যদিও কাশি ও জ্বর কভিড-১৯-এর সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত উপসর্গ, কিন্তু গত মে মাসে গবেষকরা একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেন যেখানে তারা বলেন, ঘ্রাণ ও স্বাদ হারানো আরো ভালোভাবে এই ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম যে কেউ করোনা পজিটিভ কিনা। এই অন্তর্দৃষ্টি এসেছে লাখো ব্যক্তির শেয়ার করা ডাটা থেকে, যারা ফোনের অ্যাপে লগ করে নির্দিষ্ট দিনে কোন উপসর্গগুলো দেখা গেছে তা উল্লেখ করেছে।

কভিডের উপসর্গ ট্র্যাকার অ্যাপের এখন প্রায় চার মিলিয়ন ব্যবহারকারী আছে। গবেষকরা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মাঝে কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের অনুসন্ধান এবং রোগের ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো নির্ণয় করার লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণে ডাটা সংগ্রহ করছেন।

ডাক্তার ও এপিডেমিওলজিস্ট অ্যান্ড্রু চান বলেন, আমাদের দলই শুরুর দিকে স্বাদ ও ঘ্রাণ হারানোর গুরুত্ব নিয়ে ভবিষ্যৎ করে। আমরা কভিড উপসর্গ গবেষণা অ্যাপ তৈরি করেছি জনসংখ্যার বিরাট অংশের ডাটা দ্রুত সংগ্রহের জন্য। এছাড়া দ্রুত উন্মোচিত হতে থাকা মহামারীর রিয়েল-টাইম ডাটা সংগ্রহও আমাদের লক্ষ্য। এই অ্যাপ বিজ্ঞানীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের যে ঝুঁকি তা বোঝার পাশাপাশি স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের মতো রোগগুলোর প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে।

চান বলেন, ডাটা কোনো গবেষকের কাছে সহজলভ্য নয়। কিন্তু দলটি যারা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং অনুদৈর্ঘ্য গবেষণা পরিচালনা করছে তাদের সঙ্গে একাধিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। এছাড়া তদন্তকারীদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়তে আগ্রহী যারা কভিডের প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।

তারা কেবল কভিড সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ডাটা জড়ো করার কাজ করছে না। মহামারী ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গবেষকরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে বিশ্লেষণ করা  যায় এমন বড় আকারের ডাটাসেট সংগ্রহ করছেন। যেখানে কিছু গ্রুপ যেমন উপসর্গ ট্র্যাকার অ্যাপের পেছনে যারা আছে, তারা জনগণের সহায়তায় তালিকাভুক্তির কাজ করছে এবং অন্যরা নির্ভর করছে হাসপাতালে হওয়া গবেষণাগুলোর সহযোগিতার ওপর।

ডাটাসেটগুলো অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করতে শুরু করেছে, যা সরবরাহকারীদের সার্স-কোভ-২-এর সংক্রমণ ও পরবর্তী সময়ে পোস্ট কভিড সিনড্রোমগুলোর চিকিৎসা করতে সহায়তা করে। গবেষণায় জড়িতরা বলেছেন, তারা আশা করছেন তাদের সাফল্য চিকিৎসা গবেষণায় নতুন যুগের সূচনা করবে।

হেলথ ইনফরমেটিক গবেষক ক্রিস ছুটে বলেন, ক্লিনিক্যাল সায়েন্স যেভাবে কাজ করে আমরা সেখানে রূপান্তর আনতে পারি। ডাটা ভাণ্ডার এবং ডাটা সায়েন্সের সম্পদ সেভাবে পেতে পারি যেভাবে পাওয়া আগে সম্ভব ছিল না। আমরা আশা করি, এই সুযোগটি যা তুলে ধরে তা হলো যদি আমরা দায়িত্বশীল উপায়ে ডাটা অর্জন করি তবে তাতে বড় কোনো ক্ষতি হবে না।  

