মার্চের মাঝামাঝি সময়ের এক শনিবার আমার শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সে সময় টেস্ট করা ছিল ব্যাপক ঝামেলার বিষয়। প্রথম কয়েকদিন আমি অসুস্থ ছিলাম। নিউইয়র্কে আমার ছেলে ডাক্তার হিসেবে কর্মরত, সে বারবার আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের অবস্থা সম্পর্কে। সবকিছু ভালোই ছিল।
জুনের মাঝামাঝি সময় লকডাউন তুলে নিলে আমি নিকটস্থ ক্লিনিকে যাই। মূলত কৌতূহলী হয়েই আমি গিয়েছিলাম যে এমন একটি রোগ আমার হয়েছে, যা আরো লাখো মানুষকে সংক্রমিত করেছে।
অ্যান্টিবডি টেস্টের দুই সপ্তাহ পর জানতে পারলাম, আমি পজিটিভ। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে আমাকে আরো জানানো হলো, আমি ইমিউন। যে প্রথম ভাবনাটি আমার মনে আসে সেটি ছিল, আমার মহামারী শেষ। আমাকে অন্তত পুরুষ, বয়স্ক ও এ ব্লাড গ্রুপ হওয়ার ঝুঁকির কারণে বাড়তি দুশ্চিন্তা করতে হবে না। এর পরই অবশ্য আমার মনে হলো, অ্যান্টিবডি টেস্ট অনেক সময় ভুল ফল দিতে পারে। তাছাড়া আর আরেকটি বিষয় হচ্ছে ঠিক কতদিন পর্যন্ত ইমিউনিটি থাকতে পারে কিংবা আমার অ্যান্টিবডি কতটা ভালো।
তাছাড়া আমি যদি অসুস্থ হই, তবে আমার স্ত্রীর কী হবে। যে কিনা আমার সঙ্গে দূরত্ব রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আংশিকভাবে সফল হয়েছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমার স্ত্রীও
অ্যান্টিবডি টেস্ট করায়, কিন্তু তার নেগেটিভ আসে। এটা কীভাবে হতে পারে? এটা অনেকটা রসিকতা বলেই মনে হলো।
লকডাউনের মাস খানেক পর, কাজের পাশাপাশি কিছু করার কথা ভাবলাম। সে সময় আমি কনভালসেন্ট প্লাজমা দান করার কথা ভাবলাম, যা হয়তো অন্য কোনো কভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগীকে সাহায্য করবে।
প্লাজমা যা কিনা অ্যান্টিবডি ধারণ করে এবং ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ হওয়া থেকে বিরত রাখে। একজন ডোনার স্পেশালিস্ট (নার্স কিংবা ফেলবোটোমিস্ট) প্লাজমা থেকে লাল কোষকে আলাদা করেন। যা ৯২ শতাংশ পানিসহ বিভিন্ন উপাদান দ্বারা গঠিত। প্লাজমা দেয়ার সময় ভাবছিলাম আমি কি আমার সময় নষ্ট করছি কিনা?
কনভালসেন্ট প্লাজমার ১০০ বছরের বেশি সময়ের পুরনো ইতিহাস রয়েছে। এটি কেবল ১৯১৮ সালের ফ্লু মহামারীর বিষয়ই নয়। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন এমিল ভন বেহরিং। যা তিনি পেয়েছিলেন সেরাম থেরাপির জন্য, কনভালসেন্ট প্লাজমাকে তখন এ নামেই ডাকা হতো। সাম্প্রতিক সময়ে ইবোলার বিরুদ্ধেও কনভালসেন্ট প্লাজমা ব্যবহার করা হয়েছিল। এদিকে জানা গেছে, কোস্টারিকা ভন বেহরিংয়ের মতো করে চেষ্টা করছে ঘোড়ার অ্যান্টিবডি দ্বারা সার্স-কোভ-২ তে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা করতে।
তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয় যে প্লাজমা কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর জন্য কাজ করে কিনা। অপর্যাপ্ত ডাটার কথা বলা হয়েছে এনআইএইচের কভিড-১৯ চিকিৎসার গাইডলাইন প্যানেল থেকেও।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য তথ্যে বিশ্বাসী মানুষ নন। তিনি বলেছিলেন, আপনার রক্ত মূল্যবান। এ ঘোষণার পর অবশ্য ট্রাম্প নিজেও সংক্রমিত হলেন। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম কী হবে যদি আমার প্লাজমা ট্রাম্পের জন্য ব্যবহার করা হয়, যেহেতু এটা অনুমোদিত কয়েকটি চিকিৎসার একটি। এরপর আমি বুঝলাম কোনো সুযোগ নেই। ট্রাম্প হচ্ছে বিশেষ একজন। কারণ তিনি পরীক্ষামূলক মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি পেয়েছেন, যা সার্স-কোভ-২-এর জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী।
এরপর আমি ভাবলাম, এক বছর পর আমি যদি কভিড-১৯-এ ফের আক্রান্ত হই তবে এ প্লাজমা আমার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। যদিও আরেকটি বিষয়ও আমার মনে এল, আমি মৃদুভাবে সংক্রমিত ছিলাম। তাই আমার যে ধরনের অ্যান্টিবডি তা হয়তো অন্য রোগীদের চিকিৎসা করতে সক্ষম নয়। যদিও ব্লাড সেন্টারের স্টাফরা নিশ্চিত করেছেন, তারা আমি যা দান করেছি তা পরীক্ষা করে দেখবেন এবং আমাকে জানাবেন।
আমি এক সপ্তাহের বিরতিতে আটবার প্লাজমা দেয়ার জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত। অর্থাৎ আমি আরো একবার দিতে পারব। তবে আমি শেষবার প্লাজমা তখনই দেব, যখন জানব যে আমার প্লাজমা আসলেই কাজ করে কিনা।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান





