বর্তমান সময়ে করোনাভাইরাস সব বয়সের মানুষের জন্য একটি আতঙ্কের নাম, যদিও বলা হচ্ছে এর মৃত্যুর হার এত বেশি নয়। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে যেতে শুরু করেছে ঠিক মার্চ মাসের অষ্টম দিন থেকে। মার্চ মাসের মধ্যভাগ থেকে শেষ সপ্তাহের মধ্যে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ হোটেল ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, হাজার হাজার মানুষ ফিরে আসে তাদের নিজের গ্রামে। ফলে অনেকেই সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজ অনেকদিন ধরে নিজের এলাকায় লকডাউন হয়ে অনেকটা অবসর জীবনে তারা। অন্যদিকে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে হোটেল ব্যবসায়ীরা, যার মধ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই বেশি ঝুঁকিতে। এখন অবধি অনেক অসহায় রেস্টুরেন্টের শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ হয়তো তাদের দৈনিক জীবিকার জন্য কোনো রাস্তা না পেয়ে বাড়ির সম্পদ, মাঠের জমি এমনকি জলজ সম্পদের দিকে তাকাতে দ্বিধা করছে না। দারিদ্র্যের কষাঘাতে তারা হয়তো অবিরাম খাদ্য আহরণ করে যাচ্ছে প্রাকৃতিক উৎস থেকে, যার মধ্যে রয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও সাগর।

চলনবিল, বৃহৎ স্বাদু পানির এ মৎস্য আধারেই একসময় পাওয়া যেত বিভিন্ন স্বাদু পানির মাছ। এই বিল থেকে ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে সর্বমোট মাছ আহরণ করা হয়েছিল ১২,২১৭ টন, যা কিনা ১৯৮২ সালের উৎপাদিত মাছের অর্ধেক। বছরের পর বছর এই মাছ কমেই যাচ্ছে। যার মূল কারণ হলো সচেতনতার অভাব। করোনার সময়ে যারা কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে আছে তাদের চোখ হয়তো বিলের দিকে। আমরা অনেকেই জানি বর্ষাকালের দিকে সাধারণত বেশির ভাগ মাছের প্রজননকাল। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মা মাছ উপযুক্ত স্থানে গিয়ে ডিম দিতে থাকে। ঠিক সে মুহূর্তেই হয়তো কর্মহীন বিলবাসীর অতর্কিত কুচের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতে পারে মা মাছের বুক।

বঙ্গোপসাগর, যেখানে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে এক ব্যক্তির মোবাইলে ধারণকৃত কিছু ডলফিনের নাচানাচি আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। তখন মনে হয়েছিল এই তো আমরা ফিরে পেলাম আমাদের বিলুপ্তপ্রায় জলজ প্রাণিকুল। কিন্তু হতভাগা ডলফিনের দল আমাদের আপন করে নিলেও আমরা কি তাদের আপন করে নিতে পেরেছি? পরবর্তী দুই-এক দিনের মধ্যে তীর থেকে উদ্ধার হয় মৃত ডলফিন। মাথায় শক্ত আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায়। মাছ ধরা জেলেদের নৌকায় আটকা পড়েছিল ডলফিনগুলো। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের ওপর আমাদের এরূপ নির্মম আচরণ দেখানো উচিত কি?

