নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত রিপোর্টে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কোনো আশার বাণী নেই। ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, ৪০ বছরে এ অঞ্চলটি তার সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা রেকর্ড করতে পারে এবং এর কমপক্ষে অর্ধেক অঞ্চল গুরুতর মন্দার মুখোমুখি হতে চলেছে। ২০২০ সালের মধ্যে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি ১.৮ থেকে ২.৮ শতাংশের মধ্যে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও বিশ্বব্যাংক ঠিক ছয় মাস আগে আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশের কোটায় থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল।
চলমান সংকটে মালদ্বীপে জিডিপি ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা অর্থনৈতিক পরিভাষায় জিডিপির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অঞ্চলে খুঁজে পেতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পুরো অঞ্চলটি জিডিপির সংকোচনের সম্মুখীন হতে পারে। বিশ্বব্যাংক যে সেক্টরগুলোকে মূল্যায়ন করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, সেগুলো হলো পর্যটন হ্রাস, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত, পোশাকের চাহিদা কম, আন্তর্জাতিক মূলধন প্রত্যাহার, রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস এর মধ্যে অন্যতম।
মনে রাখতে হবে, এ অন্ধকার পূর্বাভাসটি এমন একটি অঞ্চলের জন্য, যা এরই মধ্যে মহামারীটির অনেক আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ভারত সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ মন্দার মধ্যে পড়েছে। এর সব মূল খাতে সমস্যা রয়েছে; বিশেষত উৎপাদন ও টেলিযোগাযোগ খাতে। এমনকি বেকারত্বও দিন দিন বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান অনেক দিন ধরে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসংকটের মুখোমুখি। ইমরান খান ক্ষমতায় এসেও কোনো সুরাহা করতে পারেননি।
দক্ষিণ এশিয়া এরই মধ্যে কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে, যা সর্বোত্তম সময়ের মধ্যেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধা দেয়। নিম্নমানের রাস্তাঘাট ও দুর্বলভাবে বিদ্যুৎ গ্রিড দুষ্প্রাপ্যতাসহ দুর্বল অবকাঠামো অঞ্চলটি খারাপভাবে ব্যাহত হয়েছে, যেখানে যোগাযোগের অভাব রয়েছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের আকার/ ভলিউম অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক নিচে। মূলত ভারত ও পাকিস্তানের শীতল কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রক্রিয়া, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সমিতি (সার্ক) দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির জন্য সার্ককে কার্যকর জায়গায় নেয়া উচিত। এটি সহজভাবে বলতে গেলে, বিশ্ব পরিমণ্ডলে দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে আছে। সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সমীক্ষা অনুসারে, এ অঞ্চলটি বিশ্বের জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি বাস করে এবং সাধারণ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ১৫ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে।
এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান দখল করে আছে, যা পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া থেকে ভারত মহাসাগর অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের বা বিআরআইয়ের বিনিয়োগ এবং প্রভাবের প্রধান কেন্দ্রস্থল। একটি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল অঞ্চল এটি। সন্ত্রাসবাদ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন পর্যন্ত হুমকির ঝুঁকির এটি মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ দুটি তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর আবাসস্থল। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির ক্ষেত্রে কী ঘটে এবং অদূর ভবিষ্যতের জন্য এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার চূড়ান্ত পথটি মহামারীর তীব্রতার সঙ্গে আবদ্ধ হবে। মহামারীর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির মোকাবেলায় এ অঞ্চলের সরকারগুলোর কর্মপরিকল্পনা শুধু এ অঞ্চলের জন্য প্রভাব ফেলবে না, বরং তা পুরো বিশ্বের জন্য প্রভাব রাখবে।
ভারত, বিশ্ব অর্থনীতিতে যার বিশাল একটি শীর্ষস্থানীয় অবস্থান। দেশটির এ অবস্থানের মূল ভিত্তি হলো উদ্যমী তরুণ জনগোষ্ঠী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী। বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশটি বিশ্ববাজারের অন্যতম কেন্দ্র। সামগ্রিক বিবেচনায় করোনা সংকটের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ভারতকে প্রবল সংগ্রাম করতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক মডেল। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে ৭-৮-এর ঘরে ওঠানামা করছে। বাংলাদেশের জিডিপির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো পোশাক খাত। চলমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের শক্তিশালী পোশাক শিল্প খাত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। দুর্বল পোশাক শিল্প খাত কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, সারা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
করোনাভাইরাস অভিঘাতে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ, যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের টেক্সটাইল এবং শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের পর্যটন শিল্পের মূল প্রবৃদ্ধি খাত মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এই দেশগুলোর হাতে এমন কোনো বিকল্প নেই, যার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি চলমান রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক দুর্দশা জাতীয়তাবাদের শক্তিগুলোকে শক্তিশালী করবে, যা ইতিমধ্যে এ অঞ্চল ও বিশ্বে শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ভগ্নদশা থেকে দৃষ্টি সরাতে ও বিজেপি সমর্থনগোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করার প্রয়াসে সরকার তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এ এজেন্ডার একটি আক্রমণাত্মক দিক হলো পাকিস্তানের ওপর ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা। এ কৌশলে ছাড় না দিলে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
সামগ্রিকভাবে, অঞ্চলটি আবারো, বৃহত্তর বিশ্বের মতো ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নজর দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে মনোনিবেশ করবে। সার্ক হতে পারে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি সম্ভাব্য পথ। দিনশেষে, যদি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটা যৌথ সম্ভাবনা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে সার্কের পুনরুজ্জীবনের পথ সুগম হবে। কয়েক সপ্তাহ আগে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সার্কের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে একটি ভিডিও কনফারেন্স আহ্বান করে। কনফারেন্সে করোনাভাইরাস সংকট সমাধানে আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনার নানা বিষয় উঠে আসে। এর ফলে জরুরি তহবিল গঠিত হয় এবং সরবরাহ ভাগাভাগির ব্যাপারে মতৈক্য হয়।
এ ধরনের বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতা আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করে। তবে এটা স্বীকার্য যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা যেকোনো স্থায়ী অগ্রগতিতে বড় বাধা।
শেষ কথা, আমেরিকা, চীন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর মহামারীটির ক্ষতিকারক অর্থনৈতিক প্রভাবগুলো সম্পর্কে আমরা অনেক আলোচনা শুনি। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় দক্ষিণ এশিয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
মো. শরীফ হাসান: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়





