বৈশ্বিক অর্থনীতির হতাশাজনক পরিস্থিতি যতই বাড়ছে নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিও সামনে আসতে শুরু করেছে। মে মাসে এ বছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ৩ শতাংশ সংকোচনের ধারণা দিয়েছিল আইএমএফ। কিন্তু তার পর থেকে অবস্থা আরো খারাপ হতে শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস ৫.২ শতাংশ সংকোচনের কথা বলছে। প্রত্যাশিত ভি আকারের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ক্রমাগত বদলে যেতে যেতে এখন ইউ আকার দেখাচ্ছে।

এ অবস্থায় ফোর্বস এশিয়া প্যানেল অব ইকোনমিক কমেন্টেটরের পাঁচ সদস্য কভিড-১৯ দ্বারা কীভাবে বিশ্ব পরিবর্তিত হতে পারে, সে সম্পর্কে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে উদীয়মান বাজারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা, এশিয়ার সফল কৌশলগত প্রতিক্রিয়া, চীনকেন্দ্রিক শক্তিশালী সাপ্লাই চেইনের উত্থান, জাপানে সরকারের হস্তক্ষেপ এবং হংকংয়ের স্থায়ী কৌশলগত গুরুত্ব উঠে এসেছে।

সুমান বেরি: কভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে কি বৃহৎ উদীয়মান বাজারের সমাপ্তি ঘটবে?

এই শতাব্দীর প্রথম দশকে চীনের বিস্ফোরক বিকাশের পথ ধরে অন্যান্য বড় মার্কেট এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ২০০১ সালে ব্রিকস উল্লেখ করে, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ  নির্ধারিত হবে চারটি মধ্যম আয়ের দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের (পরে দক্ষিণ আফ্রিকাকেও যুক্ত করা হয়) মাধ্যমে। এই প্রত্যাশাগুলো ২০০৮ সালে সংকটের আগ পর্যন্ত পূরণ হয়েছিল। এরপর দশকের দ্বিতীয় ভাগে চীন, ভারত, রাশিয়া ও প্রধান লাতিন দেশগুলো অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরও হোঁচট খেয়েছিল। তবে লক্ষণীয়ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। 

এখন কভিড-১৯ তাদের অবস্থাকে আরো মারাত্মক করে তুলেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের করোনাভাইরাস ট্র্যাকার বলছে, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা এখনো তাদের নতুন আক্রান্তের সংখ্যাকে কমিয়ে আনতে পারেনি। এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে যতক্ষণ পর্যন্ত বিস্তৃতভাবে মহামারী নিয়ন্ত্রণে না আসে, (এমনকি লকডাউন তুলে দেয়ার পরও), ততক্ষণ এসব অর্থনীতি ঘরোয়া সরবরাহের চেইনগুলো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। এখান থেকে আমরা কী সিদ্ধান্ত টানতে পারি? প্রথমত, পুনরুদ্ধারের নীতি অগ্রসরমান অর্থনীতি দ্বারা চালিত হবে। দ্বিতীয়ত, সব বৃহত্তর গণতন্ত্র অভ্যন্তরীণ খাতে বেশি নজর দেবে, এমনকি আরো বেশি বৈশ্বিক যুক্ততার ওপর জোর দেয়া হলেও। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সুযোগ-সুবিধা সর্বজনীন সম্পর্কের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে, এটি হতে পারে বৈষম্যমূলক ও অদক্ষ। তার পরও আমাদের মনে রাখতে হবে ইউরোপ ও জাপান ১৯৫০ এবং পূর্ব এশিয়া ১৯৮০-এর দশকের পর পুনর্গঠিত হয়েছিল এমন শাসন ব্যবস্থার অধীনে যা এখন নেই। কিন্তু তারা তা করেছিল ঘরে ও বাইরে কিছু বিষয় ঠিকভাবে করার মাধ্যমে। কভিড-১৯-এর সংকটের উচিত উদীয়মান বড় মার্কেটকে চালিত করা, অবশ্যই পৃথকভাবে এবং আদর্শগতভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে। পাশাপাশি চিন্তা করতে হবে কীভাবে কম বন্ধুত্বপূর্ণ বিশ্বে যুক্ত থাকা যায় এবং সফল হওয়া যায়। যদিও উদীয়মান বাজার কেবল আংশিকভাবে এটি করতে সক্ষম হলেও সব এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

মানু ভাস্করণ: কভিড-১৯ পরবর্তী এশিয়ার সম্ভাবনা?

