প্যারিস থেকে ১৫ কিলোমিটার পূর্বে কোনো এক সকালে ক্লেসটিনে বোডজি ২০০ মানুষের একটি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন শপিং ট্রলি নিয়ে। সরকার লকডাউন তুলে দেয়ার পর তখন মাত্র দুদিন পেরিয়েছে। ধনী শহরগুলোয় যারা থাকেন, তারা তখনো রাস্তায় বের হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু ক্লিচি-সাউস-বইসের মতো শহরের বাসিন্দাদের এমন বিলাসিতার সুযোগ ছিল না। যদি তাদের খেতে হয়, তবে তাদের বাইরে বেরোতেই হবে। কারণ বিনা মূল্যে খাবার বিতরণ শুরু হবে ঠিক ১১টায়।
বোডজি বইস শহরে তার স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে থাকেন। ২০০৫ সালে এ এলাকা থেকে ব্যাপক আকারে এক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল। সহিংস প্রতিবাদের ফলে হাউজিং প্রজক্টেগুলো পুনরায় শুরু করা হয়। কিন্তু বেকারত্ব এবং বাজে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঠিকই বহাল ছিল।
আইভরিকোস্টের বংশদ্ভূত বোডজি গত আট সপ্তাহ তার পরিবারের সঙ্গে ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। অন্যদের তুলনায় তার পরিবারকে অবশ্য খুব বেশি ভুগতে হয়নি। কারণ সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে তার স্বামী কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছেন এবং তিনি নিজেও এখন ভাবছেন ক্লিনারের কাজ আবার শুরু করার ব্যাপারে। কিন্তু সবকিছুর দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে তাদের হাতে থাকা অর্থ যথেষ্ট নয়। যে কারণে তাকে ফুড ব্যাংকের দিকে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, লিখে দিন আমার বুকে অনেক ক্ষোভ জমে আছে। সেখানেই লাইনে দাঁড়িয়ে হাসছিলেন এক লিটার বাথজেলের বোতল হাতে নিয়ে। পরে বোডজি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, এ অঞ্চলে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই হয়তো পাওয়া যাবে যারা বাথটাব ব্যবহার করে।
কয়েক মাস ধরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস তাণ্ডব চালাচ্ছে। ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা কোনোটাই এখনো নিশ্চিত না। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমরা সবাই এক। একই কথা বলেছেন বরিস জনসনও। তারকারাও একই বাণী উচ্চারণ করেছেন। ম্যাডোনা বলেছেন, যত ধনী বা বিখ্যাতই তুমি হও না কেন, এটা মহান সমতাদানকারী। এখানে যে বিষয়টা ভয়ঙ্কর, সেটি আবার মহান।
মহান সমতা কি আদৌ আছে
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মহান সমতার যে ধারণা তা বিশ্বাস করা কঠিন। কভিড-১৯-এর আগমনের পাঁচ মাসের প্রথম দুই মাস বিশ্ব ছিল প্রায় পুরোপুরি লকডাউন। এখন তা অনেক দেশে ধীরে ধীরে তুলে দেয়া হচ্ছে। যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, অভিজাত শ্রেণী তুলনামূলকভাবে বেশ অনাহত অবস্থাতেই থেকে গেছে। অনেকেই পূর্ণ বেতন এবং ইন্টারনেট নিয়ে নিজেদের লকডাউনকাল উপভোগ করেছেন। এই স্বাদ অনেকে পছন্দও করেছেন। যখন জুমেই ব্যবসা করা যাচ্ছে, তখন অফিসে গিয়েই বা কি লাভ। কিন্তু অনেক মানুষের জন্য এ সংকট শেষ হওয়ার নয়। যারা কিনা এই লকডাউনেও নিজেদের দোকান চালু রেখেছিলেন, বাসের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেছিলেন, নার্স ও সুপারমার্কেটের ক্যাশিয়ার হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সবকিছু থামার পরও কি তারা একই অবস্থায় থাকতে পারবে? এছাড়া সেই সব মানুষ যারা কিনা কাজ হারিয়েছে। যেমন ওয়েটার, বাবুর্চি, ফ্লাইট ও ট্রেনের কর্মী, ছোট দোকানের মালিক এবং তাদের কর্মীরা। যদি তাদের জন্য কিছু করা না হয়, তবে তারাও লাখো বেকারের তালিকায় নাম লেখাবেন।
