বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর বিস্তৃতির সময় ভাইরোলজিস্ট ডেভিড মন্টেফিওরি অবাক হয়ে লক্ষ করছিলেন কীভাবে মরণঘাতী এ ভাইরাসটি, যা কিনা মহামারীর জন্য দায়ী, কীভাবে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে বদলে যাচ্ছে। মন্টেফিওরি তার ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন এইচআইভির ক্ষেত্রে মিউটেশন ইমিউন সিস্টেমকে এড়াতে কীভাবে সাহায্য করে তা নিয়ে গবেষণায়। তার ধারণা, একই ঘটনা হয়তো সার্স-কোভ-২-এর ক্ষেত্রেও ঘটে থাকতে পারে।

মার্চে ডিউক ইউনিভার্সিটির এইডস-ভ্যাকসিন গবেষণা ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর মন্টেফিওরি যোগাযোগ করেন এইচআইভির বিবর্তন বিশেষজ্ঞ বেটে কোরবারের সঙ্গে। এরই মধ্যে তিনি করোনাভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স নিয়ে কাজ করছিলেন। এইচআইভির তুলনায় সার্স-কোভ-২ বিস্তৃতির সঙ্গে অনেক শ্লথভাবে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু একটি মিউটেশন কোরবারকে ধাক্কা দেয়। এটি ছিল স্পাইক প্রোটিনে জিন এনকোডিং, যা কিনা ভাইরাস কণাকে কোষে প্রবেশে সহায়তা করে। কোরবার কভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের নমুনায় বারবার মিউটেশন দেখেছিলেন।

এপ্রিলে কোরবার, মন্টেফিওরি এবং অন্য বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তা দিয়ে বায়ো-আর্কাইভে পোস্ট করে জানান যে ডি৬১৪জি বিপজ্জনক হারে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ইউরোপে এটি দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও এটি অবস্থান নিয়েছিল। সেই পেপারে বলা হলো, ডি৬১৪জি হচ্ছে সার্স-কোভ-২-এর অনেক বেশি স্থানান্তরযোগ্য।

এ দাবিগুলো অনেক বিজ্ঞানীকে হতাশ করেছিল। এটা পরিষ্কার ছিল না যে ডি৬১৪জি-এর ভাইরাল লিনিয়েজ অনেক বেশি স্থানান্তরযোগ্য কিনা কিংবা এর উত্থান অস্বাভাবিক কোনো কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছিল কিনা। কিন্তু সতর্কবার্তা দ্রুত মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ শিরোনাম করেছিল ভাইরাস অনেক বেশি বিপজ্জনকভাবে মিউটেট হচ্ছে। বিপরীতে মন্টেফিওরি বলেছেন, তিনি ও তার সহকর্মীরা আফসোস করছিলেন ভাইরাসের এ রূপের উত্থানকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে বর্ণনা করায়।

এর ফলে ডি৬১৪জি নিয়ে আগ্রহে অন্য রকম এক উন্মাদনার জন্ম দেয়। এমনকি মিউটেশন ভাইরাসের বৈশিষ্ট্যকে পরিবর্তন করে—এ তত্ত্বে যারা সন্দেহ পোষণ করেছিলেন তারাও এর কৌতূহলী দিক নিয়ে একমত ছিলেন। এর কারণ ছিল, গগনবিস্তারী উত্থান ও সর্বব্যাপিতা। কয়েক মাস ধরে এ বংশটি সার্স-কোভ-২-এর প্রায় সব সিকোয়েন্সে পাওয়া গিয়েছিল। ভাইরাল এপিডেমিওলজিস্ট নাথান গ্রুবাগ বলেন, এ রূপটিই এখন মহামারী। যার ফলে এর বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু কিছু গবেষণা বলছে, ভাইরাস বহনকারী বিকল্প রূপ কোষকে আরো সহজে সংক্রমিত করতে পারে। অন্য আরো কিছু কাজ সম্ভাব্য সুসংবাদ প্রদান করে : এই রূপটির অর্থ হতে পারে যে ভ্যাকসিনগুলো আরো সহজেই সার্স-কোভ-২ কে লক্ষ্য করে চালিত হতে পারে। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন, এমন নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই যে ডি৬১৪জি ভাইরাসের বিস্তৃতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলে কিংবা প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া এর উত্থানের ব্যাখ্যা দেয়।

এখনো করোনাভাইরাসের মিউটেশন নিয়ে গবেষকদের উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন বেশি এবং কেউ এখন পর্যন্ত সার্স-কোভ-২-এর এমন কোনো পরিবর্তন পাননি যা কিনা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, বলেছেন করোনাভাইরোলজিস্ট থিমোথি শিহান, গুরুবাগ ও অন্যরা। কিন্তু মিউটেশন নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক মিউটেশন ঠেকাতেও সহায়তা করতে পারে: যেগুলো ভ্যাকসিন কিংবা অ্যান্টিবডি থেরাপির ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

