কভিড-১৯ নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে এটি পরিবেশের উন্নতি ঘটাবে। বলা হচ্ছে মনুষের ঘরে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা যদিও এ ধরনের আশাবাদকে খুব বেশি সমর্থন করছে না।

শুরুতে হয়তো এক ধরনের সুবিধার দেখা মিলেছে। যেমন বাতাসের পরিষ্কার হওয়া থেকে পাখির গান এবং বিমানের চুপ হয়ে যাওয়া। যদিও এসব খুবই অস্থায়ী। পাশাপাশি লকডাউন শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ক্ষয়ক্ষতিও আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। এখন কিছু বিশেষজ্ঞ ভয় পাচ্ছেন যে ভবিষ্যতে বিশ্বের ট্রাফিক ঝুঁকি হয়তো আরো বাড়বে, বাড়বে দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনও। যা কিনা বাড়তে পারে আগের চেয়ে আরো বাজেভাবে। এই বিষণ্ন দৃশ্য কখন দেখা যাবে, তা হয়তো এখনই বলা যাবে না। কিন্তু দুশ্চিন্তা করার মতো চিহ্ন এখনই দেখা যেতে শুরু করেছে।

এপ্রিলের শুরুতে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত শাটডাউন শুরু হয়। ফলে গত বছরের তুলনায় দৈনিক বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন ১৭ শতাংশ নিচে নেমে আসে। কিন্তু ১১ জুনের ডাটা বলছে, একই অবস্থায় ২০১৯ সালে চেয়ে বর্তমানে কার্বন নির্গমন ৫ শতাংশ কম দেখাচ্ছে, অথচ সাধারণ কাজকর্ম এখনো পুরোপুরি শুরুই হয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর কোরিনে লে কুইরে বলেন, এখনো সেই একই গাড়িগুলো রয়ে গেছে, সেই একই রাস্তাও রয়ে গেছে, আছে আগের শিল্প-কারখানাগুলো এবং একই বাড়িগুলোও। তাই যখনই বিধিনিষেধ তুলে দেয়া হবে, আমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই ফিরে যাব আবার। তার মতে, এখন ঝুঁকিও অনেক বেশি, কারণ কার্বন উৎপাদন মহামারীর আগের সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে। কোরিনে বলেন, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন আমরা এমনটা করেছি। ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও শুরুতে কার্বণ নিঃসরণ কমে গিয়ে পরে আবার বেড়ে যায়।

চীনে নোংরা পরিবেশ ফিরে আসার ইঙ্গিত

ভাইরাস আঘাত করার পর প্রথম দেশ হিসেবে শাটডাউন করা হয় চীনে এবং সবার আগে খুলেও দেয়া হয় এ দেশ। অন্য জায়গায় কী হতে পারে তার একটি উদাহরণ হচ্ছে চীন। দেশটিতে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বাতাসের যে উন্নতি এসেছিল, তা কিনা এখন গায়েব হয়ে গেছে।

এখন ফ্যাক্টরিগুলো ক্ষতি পোষানোর জন্য কাজের সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে মে মাসে এসে দূষণ আবারো করোনাপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। এমনকি কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু সময়ের জন্য ছাড়িয়েও গেছে, পরে অবশ্য কিছুটা কমেছে। এর মাঝে প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষগুলোও মরিয়া হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা হওয়ার জন্য। ফলে যুক্ত হয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পও। এখন নতুন এ প্রকল্প যদি অগ্রসরমান হয় তবে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যাও বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞ মায়লাভিরটা বলেন, হঠাৎ করেই অনেক বেশি শিল্পের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। যদি বিশ্ব বিপর্যয়কর অবস্থা কাটাতে চায়, তবে চীনকে অবশ্যই কয়লায় নয়, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে হবে। তাই এটা বেশ উদ্বেগজনক ব্যাপার।

দূষকরা এখন আগের চেয়ে সাহসী

মহামারীর মাঝামাঝি সময়ে অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে জীবাশ্ম জ্বালানি, প্লাস্টিক, এয়ারলাইনস ও অটোমোবাইল শিল্প বেশ অসুবিধাজনক অবস্থায় পড়েছে।

ফ্রেন্ডস অব আর্থের সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট লুকাস রোজ বলেন, মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে যে দূষণকারীরা এই সংকট থেকে আরো সাহস অর্জন করবে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হবে।

প্রচুর নগদ অর্থের একটি ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে তেল ও গ্যাস। এখন মহামারীকালীন ক্ষতি পোষানোর জন্য কোম্পানিগুলো আক্রমণাত্মকভাবে লবিং শুরু করেছে পাবলিক ফান্ড থেকে বিলিয়ন ডলার আদায়ের জন্য।

ফ্র্যাকিং ইন্ডাস্ট্রিগুলোও যারা বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে অর্থ খরচ করে আসছিল তারাও এখন সাহায্যের জন্য আবেদন করেছে। এটা তাই কেবল জলবায়ুর জন্যই হুমকি বাড়াচ্ছে না, বরং করদাতাদেরও বিপদে ফেলে দিচ্ছে।

অ্যামাজনকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে

করোনাভাইরাস যখন বিধ্বংসী হয়ে ওঠে তখন ব্রাজিলে অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীরা অ্যামাজানে নিজেদের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। একটি ডাটা বলছে, গত বছর এপ্রিলের তুলনায় এ বছরের এপ্রিলে ৬৪ শতাংশ বেশি ভূমি উজাড় করা হয়েছে। যদিও ২০১৯ সাল ছিল এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে অধিক বন ধ্বংসকারী বছর।

প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো দীর্ঘদিন ধরেই অ্যামাজনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য দূতিয়ালি করে আসছেন। সে ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধ কাঠুরেসহ অন্য ব্যবসায়ীরা অ্যামাজনে অল্পই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। সামনের দিনে এসব ঘটনা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক থেকে সংক্ষেপে অনূদিত