কভিড-১৯ না মারলেও ক্ষুধায় মরতে হবে
দরিদ্র দেশগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, সেখানে সরকার প্রদত্ত কর্মকাণ্ড, ন্যূনতম বেতন এবং সামাজিক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা প্রায় শোনাই যায় না, সেখানে ভাইরাসের আরো বিভিন্ন ধরনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এমনকি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে এখনো মহামারী সেভাবে চূড়া স্পর্শ করেনি। কিন্তু লকডাউনের কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। এ অবস্থার সঙ্গে ধনীরা সহজেই মানিয়ে নিতে পেরেছে। কিন্তু দিনমজুরদের জন্য বাসায় থাকা মানে তাদের খাওয়ার জন্য কিছুই নেই। যদি ভাইরাস তাদের নাও মারে ক্ষুধা ঠিকই মেরে ফেলবে।
অসমতা সংক্রমণের মাত্রাকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে
পৃথিবীর সেসব দেশে মৃত্যুহার বাড়ছে, যেখানে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য অনেক বেশি। যেমন ব্রাজিলের কথা বলা যায়। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশ। একই কথা দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও বলা যায়। এছাড়া আরো অনেক জায়গাতেও বৈষম্য ও উচ্চ সংক্রমণের মাঝে যে সম্পর্ক তার আঞ্চলিক ও স্থানীয় স্তরেও প্রদর্শিত হতে পারে। এশিয়াতেও আয় ও সম্পদের বৈষম্য অনেক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে চীনে। পাশাপাশি অনেক সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের সঙ্গে থাকলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাও কঠিন হয়ে যায়। সব মিলিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণের আশঙ্কাও বেশ ত্বরান্বিত হতে থাকে।
ফেরার রাস্তা বন্ধ
নিউইয়র্কের যেসব জায়গায় ধনী মানুষের বাস, সেগুলো স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেকটাই খালি হয়ে গেছে। যেখানে ৪০ শতাংশ বাসিন্দা মহামারী আওতার বাইরে বসে আছে এবং শহরের বাইরে নিজেদের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় বাসায় সময় পার করছে। হ্যাম্পটমে স্থানীয়রা করোনা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছে। যাকে নিউইয়র্ক পোস্ট বর্ণনা করেছে ‘টোটাল ক্লাস ওয়ার’ হিসেবে। এটা এমন কিছু, যা অন্য জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশ, যেখানে অনেক মানুষের হাতে বেশ অল্প সুযোগই রয়েছে। অল্প কিছু ধনীদের হাতেই সব কুক্ষিগত। ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রিচার্ড উইলকিসনসন বলেছেন, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এমন জায়গায় পৌঁছতে যাচ্ছে, যেখান থেকে ফেরার আর কোনো উপায় নেই।
নভেল করোনাভাইরাস সেসব দেশেই সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেছে, যেখানকার সুরক্ষা ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। এসব দেশে ভাইরাস অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে গরিবদের মাঝে। যদিও এখনো ধনীদের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সময় আসেনি। ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, সমাজে বৈষম্যজনিত সমস্যা দেখা দিলে তা ধনীদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে ধনী ও গরিবের পার্থক্য একেবারেই নিশ্চিত বিষয়। অনেক দেশে অভিজাতরা করোনা আক্রান্ত হয়েছে বিমান ভ্রমণের সময়। পরে সেটি তারা নিজেদের শহরে নিয়ে আসে।
যেমন হাইতিতে প্রথম দুটি সংক্রমণ শনাক্ত হয় মার্চের ১৯ তারিখ। যাদের একজন ছিলেন রোডি রোডভয়, যিনি তখন ফ্রান্স থেকে এসেছিলেন।
ডার স্পিগেল





