বাংলাদেশে ওভাবে করোনা'র
প্রকোপ শুরুই হয়নি, কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি
স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইতিমধ্যে একপ্রকার ভেঙ্গে পড়েছে। এর জন্য আমি দায়ী করবো
সমন্বয়হীনতাকে। এই যুদ্ধে হারলে আমরা সবাই হারবো, তাই
একে অন্যকে দোষারোপ না করে আমাদের সমাধানের দিকে আগানো উচিৎ।
আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী আগে
ছিলেন ব্যবসায়ী। এই দুর্যোগে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা তিনি কেমন সামলাচ্ছেন
তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমরা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রায়ই তার অসহায় আত্নসমর্পণ
দেখছি। কোথাও তিনি অসহায় ভাবে স্বীকার করছেন তিনি কিছু জানেন না, কখনো
তিনি ভিডিও কনফারেন্স কেটে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে ডেঙ্গুর সিজনেই তিনি
ভাল ছিলেন, তিনি তখন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। এখন
করোনার সময়ে অন্য দেশে যেতে পারছেন না দেখে আমার নিজেরই মায়া লাগছে!
যে যুদ্ধের সেনাপতিরই এই অবস্থা, এই
যুদ্ধে আপনি সৈন্যদের কতটুকু দোষ দিবেন! আমার বিশ্বাস সরকারের উচ্চপর্যায়ে সঠিক
তথ্য যায়না, কারন মইয়ের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত শুধু
তৈলবাজরা বসে আছে, সেই তৈলপিচ্ছিল মই পেরিয়ে উপর মহলে
সত্য পৌঁছানো দুঃসাধ্য ব্যাপার বটে! গতকাল থেকে অনেক ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি, তাদের
মন্তব্য পেয়েছি কি করলে এই সংকটকালে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় সেই ব্যাপারে। আসুন
ব্যাপারগুলো জেনে রাখি, উপর মহলের কারো চোখে পড়লে তো ভাল, না
পরলে অন্তত নিজেরা জেনে রাখি যেন ভবিষ্যতে তুলনা করতে পারি কার কোথায় ভুল ছিল!
সবাই উন্নত দেশের ডাক্তারদের তুলনা
দেন। আপনারা কি জানেন আমেরিকা ইউরোপের সকল হাসপাতালে এখন আউটডোরে রোগী দেখা বন্ধ? শুধু
ইমার্জেন্সী সার্ভিস চালু আছে! আউটডোর হচ্ছে হাসপাতালের সেই অংশ যেখানে আমরা
সাধারণ রোগ নিয়ে যাই, বাঙ্গালিরা বেশিরভাগ যায় গ্যাসের ওষুধ
আনতে, বা ক্যালসিয়ামের ট্যাবলেট আনতে।
সেখানে ৯০ ভাগ এমন রোগী, যাদের পরে এক সময়েও ডাক্তার দেখালে
চলবে! আপাতত সকল করোনা আক্রান্ত দেশে এমন রোগী দেখা বন্ধ আছে! এবং নন ইমার্জেন্সী
অপারেশনও বন্ধ আছে সরকারী ঘোষণার মাধ্যমে। ধরুন গল ব্লাডারের পাথর, বা
কিডনী পাথর ফেলার অপারেশনও আপাতত বন্ধ আছে সব জায়গায়, এগুলো
অপারেশন একটু পরে করলেও কেউ মরে যাবেনা। সরকারীভাবে প্রচার চালানো হয়েছে যেন
সাধারণ রোগ নিয়ে আপাতত রোগীরা ডাক্তারের কাছে না যায়!
