পৃথিবী এখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে মনোযোগ দিতে গিয়ে জীবনকে হুমকিতে ফেলা অন্যান্য রোগের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলেছে এবং সেগুলো মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়া থেকেও।

এসব রোগের সম্ভাব্য ফলাফল মৃত্যুও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ভীত যে সামনের দিনগুলোতে অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হবে কেবল করোনাভাইরাসের কারণে না, বরং অন্যান্য রোগের কারণে। যা কিনা আসলে নিরাময়যোগ্য। এসব ক্ষেত্রে সরকার ও এনজিওগুলো যে অগ্রগতি দেখিয়েছিল তাও হারিয়ে যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্যে দ্য চ্যারিটি ক্যানসার রিসার্চ ইউকে হিসাব করে দেখেছে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ক্যানসারের উপসর্গ নিয়ে আসা ২ হাজার ৩০০ লোককে পরীক্ষা করা হতো, যা এখন হচ্ছে না। একই সময়ে ২ লাখ নারী প্রতি সপ্তাহে স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারের প্রতিরোধমূলক চেকআপ করাতেন, তাও এখন বন্ধ। ফলে যে ক্যানসার আগে থেকে শনাক্ত করে চিকিৎসা করানো যেত, তা এখন ঝুঁকি তৈরি করছে।

ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন বলছে, হাসপাতালগুলোতে মার্চে হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ নিয়ে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীর সংখ্যা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এসবের ফলাফল কী হবে তা জানা কঠিন। কিন্তু ডাক্তাররা বলছে, ইউরোপের বড় একটি অংশে গৌণ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে।

প্রাথমিক খুনি: যক্ষ্মা

গরিব দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক সংক্রামক রোগের সঙ্গে অনেক বছর ধরে লড়াই করছে। যেমন যক্ষ্মা, এইচআইভি অথবা হাম। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ ম্যালেরিয়া আরেকটি উদাহরণ। অনেক দেশে এসব রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। এখন সবার দৃষ্টি করোনাভাইরাসের ওপর, আর এ সুযোগ নিয়ে সেই রোগগুলো ক্রমশ বাড়ছে। যদিও এর মাঝে এক ধরনের সাদৃশ্য আছে।

প্রতি বছর আনুমানিক ১০ মিলিয়ন লোক যক্ষ্মার মতো শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে এবং ১.৫ মিলিয়ন লোক এতে মৃত্যুবরণ করে। কেবল ভারতেই প্রতিদিন হাজারের ওপর লোক এতে আক্রান্ত হচ্ছে, যা কিনা যক্ষ্মাকে অন্যান্য সংক্রামক রোগের চেয়ে আরো বেশি মারণঘাতী করে তুলেছে।

স্টপ টিবি পার্টনারশিপের এক গবেষণা বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে টিবিতে অতিরিক্ত ৬.৩ মিলিয়ন লোক আক্রান্ত ও ১.৪ মিলিয়ন লোক মৃত্যুবরণ করতে পারে।

টিবি পার্টনারশিপের সঙ্গে কাজ করা রোমানিয়ান চিকিৎসক লোসিকা দিটিউ বলছেন, যক্ষ্মার সঙ্গে লড়াই করা খুব কঠিন। আপনি বাধা দেয়ার আগেই এটি মারাত্মকভাবে ফিরে আসে। তবে টিবি পার্টনারশিপের প্রাথমিকভাবে প্রত্যাশা ছিল ২০৩০ সালের মাঝে যক্ষ্মা দূর হয়ে যাবে।

কিন্তু এখন লক্ষ্য অনেক দূরে চলে গেছে। দিটিউ বলেন, আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না, যদি বর্তমান সময় থেকে তিন গুণ বেশি অর্থনৈতিক সহায়তা লাভ না করি।

ভুল জায়গায় উদ্বেগ?

