২২ আগস্ট জাপান কভিড-১৯-এর কারণে প্রতি মিলিয়নে ৯.২৪ মৃত্যুর কথা জানায়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়স্ক মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশটির মৃত্যুহার অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় অনেক নিচে ছিল। কেন জাপানিদের মৃত্যুহার পাশ্চাত্য দেশগুলোর তুলনায় কম তা নিয়ে এখনো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তবে জাপানি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।  

জাপানের হেলথ কেয়ার সিস্টেমটি সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা এবং একটি অভিন্ন ফি শিডিউল দ্বারা বৈশিষ্ট্যযুক্ত। ১৯৬১ সালে সে সময় জাপান উচ্চ আয়সম্পন্ন দেশ না হওয়ার পরও সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করে। এ পদ্ধতি জাপানে বসবাসরত সবাইকে বীমার আওতায় নিয়ে আসে এবং ন্যায্যমূল্যে হেলথ কেয়ার সার্ভিসে সবার প্রবেশ নিশ্চিত করে। খরচ নিয়ন্ত্রণে আনতেই জাপান সে সময় অভিন্ন ফি শিডিউল চালু করে। অনেক ইউরোপীয় দেশের মতো এখানে হেলথ কেয়ার সার্ভিসের ফি সরকারিভাবে নির্ধারিত হয় এবং সেটি সরকারি ও বেসরকারি সব স্বাস্থ্যসেবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। অভিন্ন এই ফি হেলথ কেয়ারের সব খরচকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। যদিও জাপানের হেলথ কেয়ার সুযোগ-সুবিধার ৮০ ভাগই হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা স্কিম এবং অভিন্ন ফি নির্ধারণের মিশ্রণের ফলে জাপান সব নাগরিকদের হেলথ কেয়ার সার্ভিসে প্রবেশ সুরক্ষিত করতে পেরেছে, তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন। পাশাপাশি একই সময়ে তাদের সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে ছিল। পাশাপাশি পাবলিক হেলথ সেন্টার জাপানের মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জাপানে টিবি ছিল জাপানের মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। রোগ প্রতিরোধের সুবিধার্থে টিভি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছু কর দেয়ার মধ্য দিয়ে সরকারি অর্থায়নের আওতায় নিয়ে আসা হয়। যেখানে পাবলিক হেলথ সেন্টারগুলো টিবির জনস্বাস্থ্য পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

কোনো ব্যক্তি যার মাঝে দেখা যাওয়া উপসর্গগুলো যদি টিবির দিকে ইঙ্গিত দেয় তবে সে ব্যক্তি সাশ্রয়ীভাবে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাগুলো পেতে পারে। এজন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমার সুবিধাকে ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে।

করভিত্তিক সরকারি অর্থয়ান এবং সার্বজনীন বীমা ব্যবস্থার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা উভয়ের ভূমিকা সমন্বিত করার মাধ্যমে জাপান টিবি বা যক্ষ্মায় মুত্যুর সংখ্যা হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছিল।

কভিড-১৯ মহামারী ক্ষেত্রে পলিসি ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কার্যকর সমন্বয়ে ধারণা করা হচ্ছে জাপানে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। শুরুর দিকে প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার পরও কেন্দ্রগুলো কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে। সেখানে কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং পিসিআর টেস্টিংও যুক্ত ছিল। এক্ষেত্রে টেস্ট ও চিকিৎসার সব খরচ সরকারিভাবে করা হয়েছে। পাশাপাশি জাপানি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সার্বজনীনতা এবং নো-গেট কিপিং সিস্টেমকে ধন্যবাদ দেয়া যেতে পারে। কোনো ব্যক্তির যদি উপসর্গ দেখা যেত, তবে খরচের চিন্তা না করেই স্বাস্থ্যসেবা সুবিধায় প্রবেশাধিকার পেত। যা কিনা শুরুর দিকে সংক্রমণ শনাক্তকরণে সাহায্য করেছে।

আমাদের অবশ্য নো-গেট কিপিং সিস্টেমের নেতিবাচক দিকগুলোও লক্ষ করা দরকার। যেহেতু ব্যক্তিরা সহজেই এবং সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থসেবা সুবিধা লাভ করতে পারে তাই উদ্বেগ থাকে যে সুবিধা পেতে লোকজন অহেতুক ভয় পেয়ে টেস্টের জন্য ভিড় জমাতে পারে। সেজন্য জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সংক্রমণের বিস্তৃতি রোধ করতে সরকার স্ক্রিনিংয়ের মানদণ্ডও নির্ধারণ করে। এ মানদণ্ড যা কিনা সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করেছে।

কভিড-১৯ মহামারী আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতার গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। কেবল মহামারীর সংকট প্রতিক্রিয়া জোরদার করাই এজন্য যথেষ্ট নয়। গোটা হেলথ সিস্টেমকে শক্তিশালী করা ছাড়া সংকটের প্রতিক্রিয়া কার্যকর কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না।

২০১৬ সালে বিশ্ব যখন ২০১৪ সালের ইবোলা প্রাদুর্ভাবের হিসাবনিকাশ কষছিল, জাপান তখন স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) সেট করে। এ রকম অনেক কার্যকর ও যুুগোপযোগী উদ্যোগের কারণেই মহামারী মোকাবেলায় সফল হয়েছে জাপান।

দ্য ডিপ্লোমেট