কভিড-১৯ পরবর্তী দুনিয়ায় বেদনাদায়ক অর্থনৈতিক সংকোচন ও বেকারত্বের সমস্যার কারণে বেশ হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে এশিয়া আগেও ছিল। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালে এশিয়ার অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে মনে হচ্ছিল সবকিছু যেন ভেঙে পড়েছে। কিন্তু বাজেভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এশিয়ার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবং কয়েক বছরের মধ্যে ভালোভাবে বিকশিত হয়েছিল। এমন নয় যে এশিয়া বাজে অবস্থায় পড়বে না। তবে কেবল সঠিক কৌশলে সেসব চ্যালেঞ্জ কাটানো যাবে এবং লাভবান হওয়ার মতো নতুন সুযোগও সামনে আসবে।

প্রথমত, চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর দৃষ্টি দেয়া যাক। সংকটের মান পরিবার এবং করপোরেশনগুলোকে আচরণকে এমনভাবে সমন্বিত করবে, যা সম্ভবত বৈশ্বিক বিকাশকে কমিয়ে দেবে। যেমন উদাহরণস্বরূপ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পরিবার তাদের সঞ্চয়কে বাড়িয়ে দিতে পারে, ফলে কমে যেতে পারে ব্যয়। বৈশ্বিক সংস্থাগুলো তাদের সাপ্লাই চেইনকে পুনর্গঠিত করতে পারে। এমনকি কেউ কেউ এশিয়ায় তাদের উৎপাদন ঘাঁটিকে পিছিয়ে নিতে পারে। এছাড়া সরকার উচ্চঋণ নিয়ে স্বাস্থ্য খাত এবং সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করতে পারে, ফলে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ব্যাহত হতে পারে এবং কর বেড়ে যেতে পারে। কোনো কোনো সরকার বাণিজ্য সুরক্ষার লোভে ডুবে থাকতে পারে, যা সবার ক্ষতির কারণ হতে পারে।

অবশ্য এ দৃশ্যের আরেকটি প্রতিশ্রুতিশীল দিকও রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে এশিয়ার নীতিনির্ধারকরা এই বিপজ্জনক দিকগুলোর প্রশংসা করেন এবং তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাপ্লাই সাইডের সংস্কার কাজকে বাড়িয়ে দেন। চীন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে, এমন প্রধান উদ্যোগগুলো এগিয়ে নিয়েছে। যেখানে রয়েছে হুকো সিস্টেম, যা কিনা শ্রম ও আবাসন বাজারকে উৎসাহিত করবে। সে সঙ্গে অগ্রসরমান প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে, যা পাশ্চাত্য নির্ভরতাও কমিয়ে দেবে। মেগা-আরবান অঞ্চল তৈরি করা এবং অতি উচ্চ ভোল্টেজ গ্রিড এবং সংযোগে ব্যয় করে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা। চীনের এ অগ্রগতি এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলকেও সুবিধা তৈরি করে দেবে।

ফান গাং: কীভাবে কভিড-১৯-এর পর চীনকেন্দ্রিক বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন নতুন আকার পাবে?

সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, কভিড-১৯ ব্যবসায়ীদের চীনকেন্দ্রিক সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরতাকে দ্বিতীয়ভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। সাপ্লাই বৈচিত্র্যের এই ইস্যুতে বৈদেশিক সাপ্লাইয়ের ঝুঁকিও যুক্ত হয়। এটি কভিড-১৯-উত্তর বিশ্বে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। কোনো সন্দেহ নেই যে কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে চীনকেন্দ্রিক গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনকে বেশকিছু সমঝোতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে চীনকেন্দ্রিক গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন নতুন করে আকারপ্রাপ্ত হবে? এটা কি কেবল চীন থেকে নিয়ে অন্য কোথাও স্থাপন করার ব্যাপার? বিষয়টা এত সহজ না। এভাবে সরিয়ে নেয়ার বিষয়টা বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে। বিপরীতে যা করা যেতে পারে তা হলো ‘চীন+১’ সূত্র ধরে এগোনো যেতে পারে। যেখানে পরবর্তী বিনিয়োগ চীনের বাইরে অন্য কোথাও করা যেতে পারে। ফলে চীনের একটি বিকল্পও তৈরি হবে। ফলে ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ও একটা দীর্ঘমেয়াদি রূপ পাবে।

ফোর্বস