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত তিন লাখের ওপর মানুষ মারা গেছে। তবুও কেবল যক্ষ্মায় অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন লোকের মৃত্যু হতে পারে। ম্যাকগিল গ্লোবাল হেলথ প্রোগ্রামের প্রধান মাধুকর পাই অবাক হয়েছেন নতুন এ ভাইরাসটি যক্ষ্মার তুলনায় কত বেশি মনোযোগ পেয়েছে তা দেখে।

ভারতে করোনাভাইরাসের মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা নেয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে অনেক বেসরকারি হাসপাতালও এখন বন্ধ হয়ে আছে। গণপরিবহনও সে অর্থে চলছে না। যে কারণে গ্রাম অঞ্চলের মানুষেরও চিকিৎসা নিতে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার অনেকে ডাক্তারের কাছে গেলেও চিকিৎসা পাচ্ছেন না। কারণ কভিড-১৯-এর লক্ষণ ও যক্ষ্মার লক্ষণও অনেকটা একই রকম। ফলে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভয়ের কারণে যক্ষ্মা রোগীরাও সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না।

ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুদের এক ডজনের বেশি ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম চালু আছে। যেখানে পোলিও, হাম ও ডিপথেরিয়ার টিকা দেয়া হয়। সে সঙ্গে যক্ষ্মার জন্য বিসিজি টিকাও দেয়া হয়। কিন্তু কেবল মার্চেই এক লাখ শিশু এই টিকা নিতে পারেনি। এটি  আরো বেশি ভয়ংকর, কারণ যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী কভিড-১৯-এর চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিতে আছে।

ভ্যাকসিনের স্বল্পতা

দ্য গাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স গরিব দেশগুলোতে ভ্যাকসিন প্রোগ্রামে অর্থায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংগঠন। যা কিনা এখন প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সংগ্রাম করছে। এটি করোনাভাইরাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আনুমানিক ১৩.৫ মিলিয়ন লোক এখন গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিনেশনের অভাবে রয়েছে। গাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী সেথ বার্কলে বলেছেন, কভিড-১৯-এর কারণে অন্যান্য বৈশ্বিক মারণঘাতী রোগ পোলিও অথবা হামের পুনরুত্থান হওয়া উচিত নয়।

এপ্রিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১১৭ মিলিয়ন শিশু বিশ্বব্যাপী হামের টিকা দিতে পারছে না। অনেক দেশ তাদের ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন স্থগিত করেছে এবং মেডিকেল কর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে নতুন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য। এছাড়া ভ্যাকসিন সরবরাহেও রয়েছে ঘাটতি। বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানে সম্ভাব্য মারণঘাতী রোগের বিচ্ছিন্ন প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদ মুশিক মোকাবর বলেছেন, যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে অনেক সংক্রামক রোগকে ফিরে আসতে দেখব, যা কিনা কভিড-১৯-এর চেয়ে ভয়ংকর হবে।

সাপ্লাই চেইনে বাধা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০১৮ সালে বিশ্বে ২২৮ মিলিয়ন মানুষ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। যার ৯৩ শতাংশ হচ্ছে আফ্রিকায় এবং বেশির ভাগই ছিল শিশু। ২০২০ সালে এ পরিসংখ্যান বৃদ্ধি পাওয়ার বেশ সম্ভাবনা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেক দেশে সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে ম্যালেরিয়াবিরোধী সরঞ্জামসমূহ যেমন মশারি, র্যাপিড টেস্ট এবং ওষুধসামগ্রী যেখানে প্রয়োজন সেখানে যেতে পারেনি। এটি হয়েছে মূলত আমদানি-রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং বিমান চলাচল হ্রাস পাওয়ার কারণে। পাশাপাশি আফ্রিকার অন্যান্য মহামারীও ভালো অভিজ্ঞতার কথা বলছে না। ইবোলার উত্থানের সময় ২০১৪-১৬ সালে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। যা কিনা ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তবে কভিড-১৯-এর মহামারী আরো নাটকীয় হবে বলে মনে হচ্ছে, যা কিনা গোটা বিশ্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ডার স্পিগেল