তাইওয়ানের মানুষ দ্রুত সমস্যা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে। শত বছরের প্রতিকূলতা আমাদের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা, মানিয়ে নেয়া ও কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে শিখিয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা একসঙ্গে কঠিন সময় মোকাবেলা করার উপায় খুঁজে পেয়েছি। এজন্য কভিড-১৯ মহামারী আমাদের কাছে আলাদা কিছু নয়। ভাইরাসটি সংক্রামক প্রকৃতির এবং এটার উৎস খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও আমরা আমাদের দেশে বড় আকারের বিস্তার প্রতিরোধ করেছি। ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের এখানে ৪০০ জনেরও কম মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন।
এ সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারি, বেসরকারি খাত এবং সমাজের যৌথ প্রচেষ্টার ফল। ২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবে কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানির বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা আমাদের সরকার ও জনগণকে প্রথম থেকেই যথেষ্ট সতর্ক হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
গত ডিসেম্বরে চীনে যখন নতুন সংক্রামক রোগে অসুস্থতার ঘটনা প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন থেকেই আমরা উহান থেকে আগত যাত্রীদের ওপর নজরদারি শুরু করি। জানুয়ারিতেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিচালনা করতে সেন্ট্রাল এপিডেমিক কমান্ড সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। তখন থেকেই আমরা ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করেছি এবং উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ভ্রমণকারীদের কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করেছি।
২১ জানুয়ারি তাইওয়ানে প্রথম নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর সম্ভাব্য কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হওয়ার আগেই আক্রান্তদের পৃথক্করণে প্রত্যেক রোগীর ভ্রমণ ও যোগাযোগের ইতিহাস ট্র্যাক করতে কঠোর তদন্ত শুরু করি। এছাড়া কভিড-১৯ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চেন শিহ-চুংয়ের নেতৃত্বে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পেশাদাররা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। পাশাপাশি আমাদের সচেতন নাগরিকরা তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন। বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও অ্যাপার্টমেন্ট সম্প্রদায়গুলো নিজ নিজ উদ্যোগে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ এবং জীবাণুমুক্তকরণের মতো পদক্ষেপ শুরু করে, যা সরকারি প্রচেষ্টাগুলোকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে।
আতঙ্কিত হয়ে জনগণের ব্যাপক পণ্যদ্রব্য কেনাকাটা প্রতিরোধে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই সরকার বাজারগুলোতে পর্যবেক্ষণ করে আসছে এবং মেডিকেল-গ্রেড মাস্ক উৎপাদন ও বিতরণ করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহকারী বেসরকারি সংস্থাগুলো সার্জিক্যাল মাস্কসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণগুলোর উৎপাদন বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ফার্মেসি ও বিশ্বস্ত দোকানগুলোর সহযোগিতায় মাস্ক বিতরণের জন্য আমরা একটি পদ্ধতিও তৈরি করেছিলাম। এজন্য এখানে স্বাস্থ্যকর্মী ও সাধারণ মানুষদের ব্যবহার উপযোগী মাস্কগুলো সহজলোভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যের। এটা সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টার একটি অংশীদারিত্ব, যা আমরা ‘টিম তাইওয়ান’
হিসেবে বিবেচনা করছি। এর ফলেই আমরা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে চিকিৎসা উপকরণগুলো অনুদান দিতে পারছি।
বর্তমানে তাইওয়ানের আছে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, শক্তিশালী গবেষণা ক্ষমতা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তথ্যের আদান-প্রদান; আমরা গবেষণার তথ্য আমাদের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে ভাগাভাগি করছি। প্রকৃতপক্ষে তাইওয়ান কার্যকরভাবে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ হলো একটি মানবিক বিপর্যয়। এটা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে সব দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদিও তাইওয়ানকে ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘ থেকে অন্যায়ভাবে বাদ দেয়া হয়েছে, তবুও আমরা আমাদের উৎপাদন, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক এবং সক্ষম রয়েছি।
যেকোনো বৈশ্বিক সংকট আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কগুলোকে পরীক্ষার মুখে ফেলে, পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার হুমকি দেয়। এজন্য আগের চেয়ে আমাদের প্রতিটা গ্লোবাল নেটওয়ার্ককে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অবশ্যই আমাদের ভেদাভেদগুলো দূরে সরিয়ে মানবজাতির পক্ষে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সারা বিশ্বের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
কোনো প্রতিকূলতাই তাইওয়ানের কাছে অপরিচিত নয় এবং সবচেয়ে কঠিন বাধা অতিক্রম করতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সাগ্রহ সম্মতি থেকেই আমাদের দ্রুত সমস্যা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা এসেছে। সর্বোপরি আমি আশা করি, তাইওয়ান বিশ্বের সঙ্গে সবকিছু ভাগাভাগি করতে পারে; একসঙ্গে চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার মানবিক ক্ষমতা অসীম। তাইওয়ান অন্যদের সহায়তা করতে পারে।
টাইম ম্যাগাজিন