'ইমার্জেন্সী' হচ্ছে
দুর্ঘটনায় পরলে আমরা যেখানে যাই, যেখানে দ্রুত চিকিতসার
প্রয়োজন হয়। বিপুল পরিমান করোনা রোগীকে সবদেশেই এমার্জেন্সীতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
প্রথমে ফোনে যোগাযোগ করতে হয়, উপসর্গ শুনে বেশিরভাগ রোগীকেই
তারা বাসায় থাকতে বলে, অবস্থা বেশী খারাপ হলে ইমার্জেন্সীতে
রোগী দেখে বাসায় পাঠায়, তার চেয়ে বেশী খারাপ অবস্থা হলে ভর্তি
করে। বাংলাদেশেও এখন আউটডোর বন্ধ করা উচিৎ। এতে আউটডোরের ডাক্তারেরা ইমার্জেন্সী
রোগীকে বেশী সময় দিতে পারবে। এই মুহুর্তে আসলে সেটাই দরকার। সব দেশে তাই করছে। এ
নিয়ে বাংলাদেশেও সরকারী ঘোষণা দরকার, সরকারী
নতুন প্রটোকল দরকার। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? স্বাস্থ্যমন্ত্রী
কিছু জানেন না!
করোনা'র জন্য নির্ধারিত যে হাসপাতালগুলো আছে তারা করোনা প্রমাণিত না হলে চিকিৎসা
করছে না। করোনা প্রমাণিত হওয়ার জন্য টেস্ট করা দরকার সেই টেস্ট অপ্রতুল। তাহলে
যাদের টেস্ট করা হয়নি কিন্তু করোনার উপসর্গ আছে সে রোগীরা কোথায় ডাক্তার দেখাবে? এখানে একটু ফাঁক রয়ে গেছে। এই বিষয়েও সুস্পষ্ট নির্দেশনা
থাকা দরকার। হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে পর্যাপ্ত পিপিই দিয়ে সেখানে তাদেরকে প্রথম
পর্যায়ের চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া যায়। কিংবা কিছু কিছু দেশে টেস্ট না করে
শুধু সিম্পটম দেখে চিকিৎসা দিচ্ছে সেটাও করা যায়।
এই মুহুর্তে দরকার বেসরকারী
চিকিৎসকদেরও সরকারী বীমার আওতায় নিয়ে আসা। নইলে তারা যে চিকিৎসা করবেন রোগীদের কোন
ভরসায় করবেন? করোনার বিরুদ্ধে মূল যুদ্ধ করবেন
চিকিৎসকেরাই, গার্মেন্টস সেক্টরে পঞ্চাশ হাজার কোটি
টাকা বরাদ্দ দিলে স্বাস্থ্যখাতেও ন্যূনতম বরাদ্দ রাখা দরকার। হাসপাতালে থাকা
ডাক্তারদের খাবারের ব্যবস্থা করা দরকার, থাকারও।
তাদের চিন্তা থাকে বাসায় গেলে তারা পরিবারের লোকদেরও আক্রান্ত করবেন। উন্নত দেশের
তুলনা যে দেন, উন্নত দেশে কিন্তু ডাক্তারদের জন্য
এসব ব্যবস্থা করেছে। ডেল্টা হাসপাতালে যে চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে গিয়ে করোনায়
আক্রান্ত হয়েছেন তার চিকিতসার টাকা কে দিবে?
প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকরা হাসপাতাল
বন্ধ রেখেছে। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। হাসপাতাল বন্ধ রাখায় উলটো
অনেক ডাক্তার চাকুরিচ্যুত হয়েছেন, তারা টাকা পাচ্ছেন না। সরকার
এদের খোলা ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছেনা কারন নইলে প্রাইভেট হাসপাতালেও পিপিই দিতে
হবে! দরকার পড়লে সাময়িকভাবে স্পেনের মত কয়েকমাসের জন্য প্রাইভেট হাসপাতালকে
রাষ্ট্রায়ত্ত করে নেয়া হোক। সেগুলোতেও ইমার্জেন্সী সার্ভিস চালু করা হোক!
ডাক্তারের অভাব হবেনা!!
