নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশ লকডাউন পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। বিশ্বের অনেক দেশেই জীবনের একমাত্র সত্য হয়ে উঠেছে লকডাউন। লকডাউন করোনাভাইরাস থেকে সৃষ্ট কভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে সফল হলেও এটা কি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে?

যুক্তরাজ্যের সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মার্টিন জে বুল যুক্তি দিয়েছেন লকডাউন ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার অনুসরণীয় পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা দরকার। চলাচলের স্বাধীনতার ওপর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ, বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সত্ত্বেও ‘কর্তৃত্ববাদী স্টাইল’ লকডাউন চলছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এটা কি সেরা উপায় হতে পারে?

ইউরোপে লকডাউনের এ ধারণা মূলত চীন থেকে আমদানি হওয়া। ইতালিতে শুরু হয়ে এখন পুরো ইউরোপে এটা অনুসরণ করা হচ্ছে। তবুও এ ব্যবস্থাগুলো আমাদের কাছে সুপরিচিত। লকডাউনের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, যা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। এখানে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক স্বাধীনতা মূল উদ্বেগের বিষয় নয়।

এদিকে যুক্তরাজ্যে, সাংবাদিক রবার্ট পেস্টন করোনাভাইরাসের বিলে রাষ্ট্রকে নতুন ক্ষমতা দেয়ার বিষয় উল্লেখ করে এক টুইটে বলেছেন, ‘আমার জীবদ্দশায় করোনাভাইরাস বিলের মতো এমন আইন কখনো হয়নি, যা আমাদের নাগরিক স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের ওপর এতটা দখল করে...এটা আমাদের সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্য। তবে এটা দুই বছরের জন্য রাষ্ট্রে বিশাল অপরিবর্তনীয় শক্তি হস্তান্তর।’ অবশ্যই এ লকডাউনের বিষয়ে রাষ্ট্রগুলো আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলতে পারে—এখানে বিজ্ঞান অনুসরণ করা হয়েছে।

লকডাউনের আতঙ্কে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারগুলোতে উপচে পড়া ভিড় সৃষ্টি হয় এবং ভাইরাস বিস্তারের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। এছাড়া শুরুতে আলাদাভাবে একেকটি জেলা বা রাজ্য লকডাউন করার কারণে মানুষ সেখান থেকে বের হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। এটাও ভাইরাসটিকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে সহযোগিতা করেছে। জাতীয় এ লকডাউন অব্যাহত থাকার পরও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়াও ঠেকানো যায়নি।

কিন্তু লকডাউনের বিকল্প আছে কি? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া লকডাউনের পথে নামেনি এবং চলাচলের স্বাধীনতার ওপর তারা কঠোর বিধিনিষেধও আরোপ করেনি। তার পরও ভাইরাসটির বিস্তার রোধে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এটা তারা করতে পেরেছে অসাধারণ পর্যায়ের পরীক্ষার মাধ্যমে। বিশেষত সংক্রামক রোগীদের পৃথককরণ, তাদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের সন্ধান এবং তার পর আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর তারা পুরো এ কাজটিতে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের ট্র্যাক করে অন্যদের সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে আপনার আশপাশে কভিড-১৯ রোগী আছে।

কোরিয়ান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রতিদিন ১৫ হাজার লোকের পরীক্ষা করার ক্ষমতা রয়েছে। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই তারা ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে পরীক্ষা করেছে। এর অর্থ হলো প্রতি ১০ লাখের মধ্যে তারা ৩ হাজার ৬৯২ জনের পরীক্ষা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ৫ জনকে পরীক্ষা করা হয়েছে। এটাই তাদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অনেক বেশি এগিয়ে রেখেছে।

কিন্তু এ পদ্ধতি অনুসরণ করতে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার বড় সক্ষমতা প্রয়োজন, যা বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলোর নেই। এটার অনুপস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।