ধীর পরিবর্তন

চীনে সার্স-কোভ-২ শনাক্ত হওয়ার পর গবেষকরা ভাইরাল নমুনার বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন এবং জেনেটিক কোড অনলাইনে পোস্ট করতে থাকেন। মিউটেশনগুলো ভাইরাস থেকে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল একক বর্ণের পরিবর্তন। যা গবেষকদের অনুমতি দেয় ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ভাইরাসের সংযুক্তি দ্বারা বিস্তৃতি ট্রেক করার এবং সার্স-কোভ-২ কখন মানুষকে সংক্রমিত করতে শুরু করে তাও অনুমানের সুযোগ দেয়।

সার্স-কোভ-২, এইচআইভি ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ এ ধরনের ভাইরাস যা কিনা আরএনএতে তাদের জিনোম এনকোড করে, তাদের প্রবণতা হচ্ছে দ্রুত মিউটেশন করার দিকে, যেন হোস্টের ভেতরে তারা প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। কারণ এনজাইম যে আরএনএ কপি করে তা ত্রুটিপ্রবণ। উদহারণস্বরূপ মানবদেহে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর, এটি ডিলিশন নামে একধরনের মিউটেশন বিকাশ করে, যা এর বিস্তৃতিকে কমিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু সিকোয়েন্স করা ডাটা বলছে, করোনাভাইরাস অন্যান্য আরএনএ ভাইরাসের চেয়ে আরো শ্লথভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। খুব সম্ভবত ‘প্রুফ রিডিং’ এনজাইমের কারণে, যা সম্ভাব্য মারাত্মক অনুলিপিজনিত ভুলকে সংশোধন করে। একটি সাধারণ সার্স-কোভ-২ ভাইরাস প্রতি মাসে জিনোমে কেবল দুটি একক বর্ণের মিউটেশন জড়ো করে। যে পরিবর্তন কিনা ইনফ্লুয়েঞ্জার অর্ধেক এবং এইচআইভির এক-চতুর্থাংশ, বলেছেন মলিকিউলার এপিডেমিওলজিস্ট এমা হডক্রোফট।

অন্যান্য জিনোম ডাটা এ স্থায়িত্বের ওপর জোর দেয়। ৯০ হাজারের বেশি আইসোলেটসকে সিকোয়েন্স করা হয় এবং জনসম্মুখে আনা হয়। বিশেষজ্ঞ লুসি ভ্যান ড্রপ বলেন, পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে সংগ্রহ করা দুটি সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের ২৯ হাজার ৯০৩টি বর্ণের মধ্যে আলাদা হয় গড়ে কেবল ১০টি আরএনএ বর্ণ।

ভাইরাসের মন্থর মিউটেশন রেট সত্ত্বেও গবেষকরা সার্স-কোভ-২ জিনোমে ১২ হাজারের বেশি মিউটেশনের তালিকা করেছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাদের মিউটেশনগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে পারেন।  ভাইরাসের রোগ ছড়ানো এবং রোগের কারণ হিসেবে মিউটেশনের কোনো প্রভাব থাকবে না। কারণ তারা প্রোটিনের আকার বদলাতে পারে না। আবার প্রোটিন পরিবর্তন করে এমন মিউটেশনগুলো ভাইরাসের উন্নতি করার পরিবর্তে ক্ষতি করার চেষ্টা করে। হন্ডক্রফাট বলেন,  কোনো কিছু ঠিক করার চেয়ে ভেঙে ফেলা কঠিন।

অনেক গবেষক সন্দেহ করেন যে যদি মিউটেশন ভাইরাসকে দ্রুত বিস্তৃত হতে সাহায্য করে, এটা সম্ভবত শুরুতেই ঘটে। যখন ভাইরাস প্রাণীর শরীর থেকে মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হয় কিংবা কার্যকরভাবে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে যাওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে। এমন একটা সময়ে যখন গ্রহের প্রত্যেকেই সংবেদনশীল। ফলে আরো ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ার জন্য ভাইরাসের বিবর্তনীয় চাপ সামান্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সম্ভাব্য উপকারী মিউটেশনগুলোও বিকাশ লাভ করতে পারেনি। 

যখন কোরবার ডি৬১৪জি-এর দ্রুত বিস্তৃতি দেখলেন, তিনি ভাবলেন সম্ভবত প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি উপযুক্ত উদাহরণের সন্ধান পেয়েছেন। এ মিউটেশন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্পাইক প্রোটিনে এর অবস্থানগত কারণে, যা কিনা অ্যান্টিবডি নিউট্রোলাইজ করার একটি প্রধান লক্ষ্য, যা ভাইরাসকে আবদ্ধ করে এবং একে অসংক্রামক করে তোলে।

জানুয়ারির শেষে ডি৬১৪জি প্রথম শনাক্ত করা হয় চীন ও জার্মানিতে সংগ্রহ করা ভাইরাসে। বেশির ভাগ বিজ্ঞানী সন্দেহ করেন যে মিউটেশন শুরু হয়েছে চায়নায়। এখনো অবশ্য অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন না যে ডি৬১৪জি-এর উত্থান উল্লেখযোগ্য কিছু কিংবা সবকিছুই মহামারীর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।

নেচার থেকে