আমেরিকায় সাধারণ রোগ বালাই এর জন্য
সবারই প্রাইমারী কেয়ার ফিজিশিয়ান আছে, যাদের
চেম্বারে রোগীরা নিয়মিত যায়। তারা ফোন দিয়ে দিয়ে সবাইকে বলেছে আপাতত ফোনে সেবা
নেয়ার জন্য। জ্বর কাশির সিম্পটম থাকলে সরাসরি ইমার্জেন্সীতে চলে যেতে বলছে। গণ
জমায়েত বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে, তাহলে ডাক্তারের চেম্বারে ভিড়
করলে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং হবে কিভাবে! সিলেটে এক ডাক্তার আক্রান্ত হয়েছেন, না
জানি তার চেম্বার থেকে আরো কতজন আক্রান্ত হয়েছেন!
এই মুহুর্তে সবচেয়ে বেশী দরকার কি
জানেন? যেসব লোকেরা এই যুদ্ধ লড়বে তাদেরকে
সাহস দেয়া, উৎসাহ দেয়া, তাদের
কৃত কর্মের জন্য তাদের প্রাপ্য সম্মান দেয়া। আমরা কি সেটা দিয়েছি? অন্য
দেশের লোকেরা ডাক্তারদের গাড়ি দেখলে কিংবা পুলিশ দেখলে হাততালি দেয়। আমরা তো এই
দুর্যোগে ঘরে বসেছিলাম, আমরা কি তারা যে কাজে যাচ্ছে তাদের
প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি? পত্রিকাজুড়ে শুধু ডাক্তারদের বিরুদ্ধে
নেগেটিভ খবর। ময়মঙ্গসিংহ মেডিক্যালে ইন্টার্ণ ডাক্তারেরা বহিষ্কার হয়েছিল পরিচালকের
ভুলে, তিনি সময়মত সবাইকে জানাতে পারেন নি, পরবর্তীতে
তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। বহিষ্কারের খবর পত্রিকায় আসলেও পরবর্তীতে যে পরিচালক বলেছিলেন
তার ভুলে ছাত্রদের বহিষ্কার হয়েছিল, তাদের
বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের সেই খবর মিডিয়ায় আসলো না কেন?
আসুন ডাক্তারদের ধন্যবাদ জানাই কারন
বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারী হাসপাতাল খোলা। আসুন এই গরমে পিপিইর ভেতরে ঘামতে থাকা
ডাক্তারদের ধন্যবাদ জানাই যাদের ছুটি বাতিল হয়েছে, এবং
যারা তাদের কর্মস্থলে মার্চ মাস থেকে অবস্থান করছেন আপনাদের জন্য। আসুন ডাক্তারদের
ধন্যবাদ জানাই যারা তাদের মাস্ক ধুয়ে ধুয়ে ব্যবহার করছেন, কিংবা
বিনামাস্কেই আপনাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিটি সরকারী হাসপাতালে।
বিদেশ থেকে ডাক্তার আনলে হয়তো কিউবা
থেকে আনাবেন, এদের রেট কত জানেন? মাসে
তিন হাজার ডলার! দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা। তারা কেউই পিপিই ছাড়া এই গরমে অমানবিক
পরিবেশে আট ঘন্টার বেশী কাজ করবে না! ডাক্তারেরা কোয়ারান্টাইনে গেলে কিন্তু সেই
হাসপাতালের সেবা দেয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের ডাক্তারদেরকে আমাদের আগলে রাখতে
হবে নিজেদের স্বার্থেই!
এই যুদ্ধ সবার, এটা মহামারী। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবারই লড়ার সুযোগ আছে। আপাতত যাদের বেশী দরকার তারাই কেবল ডাক্তারদের কাছে অগ্রাধিকার পাক। জানেন হয়তো, বিদেশের ডাক্তারদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কারা চিকিৎসা পাবে আর কারা পাবেনা। কাউকে কাউকে জেনেশুনেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে হচ্ছে কিছুই করার নেই। আসুন আমরা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট কিংবা গ্যাসের ট্যাবলেটের জন্য আপাতত ডাক্তার দেখানো বাদ দেই, কয়েকদিন অপেক্ষা করি। এই আঁধার সাময়িক, এই আঁধার কাটবেই...
শুভ কামাল
সফটওয়্যার প্রকৌশলী
ইনফোসিস, ইউএসএ