এখন আসি বিশ্বের অন্য সব উন্নত রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ায় তারা প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে শুধু আহরণের দিকে নজর দেয় না, তারা প্রাকৃতিক সম্পদ বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগও করে থাকে। আপনি জানলে অবাক হবেন যে তারা সাগরের মাঝে কৃত্রিম কোরাল তৈরি করে রাখে, যা মা মাছের আবাসের জন্য উপযোগী। সাগরের তলদেশে কোরিয়ানরা ঘাস লাগায়, যাতে করে পরিবেশ ঠিক থাকে জলজ প্রাণীদের জন্য। গবেষণার মাধ্যমে তারা জলজ জীবের সংখ্যা অনুমান করে অভ্যন্তরীণ জলজ সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করে। সঙ্গে রয়েছে মা মাছ ও পোনা মাছ নিধন রোধে বিভিন্ন নীতির প্রয়োগ, যা তাদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকে। বিশ্বে মৎস্য আহরণের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রজাতির মাছ বা জলজ প্রাণী আহরণ আরেকটি বড় সমস্যা। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রজাতি আহরণ হলো কাঙ্ক্ষিত মাছের জালে উঠে আসা অন্যান্য প্রজাতির মাছ অথবা জলজ প্রাণী। অনেক দেশই এখন মাছ ধরার জালের পৃষ্ঠদেশে নির্গমন রাস্তা ব্যবহার করে, যাতে অন্যান্য অপ্রত্যাশিত প্রজাতির প্রাণী নিধন থেকে বিরত থাকা যায়। সামুদ্রিক কচ্ছপ ও ডলফিন হলো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই বহির্বিশ্বে অনেক জেলে সম্প্রদায় মাছের জালে কচ্ছপ নির্গমন যন্ত্র ব্যবহার করার মাধ্যমে সামুদ্রিক কচ্ছপকে জাল থেকে পালাতে সাহায্য করে।

বিশ্বে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের বিরাট সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশী মাছ বিলুপ্তির দিকে গেলে আমাদের মৎস্য সম্পদের যে ঐতিহ্য বা প্রাচুর্য আছে তা হারিয়ে ফেলব দ্রুতই। এই মাছের প্রাচুর্য টিকিয়ে রাখতে শুধু সামাজিক সচেতনতাই যথেষ্ট বলে অনেক গবেষক মনে করেন। কারণ মাছের জীবনচক্রের একটা বড় অংশ হলো প্রজননকাল। স্বাদু ও নোনা পানিতে প্রজনন ঋতুতে মা মাছ ও পোনা মাছ শিকার বন্ধ রেখে কয়েক মাস পর থেকে বেড়ে ওঠা মাছ ধরা শুরু করলে একদিকে আমরা প্রচুর মাছ পাব, অন্যদিকে গ্রামের কর্মহীন হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। আগামীতে আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। আজকে যারা কর্মহীন মানুষ আছে তাদের উদ্বুদ্ধ করে এ জলাধারগুলোকে খাঁচায় মাছ চাষের আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। সেক্ষেত্রে এই স্বাদু পানি আর নোনা পানিতে আমরা দেশী বা বিদেশী প্রজাতির মাছের চাষ করতে পারি অনায়াসে। পাশাপাশি যুবক ভাইদের আমরা কাজে লাগাতে পারি মাছের বাসস্থানের উন্নয়নে। স্থানীয় যুবকদের নিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনের মাধ্যমে বিলের বিভিন্ন জায়গায় গাছের ডাল, বাঁশ বা অন্যান্য গাছের অংশ দিয়ে মাছের অভয়ারণ্য তৈরি করে তাদের ডিম দেয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি। যাতে পরবর্তী সময়ে আমরা বিনা বিনিয়োগে একটা বৃহৎ উৎপাদন পেতে পারি। আমাদের দরকার শুধু একটু সচেতনতা আর ধৈর্য। তাহলেই সম্পদ রক্ষা হবে আর কর্মসংস্থানও নিশ্চিত হবে।

প্রকৃতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই। চেষ্টা ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দেশবাসী ফিরে পাবে সেই হারিয়ে ফেলা প্রাকৃতিক সম্পদের আধারগুলোকে। আমার-আপনার সচেতনতা, সুচিন্তা ও কঠোর পরিশ্রমই বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে পারে উন্নতির উচ্চশিখরে। আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে যে ‘ব্যাস্ততাই সুস্থতা’।

 

মো. হাশমী সাকিব: শিক্ষক, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পিএইচডি স্কলার, কোরিয়া মেরিটাইম অ্যান্ড ওসান ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া

সৌরভ মাহমুদ: শিক্ষার্থী, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