত পুনর্কর্মসংস্থানের মাধ্যমে হোক বা সরাসরি ক্যাশ ট্রান্সফারের মাধ্যমে হোক, এদের হাতে টাকা থাকাটা জরুরি। সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানে অভাবগ্রস্তদের চিহ্নিতকরণ ও অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নগদ অর্থ প্রদানে মুদ্রাস্ফীতি শঙ্কিত হওয়ার মতো বাড়বে না বলেই মনে হয়, কারণ শিল্প-কারখানা খুলতে শুরু করলে খুব বেশি মানুষের এটা দরকার হবে না। এতে দ্রুত কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব থাকবে না। তবে কার্যকর পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা না থাকলে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিয়েও নিম্ন আয়ের মানুষদের (কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের) খুব একটা উপকার হবে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও জুতসই প্রণোদনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো, ক্ষুদ্র শিল্প বা ব্যবসায়ীদের অনেকেই নিবন্ধিত নন।
৭. ব্যবসায়ী নেতাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দায়িত্বশীলতা না পেলে সরকারকে তা যথাসম্ভব নিশ্চিত করতে হবে। দেশ বা শ্রমিকের কথা ভেবে কেউ ব্যবসা করেন না, ব্যবসা করেন সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য মাথায় রেখে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের কাজটি তাই সরকারকে শক্ত হাতে করতে হবে। সত্যিই কতটা ক্ষতি তাদের হয়েছে, সেটা দেখতে হবে, সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রণোদনার বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি সেক্টর ও ব্যবসার জন্য পৃথক পৃথকভাবে এটা করতে হবে এবং দ্রুত করতে হবে। ব্যবসায়ী লবিস্টদের কথা না শুনে নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পোশাক খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি। বেশির ভাগ পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন দেয়ার কাজটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এতদিন যে হয়নি, সেটা আশ্বর্যজনক! অন্য খাতের তুলনায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা সহজেই সরকারের কাছে পৌঁছতে পারেন। সুতরাং সুবিধা এ খাতের দিকে যেন ঝুঁকে না যায়! কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বনিযুক্তরা খুব সম্ভবত সবচেয়ে উপেক্ষিত, কারণ তাদের শক্ত প্লাটফর্ম নেই। তারা বিশেষ দৃষ্টির দাবিদার। কৃষিপণ্যের সঠিক দাম নিশ্চিত করা জরুরি। অদূরভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে সরকারের উচিত বেশি দামে অধিক পরিমাণ কৃষিপণ্য কিনে মজুদ করা।
৮. বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের মোট ফান্ডের ৬ বিলিয়িন ডলার এখনো বাংলাদেশকে দেয়া হয়নি, যা তারা করোনা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দিতে ইচ্ছুক। এসব প্রকল্পের যেগুলোয় নিম্ন আয়ের কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান বেশি হবে, সেগুলোর অর্থ দ্রুত ছাড় করিয়ে নিয়ে আসতে হবে সরকারকে।
৯. করের হার আপাতত অপরিবর্তিত রেখে কর আদায়ের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা এখন আর দীর্ঘমেয়াদি কোনো ব্যাপার নয়। স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দক্ষতা বৃদ্ধির কাজটি কীভাবে করা হবে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেই তা বলতে হবে। কর আদায়ের হার বৃদ্ধি পেলে করহার কমানো সহজ হয়, যেটা কর্মসৃষ্টিতে সাহায্য করে।
নিয়মিত বাজার ব্যবস্থা যখন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়। বর্তমানে করোনাকালীন অবস্থায় সরকারের ভূমিকা আরো শক্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ব্যাপকতার কারণে মোটাদাগের নির্দেশনা নয়, নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ এবং তার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিস্তারিত বলে দিতে হবে। এ জায়গায় যথেষ্ট বলিষ্ঠতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
এম কে তৌফিক: সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, অর্থনীতি বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





