দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববাসী বাস করছে মিথ্যা আশা এবং নড়বড়ে ভারসাম্যের এক সমাজে। মহামারীর কারণে বৈশ্বিক অপকর্মের পদ্ধতিগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা কিনা অনেকদিন ধরে এ রকম একটি স্মরণীয় মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল। দুই মাস আগেও এই ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সম্পদশালী ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন একটি দেশ এমন ভাবমূর্তি নিয়ে থাকবে, যা সাধারণত আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে কল্পনা করা যায়। পাশাপাশি এখনো চীনের উত্তরের শিল্পাঞ্চলীয় এলাকার নীল আকাশ এবং ভারতের পবিত্র নদীর ঝলমলে পৃষ্ঠতল দেখাটা এখনো বেশ দুরূহ। বিশ্বব্যাপী দূষণের মাত্রা অবশ্য এমন মাত্রায় এর আগে কখনই কমেনি। সমুদ্র ও বনাঞ্চলের ওপর এমন প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে আকাঙ্ক্ষার বিষয় হিসেবেই ছিল। বিশ্ব তার পূর্ব অবস্থায় ফেরার আগে বন্যপ্রাণীগুলো মানবসৃষ্ট অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসেছিল। যেমন লাওসের শহরে বানর নেমে আসার মতো লকডাউন শহরগুলোর আশপাশে বন্যপ্রাণীকে এদিক-সেদিক ঘুরতে দেখা গিয়েছিল। মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা যতই বাড়ছিল বিলুপ্তপ্রায় পতঙ্গ এবং পাখিরা কোলাহল পৃথিবীতে নতুন করে জেগে উঠছিল। কেবল মানুষের অনুপস্থিতিতে যে বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণে অস্থায়ী পরিবেশগত ভারসাম্য সম্ভব হয়েছিল।

সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, এই মহামারী বিভিন্ন ধরনের পথ তৈরি করেছে। যে চিত্রটি এখন আমাদের সামনে এসেছে তা দেখিয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিকভাবে অতীতে আমরা কী কী ভুল করেছি। যেখানে খোলা বাজার, মুক্ত বাণিজ্য, অবিচ্ছিন্ন গতিশীলতা, বিরামহীন সাপ্লাই চেইন, অত্যধিক খরচ, উচ্চমাত্রার সংযোগসহ অনেক কিছু রয়েছে।

কিন্তু এমন মারাত্মক পরিবর্তনের জন্য আমরা কি প্রস্তুত? এটা নিশ্চিত যে শহরগুলোর যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মহামারীর পর তার পতন ঘটতে যাচ্ছে। জনসেবার খাত, স্বাস্থ্য ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি শাসন হঠাৎ করেই বিচারমূলক হয়ে উঠেছে। কলেজ, অফিস, স্কুল, শপিং মল, বিনোদনের স্থান ও ক্লিনিকগুলো এখন ভার্চুয়াল পরিবেশে প্রবেশ করেছে। শহরে আমাদের অবিরাম ও লক্ষ্যহীন ঘোরাফেরা এখন অনলাইনের দিকে মোড় ঘুরিয়েছে। তবে ভার্চুয়াল রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া কি সম্ভব? কিংবা ভার্চুয়াল ক্রিকেট খেলা?

তবে উপাদানগত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কী হবে? আমরা এখন উন্নয়নের যে সীমাবদ্ধতা তাকে স্বীকার করে নিচ্ছি? আমেরিকান অগ্রগতির এ আপাদমস্তক মডেলটি কয়েকটি দেশকে তাদের নিজস্ব স্থানীয় ধারণা প্রয়োগ করার পথে চালিত করেছে। ছোট দেশ যেমন লুক্সেমবার্গ, ভুটান এমনকি কোস্টারিকাও এর অংশ, কারণ তারাও তাদের আকার অনুযায়ী স্বতন্ত্র পথ অনুসরণ করে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাইরে রেখে প্রগতির অন্যান্য অর্থনৈতিক মডেল কি এখানে রয়েছে? এমন একটি মডেল যেখানে মানুষ সরকারি সম্পত্তি ভাগাভাগি করতে পারবে?

দেশগুলো কি এখন সীমান্ত এবং বাজার বন্ধ করে রাখবে? কারণ জরুরি পণ্য যেমন চিনি, গম, চাল ও ভুট্টা আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের অংশ এবং বিভিন্ন দেশে এসবের উৎস রয়েছে। অনেক জায়গায়ই ঐতিহ্যবাহী খামার পদ্ধতিগুলো বাদ দিয়েছে এবং বৈশ্বিক মনোপলিগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা দেখিয়েছে। নিশ্চিতভাবেই, যদি ওয়াশিংটনের কোল্ডস্টোরেজের আপেল দুবাই না যায়, তবে তা মৌসুমি স্থানীয় উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন আমরা কি চিন্তার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক থাকতে পারি, কিংবা খাওয়ার ক্ষেত্রে?

শেষতক এখানে পর্যটন শিল্পের অনিবার্য পতনও দেখা যাচ্ছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভ্রমণ পরিবেশের ওপর মানুষের পদচিহ্নকে আরো বিস্তৃত করেছে এবং গ্রহের বিপন্নতাকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। তবে কি দেশে দেশে বিমান ভ্রমণের যে চর্চা তা শেষ হতে যাচ্ছে, পাশাপাশি শহরগুলোর মাঝে অতিরিক্ত ট্রেন যাতায়াত এবং মেট্রো সিস্টেম যা কিনা মানুষকে মূলের সঙ্গে সংযুক্ত রাখবে? যদি তাই হয় তবে তা ভবিষ্যেক আরো বেশি মানবিক হওয়ার পূর্বাভাস দেয়। যেখানে শহরগুলোর ব্যস্ততা কমবে এবং আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে আরো বেশি যুক্ত হয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ থাকবে।

সরকারগুলো লকডাউন দীর্ঘ করা এবং চালু রাখার এক কঠিন দ্বন্দ্বের মাঝে অবতীর্ণ হয়েছে। সম্ভবত সাহসীরা দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে তাদের ব্যর্থ সিস্টেমগুলো ধসে পড়তে দেবে। যেমন ভারতে, যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখুন না কেন, ধনী, গরিব, শ্রমজীবী, অভিবাসীরা মহামারীর আগে থেকে জীবনযাত্রার একটি উচ্চমান থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রতিটি শহর ছিল অসমতায় পূর্ণ:  গ্লাস মল বনাম বস্তি, ব্রিমিং পুল বনাম হ্যান্ড পাম্প, স্থূলতা বনাম অনাহার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি বনাম ছিল নোংরা এলাকা। বিষয়গুলো এখন আরো বেশি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সন্দেহাতীতভাবে রাজনৈতিক নেতারা চেনা বাস্তবতাকেই আঁকড়ে ধরতে চাইবেন, যা দুঃখজনক ও অন্যায়। তারা নিজেদের অবস্থান রক্ষার স্বার্থে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে মহামারী খুব গৌণ সমস্যা। বিশৃঙ্খলা এড়ানোর উপায় হচ্ছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু এগুলো একেবারেই বাজে অজুহাত।

এখন রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও আইনপ্রণেতাদের ঠিক করতে হবে আমরা কি আগের জীবনে ফিরে যাব, নাকি ভালো কিছুর জন্য পরিবর্তনের এ সুযোগকে কাজে লাগাব।

আউটলুক ম্যাগাজিন