নভেল করোনাভাইরাস মহামারী আমাদের জীবনে বড় আকারের কিছু সমস্যা তৈরির পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নও সামনে এনেছে। যেসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। মানুষই হচ্ছে একমাত্র প্রজাতি যারা কিনা নিজের ‘ইচ্ছার স্বাধীনতা’র ওপর ভিত্তি করে পছন্দ করতে পারে। এটা তারা করতে পারে কারণ ও যৌক্তিকতার ভিত্তিতে। কিন্তু যখন আমরা নৈতিকতার দৃষ্টিতে দেখি তখন অনেক সময় যা পছন্দ হিসেবে দেখা যায় তা কেবল পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নৈতিক পছন্দগুলো আমাদের কী করা উচিত সে সম্পর্কে কম এবং কী করতে হবে সে সম্পর্কে বেশি বলে। তাহলে আমাদের পছন্দ কতটা নৈতিক? কী তাদের নৈতিক করে তোলে? অন্য পছন্দগুলোও কি সমানভাবে নৈতিক?
এ প্রশ্নগুলো সাম্প্রতিক মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে তিনটি
সমালোচনামূলক নৈতিক মাত্রার ভিত্তিতে খুঁজে বের করতে হবে। ক. বিধিনিষেধের অনুপাত, খ. স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের অগ্রাধিকার গ. প্রয়োজনীয় কর্মীদের পেশাদারি বাধ্যবাধকতা।
বিধিনিষেধের অনুপাত
সংক্রামক রোগের ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সংক্রমণের যে চেইন সেটি ভেঙে দেয়া প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী এ উপায়েই প্রাথমিকভাবে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কিছু নির্দিষ্ট বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যেমন আইসোলেশনে থাকা, সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে চলা এবং লকডাউনে থাকা। প্রাথমিকভাবে সাধারণ মঙ্গলের উদ্দেশ্যে আমরা চলাফেরা এবং সামাজিক যোগাযোগে নিজেদের ব্যক্তি অধিকার উৎসর্গ করার বিষয়টি মেনে নিই। এটা আমরা করি মূলত জনস্বাস্থ্য ও সুরক্ষার খাতিরে। এই বিধিনিষেধ তখনই যুক্তিযুক্ত, বৈধ ও গ্রহণযোগ্য হয় যখন তা সামাগ্রিকভাবে সবার বৃহত্তর সুবিধার ক্ষেত্রে সমানুপাতিক হয়।
কিন্তু কোনো সম্প্রদায়ের একটি অংশ যখন এই বিধিনিষেধের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে তখন কী হয়? বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে লকডাউনের বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে এবং অর্থনীতি খুলে দেয়ার জন্য বেশ প্রতিবাদ হয়েছে। এমন না যে এই প্রতিবাদকারীরা অযুক্তি বা বিভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন। লকডাউন তুলে দেয়ার যে ঝুঁকি সে সম্পর্কে তারা বেশ ভালোভাবেই সচেতন। কিন্তু এর পরও তারা নিজেদের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিতে চায়, কারণ তাদের কাছে সাধারণ মঙ্গলের চেয়ে ব্যক্তি স্বাধীনতার মূল্য বেশি। তারা নৈতিকভাবে এটাই পছন্দ করেছে।
এছাড়া নিশ্চিতভাবেই অনেকে আছে যাদের পর্যাপ্ত অর্থ জমা আছে, খাবারের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে এবং স্থিতিশীল একটি চাকরিও অপেক্ষায় আছে। এ ধরনের লোকের জন্য লকডাউন কোনো সমস্যা তৈরি করে না। এখন যদি তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নেয়া হয় এবং তারা যদি তাদের চাকরি হারায় তবে এ সাধারণ মঙ্গলের ব্যাপারে তারা কি সমানভাবে আগ্রহী হবে? অবশ্যই না। একইভাবে আমরা ভুলে যাই একই লকডাউন অভিবাসী ও দিনমজুরদের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে কতটা কঠিন অবস্থা তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের অগ্রাধিকার
সাধারণ পরিস্থিতিতে আমরা আশা করতে পারি যে হাসপাতালগুলো সাম্য ও ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করবে। যেমন কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই সব রোগী চিকিৎসা পাবে এবং যাদের অবস্থা অতিরিক্ত দুর্বল তারাই কেবল অগ্রাধিকার পাবে। এখন মহামারীকে সামনে রেখে হাসপাতাল সরঞ্জামে অত্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অভাব দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর সেরে ওঠার চেয়ে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বেশি। এখন ডাক্তাররা কাদের আগে দেখবে?
সাম্যের যে ধারণা তা বলছে প্রাকৃতিকভাবে অতিরিক্ত অসুস্থ রোগীরাই স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বেশির ভাগ আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধ অথবা আরো অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। এখন আমরা কি এই বিতর্ক তুলতে পারি যে তরুণ রোগী যাদের কিনা বেঁচে থাকার বেশি সম্ভাবনা রয়েছে এবং যাদের সমানে অনেক বছর পড়ে আছে তাদেরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত? এটা হয়তো যুক্তিসম্মত মনে হচ্ছে কিন্তু একজনের জীবনের চেয়ে অন্যের জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাম্যের নীতিকে আগে থেকেই নির্ধারণ করে নিচ্ছি না?
এখন সমতার নীতিকে সমুন্নত রাখতে সমাজের যেকোনো স্তরের মানুষ অন্য যে কারো মতো একই রকম চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যোগ্য। ধরুন একটি পরিস্থিতি যেখানে ডাক্তার রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে যেকোনো একজনকে বাঁচাতে পারবেন। এখন কাকে বাঁচানো উচিত? এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হারানো সমাজের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। এখন আমরা যদি তাকে বাঁচানোর কথা বলি তবে সেটি কি একজনের জীবনকে অন্যজনের চেয়ে নৈতিকভাবে মূল্যবান করে তোলে?
পেশাদারি বাধ্যবাধকতা
অনেক ডাক্তার ও নার্স নিজেদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে রোগীর সেবা করে যাচ্ছেন। যার ফলে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেকে মারাও যাচ্ছেন। সেজন্য তারা বেশ প্রশংসিতও হচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটি করতে তারা নৈতিকভাবে বাধ্য কিনা? তবে এটা ধরে নেয়া হয় যে তারা বাধ্য। কারণ তারা শপথ নিয়েছেন। অনেকেই বলতে পারেন এ ধরনের পরিস্থিতিতে কাজ করা তাদের দায়িত্ব এবং এই চাকরিটাই হচ্ছে ঝুঁকি নেয়ার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কাজটি করছেন এটি করা সঠিক সেজন্য, নাকি না করতে চাইলে সামাজিকভাবে সম্মানহানির আশঙ্কা আছে সেজন্য? দ্বিতীয় কারণ হলে তাদের বীরত্ব কি কমে যাবে? আবার যারা স্বাস্থ্যসেবার বাইরে জরুরি কাজে নিয়োজিত। যারা কেবল জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে তাদের বীরত্বও কি কম হবে?
এসব প্রশ্নের নিশ্চিত কোনো উত্তর পাওয়া কঠিন। আসলে সঠিক পছন্দ বলে কিছু নেই, যা থাকতে হবে তা হলো সঠিক উদ্দেশ্য।
আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে ভাষান্তরিত





