বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ে। এর পর থেকে হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ফলে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। চিকিৎসকরা বলছেন হাঁচি, গলা ব্যাথা, জ্বর ইত্যাদি করোনার প্রাথমিক লক্ষণ। আবার আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলেও অনেকে এই ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়।

ফলে কে করোনায় আক্রান্ত তা বোঝা ডাক্তারদের জন্য কঠিন হচ্ছে। আবার অনেক রোগী লক্ষণ লুকিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। অন্যদিকে ডাক্তার ও স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রয়োজনীয় পিপিই সহ চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে ফলে তারা আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

তা সত্ত্বেও তারা দেবদূত হয়ে প্রাণপন লড়াই করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন ২০১৫- এর তথ্য মতে দৈনিক ১৬ হাজারেরও বেশি রোগী সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এ ছাড়াও বর্হি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া রোগী সংখ্যা অনেক বেশি। সব মিলিয়ে ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসা দিতে। দেশে ডাক্তার ও জনসংখ্যার অনুপাত ১ : ১৭২৪ ( অর্থনৈতিক সমীক্ষা,২০১৯)। ফলে ডাক্তারদের উপর কতটা চাপ যাচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন মে মাসের শেষ নাগাদ ৫০ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে ২০ শতাংশ রোগীকে হাসপাতালের সেবা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

ফলে ডাক্তারদেরই মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে সেবা প্রদানে। কিন্তু দিন যতোই যাচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৭০০ জনের উপর স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছে। এমনকি চিকিৎসকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। "সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি এন্ড রাইটস" এর একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী মার্চ ২১ থেকে এখন পর্যন্ত ২৬৫ জন নার্স করোনায় আক্রান্ত। গত ২৪ তারিখ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ডাক্তারের সংখ্যা ৩০৪ জন।

এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই বলা যায়, আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা। চিকিৎসকরা এভাবে আক্রান্ত হতে থাকলে চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হবে ফলে ভেঙ্গে পড়বে স্বাস্থ্য সেবা। গত কিছু দিন ধরে আক্রান্তের রোগীর সংখ্যার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে ওঠা নামা করছে। ইতোমধ্যে প্রায় প্রতিটি জেলায় করোনা হানা দিয়েছে যা গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ।কিন্তু প্রত্যান্ত অঞ্চলে কিংবা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ডাক্তারের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ ৬৫৪ টি সরকারী হাসপাতাল এবং স্বস্থ্যখাতে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা ২৫৬১৫ জন। ডাক্তার, নার্স, আয়া সহ মোট  জনবল ৭৮৩০০ জন ( স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)।

বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৭ লক্ষ (বিবিএস,২০১৯)। ফলে অল্প জনবল দিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য খুবই কঠিন কাজ। তাই স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হলে অবস্থা আরো নাজুক হবে। চিকিৎসকদের সূরক্ষায় প্রতিটি উপজেলা করোনা রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড ও চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে হবে। চিকিৎকদের থাকার জন্য হোটেল ও গাড়ির সরবরাহ করতে হবে। উপজেলা ভিত্তিক টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান বৃদ্ধি করতে হবে যাতে বাড়িতে বসেই অনেকে সেবা নিতে পারবে।

ফলে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে যাবে। জরুরী ভিত্তিতে ১৫-২০ হাজার ডাক্তার নার্স নিয়োগ দিয়ে স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দূর্যোগ মোকাবেলায় কাজে  লাগাতে হবে। এছাড়াও যারা এমবিবিএস অধ্যায়নরত তাঁদেরকে ডাক্তারদের সহকারী হিসাবে ব্যবহার করা যায়। তবে  সবকিছুর আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা আগে নিশ্চত করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে পিপিই, হ্যান্ডসেনিটাইজার, গ্লাভস সহ পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থার পদক্ষেপ নিতে হবে।

কারণ স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হলে তাদের মাধ্যমে সেবা গ্রহণকারী অনেক মানুষ আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকবে তাই তাদের সুরক্ষা সামগ্রী আগে প্রদান করেই চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত করতে হবে।

লেখক : শিক্ষক ও নাগরিক সাংবাদিক