৫৭ বছর বয়সী সুসান বেইলি একজন রিটায়ার্ড নার্স। যিনি সব ধরনের ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন এবং প্রতি বছর ফ্লুর শটও নিয়ে থাকেন। তিনি জো বাইডেনের একজন সমর্থকও বটে। পাশাপাশি তিনি সেসব মানুষের একজন যিনি ভ্যাকসিন উপলব্ধ হওয়ার পরও গ্রহণ না করার কথা ভাবছেন।

তিনি বলেন, আমি ভ্যাকসিনবিরোধী নই। আমরা সব ছেলেমেয়েকে সব ধরনের ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন আমি কভিডের ভ্যাকসিন গ্রহণ করব না। আমার স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা আছে। আমি দীর্ঘ সময় ধরে হওয়া গবেষণাগুলোয় ভ্যাকসিনের কী কী ফলাফল রয়েছে তা দেখতে চাই।

বেইলি বলেছেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশ্বাস করেন না। আর সময়টাও তার কাছে বেশ অল্প মনে হচ্ছে। তার এই কথাগুলো যেন বিশ্বব্যাপী বড় একটি অংশের মতো, যাদের মধ্যে অ্যান্টিভ্যাকসিন সম্প্রদায়ের মতো তীব্র বিরোধিতা না থাকলেও করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন গ্রহণ করা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একজন নেইল জনসন বলেছেন, চারটি প্রধান আপত্তি হলো সুরক্ষা, একটি ভ্যাকসিন প্রয়োজন কিনা, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর ওপর অনাস্থা এবং বিজ্ঞানের মাঝে অনিশ্চয়তা অনুভব করা।

এই অবস্থা কতটা বিস্তৃত তা জানতে জনসন বলেছেন, সবাই যেন নিজের পরিবার ও বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞেস করেন উপলব্ধ হওয়ার পর তারা ভ্যাকসিন গ্রহণ করবে কিনা।

তিনি বলেন, আমি খুব অবাক হব যদি আপনি দশজনকে জিজ্ঞেস করেন এবং তারা প্রত্যেকেই কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণে রাজি হয়ে যায়।

কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভ্যাকসিন হচ্ছে সংক্রামক রোগকে থামানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়, যা কিনা প্রতি বছর ৬ মিলিয়ন মৃত্যু রোধ করছে। অনেকগুলো গবেষণা বলছে, এগুলো নিরাপদ। যুক্তরাষ্ট্রের এপিডেমিওলজিস্ট বলছেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারে মহামারী। ল্যানসেট মেডিকেল জার্নাল বলছে, লকডাউন পুরোপুরিভাবে তুলে নেয়ার এটাই একমাত্র উপায়।

এদিকে মে মাসের আরেকটি অনলাইন পুলে দেখা গেছে, অর্ধেক আমেরিকান হয় দ্বিধান্বিত, নয়তো ভ্যাকসিন গ্রহণ করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে। একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে যুক্তরাজ্যের জরিপেও। পোলিংয়েও আবার ভিন্নতা রয়েছে। সিএনএনের একটি পুল দেখাচ্ছে দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান কম খরচে পাওয়া গেলে ভ্যাকসিন গ্রহণ করবে। ক্যাম্পেইন গ্রুপ কনভিন্সের একটি জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটিশ ও মার্কিন উত্তরদাতাদের ৭০ শতাংশ একটি ভ্যাকসিন গ্রহণ করবে।

ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা। যার অর্থ হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণ জনগণকে ইমিউন করা ভাইরাসের সংক্রমণ থামানোর জন্য। একটি ভ্যাকসিন ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে।

এদিকে ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গ বলছে, ইউরোপ ও আমেরিকার ৭১ থেকে ৭৪ শতাংশ জনগণকে ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে হার্ড ইমিউনিটি লাভ করার জন্য।

জনসন বলেন, এটা একটা বড় ইস্যু এবং সম্ভবত পুল যা ইঙ্গিত করছে তার চেয়ে অনেক বড় ইস্যু। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন বিরোধীদের মাঝে সব সময় সন্দেহ রয়েছে কিন্তু সিদ্ধান্তহীন জনগণের মাঝেও যথেষ্ট পরিমাণে সন্দেহ রয়েছে। আমি খুবই উদ্বিগ্ন, আমি মনে করি না জনস্বাস্থ্য এর আগে কখনো এতটা হুমকিতে পড়েছিল। কারণ তখন এমন সোস্যাল মিডিয়া ও অনলাইনের প্রভাব ছিল না।

বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন নিয়ে দ্বিধার বিস্তার

ইউরোপ ও আমেরিকায় ভ্যাকসিন নিয়ে সন্দেহ ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান, যা এখন আরো বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ব্রাজিল, যেখানে ব্রিটিশ, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মগুলো ট্রায়াল চালাচ্ছে, সেখানে চীনের ভ্যাকসিন নিয়ে একটা অংশ বিরোধ করছে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায়ও এ রকম ট্রায়ালের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। জনসন বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এটি নিয়ে ভয় অনেক বেশি।

আপত্তি মোকাবেলা

একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ভ্যাকসিন নিয়ে যে বিষয়টিতে মানুষের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তা হলো এটির বিকাশের গতি। কারণ অনেক ভ্যাকসিন তৈরির জন্য ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। বিশেষজ্ঞদের একজন জেরেমি ওয়ার্ড বলেন, উদ্বেগের স্পষ্ট কারণ রয়েছে; গতির ওপর জোর দেয়া এবং একটি নতুন ভ্যাকসিনের দিকে ছুটে যাওয়া অন্যতম।

তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে ইনস্টিটিউশনের ওপর আস্থা। তার মতে, ফ্রান্সে করোনাভাইরাস বিতর্ক অনেক বেশি রাজনৈতিক।

এদিকে রাশিয়া ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল না করেই। একইভাবে চীনও তৃতীয় ধাপ এড়িয়ে গিয়ে পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন জুনে সেনাবাহিনীর ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। সেক্ষেত্রে রাশিয়ার ভ্যাকসিন অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি প্রত্যাখ্যানের শিকার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে এফডিএ বলছে, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তারা কোনো ধরনের ঘাটতি রেখে এগোবে না। ফ্রান্সের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বলেছে, তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল ছাড়া তারা কোনো ভ্যাকসিন অনুমোদন দেবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. মাইক রায়ান এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, মানুষের ভ্যাকসিন নিয়ে আলাপে আসা উচিত এবং একটি প্রকৃত আলোচনা হতে হবে। এটা একমুখী কোনো রাস্তা না। বিষয়টি নিয়ে সত্যিকারের আলাপ হতে হবে। এরপর মানুষ তার মন তৈরি করবে।

সিএনএন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত