কভিড-১৯-এর কারণে তিন মাস বন্ধ থাকার পর চীনের সবচেয়ে বড় শহর সাংহাই থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে শহরটি আলোকিত হয়ে উঠল। বাইরে আসার জন্য জনসাধারণ মরিয়া হয়ে ছিল। তবে কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পরও, চীনের লকডাউনের যে মাত্রা ও তীব্রতা তা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। ভাইরাসের উত্পত্তি ভূমি উহান পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্যান্য শহরকেও কোয়ারেন্টিনের অধীনে নেয়া হয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি পুরোপুরি নিথর হয়ে পড়ে।

তাদের সেই উৎসর্গের ফলে চীন ভাইরাসকে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। ২৭ এপ্রিল উহানের হাসপাতাল তাদের শেষ রোগীটিকেও ছেড়ে দিয়েছে। এর মাঝে সরকার স্কুল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ফের খুলে দিয়েছে। এমনকি অনেক অনলাইন রিটেইলারের বিক্রিও বেড়ে গেছে এর মাঝে। দেশের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ইতিহাসের দারুণ অগ্রগতি এমন বিপর্যয়ের পরেই এসেছিল।

বিশ্বের জন্য অবশ্য এ বিপর্যয় এখনো চলমান। বিভিন্ন দেশ নানা উপায়ে এটিকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার এখনো অনেক বেশি। যদিও অনেক দেশের সংক্রমণের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে এবং মনোযোগ ফিরে এসেছে বিশ্ব অর্থনীতির দিকে। আইএমএফ বলছে, এ বছর বৈশ্বিক জিডিপি ৩ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হবে। এ সংকোচন ২০২১ সাল পর্যন্ত চলতে পারে, যা মহামন্দা পরিস্থিতির দিকে বিশ্বকে চালিত করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের বেকার দাবি করা নাগরিকের সংখ্যা এখনই ২২ মিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছে। এসব পরিসংখ্যান বলছে, রোগের চেয়ে নিরাময় অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন এই বলে যে দ্রুত বিধিনিষেধ তুলে দিলে ঝুঁকি আরো বাড়বে।

সফলভাবে লকডাউন তুলে দেয়ার কোনো আদর্শ উপায় নেই। কিন্তু পূর্ব এশিয়ার কোনো কোনো দেশ এ প্রক্রিয়ায় সাফল্য দেখিয়েছে। জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে তারা যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে তা আমাদের মূল্যবান শিক্ষা দেয়।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই দক্ষিণ কোরিয়া জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কভিড-১৯-এর রোগী ধরা পড়ে দক্ষিণ কোরিয়ার একদিন পর। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করলে দ্রুত সাড়া দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। ফলে তারা আক্রান্তের সংখ্যাও অনেক কম রাখতে সক্ষম হয়।

পরীক্ষা করে আক্রান্তদের শনাক্ত করা এবং তাদের সংস্পর্শে আসাদের খুঁজে বের করাসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্য সমাজ ও অর্থনীতিকে খুলে দেয়ার জন্য ছয়টি শর্তের কথা উল্লেখ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া দেখিয়েছে, এমন উদ্যোগের জন্য চীনের মতো স্বৈরতন্ত্র থাকার প্রয়োজন নেই। কোরিয়া এর মাঝে অনেক পরীক্ষা করিয়েছে এবং দ্রুত ফলও দিয়ে দিয়েছে। ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রেও বেশ সাফল্য দেখিয়েছে দেশটি। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া ২০ দিনের মাঝে সংক্রমণ কমিয়ে আনতে পেরেছে স্বাধীন চলাচলে কোনো ধরনের চরম হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এমন দক্ষ পদক্ষেপের কারণেই দক্ষিণ কোরিয়া তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতিও কমিয়ে আনতে পেরেছে। যদিও এর পরও বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থনীতিতে ১.৪ শতাংশ পর্যন্ত সংকোচন দেখতে হচ্ছে তাদের। একই প্রক্রিয়ায় সাফল্য পেয়েছে তাইওয়ান ও হংকংও।

এখন প্রতিটি দেশকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে করোনা-উত্তর বিশ্বের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কেমন হবে। নিউজিল্যান্ড এখানে মহামারী মোকাবেলায় অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। যার সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে আইসোলেশন ও জনসংখ্যার কম ঘনত্বের বিষয়টি। পাশাপাশি তারা কঠোর লকডাউনের নীতি অনুসরণ করেছে এবং সব সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এখন দৈনিক সংক্রমণের হার এক ডিজিটে নেমে এসেছে এবং তারা ভাইরাস নির্মূলে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।

অবশ্য এখনো সব ধরনের বিদেশী নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ থাকায় দেশটির পর্যটন অর্থনীতি বিপর্যয়ে পড়েছে। যেখানে ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা ব্যয় করেছে ১০ বিলিয়ন ডলার। এই খাতটি কর্মশক্তির ৮.৪ শতাংশ সরবরাহ করে। খাতটি এখন থেমে গেছে।

অবশ্য অর্থনৈতিক পরাশক্তিরাও এখন হুমকির মুখে আছে। প্রথম প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৬.৮ শতাংশ। দেশীয় পণ্যের চাহিদা ফের বাড়তে শুরু করেছে। নানা ধরনের ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে তারা। যদিও এখনো মাত্র শুরু, কিন্তু এর মাঝে এটুকু পরিষ্কার যে নভেল করোনাভাইরাস অর্থনীতির চিত্র বদলে দিয়েছে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের অর্ধমিলিয়ন কোম্পানি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। যদিও চীন তুলনামূলকভাবে করোনা মোকাবেলায় অনেকটাই এগিয়ে ছিল। এখন আমেরিকায় বা অন্যান্য দেশে কতগুলো কোম্পানি নিজেদের গুটিয়ে নেবে, তা নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। অনেক মানুষ এখন এ প্রশ্নের উত্তর জানতে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে।

টাইম ম্যাগাজিন থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর