বিশ্ব আশা করছে খুব দ্রুত একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন সবার জন্য উপলব্ধ হবে। মহামারী থেকে উদ্ধার পেতে হলে এই ভ্যাকসিনের কোনো বিকল্পও নেই। এখন পর্যন্ত ১৬০টির বেশি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন গবেষকরা। এর মাঝে ৩১টি কোম্পানি মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করেছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারে এই অগ্রগতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় নজিরবিহীন। এর মাঝে একটি ভ্যাকসিন, রাশিয়ার স্পুটনিক ভি, যা কিনা গত সপ্তাহে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনও পেয়েছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ রাশিয়াকে আহ্বান জানিয়েছেন ভ্যাকসিন সুরক্ষিত কিনা তা দেখার জন্য বড় পরিসরে পরীক্ষা করতে। 

কিন্তু যদি এই ভ্যাকসিন প্রার্থী এবং আরো যারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারা প্রমাণ করতে পারে যে ভ্যাকসিন কার্যকর ও নিরাপদ, তার পরও এটি কেবলই গোটা প্রক্রিয়াটির প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর পরের রাস্তাটি একেবারে সহজ নয়। সবার জন্য ভ্যাকসিনকে উপলব্ধ করার যে চ্যালেঞ্জ তাতে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। 

চ্যালেঞ্জ ১: ভ্যাকসিন উৎপাদন

ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর প্রথম যে বড় চ্যালেঞ্জটির মুখোমুখি হতে হবে তা হলো যথেষ্ট পরিমাণে এটির উৎপাদন করা, যাতে ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম শুরু করা যায়। একটি হিসাব বলছে, প্রতি বছর ভ্যাকসিন উৎপাদন ক্ষমতা ৬.৪ বিলিয়ন পর্যন্ত, যদিও এটা কেবল সিঙ্গেল ডোজ ইনফ্লুয়েঞ্জা ডোজের ওপর ভিত্তি করে বলা হচ্ছে।

কিন্তু কভিড-১৯-এর বিকাশমান অনেকগুলো ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে দুই কিংবা তিনটি ইনজেকশনের প্রয়োজন হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য ব্যবহূত প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন তৈরি করতে হয় তবে বৈশ্বিকভাবে এর উৎপাদন অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

এটা ধারণা করা হয় যে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার মাঝে দুই ডোজের ভ্যাকসিনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণে ইমিউনিটি পাওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডোজ। যা কিনা বর্তমানে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর যে উৎপাদন সক্ষমতা তার দ্বিগুণ।

এখন ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো যদি ব্যাপকভাবে তাদের উৎপাদন সক্ষমতাকে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন প্রস্তুত করার দিকে চালিত করে তবে অন্যান্য ভ্যাকসিনের স্বল্পতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে রোধ করা যায় শৈশবের এমন রোগ যেমন হাম, মাম্পস ও রুবেলা। দেখা যাচ্ছে, কভিড-১৯ কে অগ্রাধিকার দিতে গেলে অন্য রোগে আক্রান্তদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমরা কি অগ্রিম ভ্যাকসিন কিনতে পারি?

ভ্যাকসিন উৎপাদনের এই সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারগুলো এর আগে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে অধিকারের নিশ্চয়তার জন্য অগ্রিম চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছিল। এ ধরনের কমার্শিয়াল-ইন-কনফিডেন্স চুক্তি সচরাচর গোপনে স্বাক্ষরিত হয়ে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এজন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মূল্য দিতে হয় সরকারগুলোকে। এটি মূলত নির্ভর করে ক্রেতা হিসেবে তারা কত নম্বর অবস্থানে আছে এবং তাদের মূল্য পরিশোধের সক্ষমতার ওপর।

এর অর্থ হচ্ছে যেসব দেশ অগ্রিম টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনতে সক্ষম হবে তারা আগে এটি পাবে, যার ফলে গরিব দেশগুলো বাদ থেকে যায় কিংবা তাদের বাধ্যতামূলকভাবে অপেক্ষায় থাকতে হয়। অতীতের দুটি ঘটনার ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটতে দেখা গেছে।

২০০৭ সালে দেখা গেছে, ইন্দোনেশিয়া সে সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও এইচ৫এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন কিনতে পারেনি। এর কারণ ছিল অনেকগুলো ধনী দেশ অগ্রিম চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাকসিন কিনে নিয়েছিল। ২০০৯ সালে ধনী দেশগুলো এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনের প্রায় সবগুলো ডোজ কিনে নিয়েছিল, ফলে গরিব দেশগুলো বঞ্চিত হয়েছিল।

বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের নেতা, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও আছেন, বলেছেন কভিড-১৯-এর সফল ভ্যাকসিন সমানভাবে ভাগাভাগি করা উচিত। জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়াও ১৬৫টি দেশের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স গ্যাভি এবং কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপারেন্ডেন্স ইনোভেশনের শুরু করা ‘কোভ্যাক্স’ উদ্যোগে যোগ দেয়। এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের ২ বিলিয়ন ডোজ সরবরাহ করা।

বিশ্বের ৬০ শতাংশ জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করা দেশগুলো এই উদ্যোগে স্বাক্ষর করেছে, যদিও সবাই এ উদ্যোগে নেই। অন্যদিকে আমরা বেশ কয়েকটি উদাহরণ দেখছি, যেখানে সরকারগুলো একটি অন্যটির ওপর অগ্রাধিকার পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এখানে মূল সমস্যাটি হচ্ছে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ, যা কিনা সমতা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পাওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে। এটি সেসব দেশের সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহের সংকট তৈরি করবে, যেখানে আগে ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য বিশেষ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ২: ভ্যাকসিনের বিতরণ

কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে এর বিতরণ। বেশির ভাগ ভ্যাকসিন কোল্ডস্টোরেজে পরিবহন করা দরকার। যা কিনা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য সমস্যা তৈরি করে যেসব অঞ্চলে বৈদ্যুতিক গোলযোগ একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৫০ শতাংশ ভ্যাকসিন প্রতি বছর নষ্ট হয়, এর কারণ হচ্ছে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অভাব। 

এদিকে বিমানযাত্রায় আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে কার্গো চলাচলও শ্লথ হয়ে এসেছে। ভ্যাকসিন বিতরণকে সামনে রেখে এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে এ সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান করা দরকার।

উৎপাদন থেকে প্রাথমিক পরিবহনের বাইরে, গ্রামীণ ও অনগ্রসর অঞ্চলগুলোতে পরিশীলিত লজিস্টিক সার্ভিস প্রয়োজন, যা কিনা অনেক গরিব দেশের নেই। এর ফলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ চেইনে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ছাড়া ভ্যাকসিন যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।

দ্য কনভারসেশন