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা হলো ন্যাশনাল কভিড কোহোর্ট কোলাবোরাটিভ (এন৩সি) ডাটাবেজ, যা ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাডভান্সিং ট্রান্সলেশনাল সায়েন্স (এনসিএটিএস) দ্বারা সমর্থিত। এ ডাটাবেজ সংগ্রহ করা হয়েছে যেসব রোগী কভিড-১৯ পরীক্ষা করেছে তাদের ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড থেকে। এই পরীক্ষাগুলো ইতিবাচক হয়েছে নাকি নেতিবাচক কিংবা কারা কভিডের মতো উপসর্গের কথা বলেছে সেসব দেখছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা এই রেকর্ড জমা দিয়েছেন এবং এনসিএটিএস এগুলো উপলব্ধ করেছে স্বীকৃত গবেষকদের জন্য, যারা বিশ্লেষণের কাজ করতে চান। দলটি ডাটাবেজে কাজ শুরু করে মার্চে এবং এ সপ্তাহ থেকে ডাটা অধ্যয়ন করতে ইচ্ছুক গবেষকদের কাছ থেকে আসা আবেদনপত্র রিভিউ করতে শুরু করেছে।

ছুটে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে কেবল একাডেমিক মেডিকেল সেন্টার নয় কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ, ডাটা সায়েন্স বিভাগ, সামাজিক স্টাডিজ বিভাগেরও এখানে অনেক ভূমিকা আছে। আমরা ডাটা সংগ্রহের জন্য প্রবেশের ক্ষেত্রে সমতায় বিশ্বাস করি। তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে ৪৯টি প্রতিষ্ঠান এই ডাটার জন্য স্বাক্ষর করেছে।

মেডিকেল ইনফরমেটিকস মেলিসা হায়েনডেল বলেন, এত বিস্তৃত পরিসরে ডাটা শেয়ার করা আসলেই একটি বৈপ্লবিক ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর আগে কেউ এ রকম ডাটাসেট তৈরি করেনি।

এই ডাটাগুলোকে কার্যক্ষম করে তোলা একটি চ্যালেঞ্জ। প্রথম বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা ডাটাগুলোকে সাজাতে হয়। যেহেতু ডাটাতে প্রাদুর্ভাব ট্র্যাক করার জন্য স্থান ও তারিখের মতো তথ্য রয়েছে, সেজন্য দলগুলোকে রোগীদের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে সুরক্ষিত কৌশল অবলম্বন করতে হয়।

ছুটে বলেন, ডাটাগুলো সুরক্ষিত জায়গায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ এগুলো সার্ভার থেকে ডাউনলোড বা মুছে ফেলা যায় না। এমনকি, বেশির ভাগ গবেষক এগুলো ব্যবহারের সময় এগুলো সরাসরি দেখতেও পারেন না। পরিবর্তে তাদের অবশ্যই এমন সফটওয়্যার প্রোগ্রাম করতে হবে, যা ডাটা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং উত্তর সরবরাহ করতে পারে।

ছুটে বলেন, আমরা গভীরভাবে সচেতন যে এই সংবেদনশীল ডাটা ভাণ্ডার আমাদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। মহামারী চলমান থাকায় এখানে লাখ লাখ লোকের ডাটা রয়েছে।

দলটি বলেছে যে ডাটা উপলব্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু থাকবে যা সহজলভ্য, যেগুলো গবেষকরা অনুসন্ধান করতে পারবেন। প্রথম প্রশ্নগুলোর একটি হলো, আমরা কি সেসব ওষুধকে চিহ্নিত করতে পারি যা সব রোগীর কিংবা একটা অংশের ওপর পজিটিভ বা নেগেটিভ প্রভাব ফেলতে পারে?

ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের প্যাথলজিস্ট স্টেফান হিউইট যিনি নিজেকে এন৩সির একজন ‘বড় ফ্যান’ দাবি করেন, তিনি কভিড ডিজিটাল প্যাথলজি রিপোজিটরির (কভিড-ডিপিআর) প্রধান, যেটি বর্তমানে দেশব্যাপী কভিড-১৯ রোগীদের টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ ও ডিজিটাইজিংয়ের কাজ করছে। তিনি সংগ্রহটি এন৩সির সঙ্গে মিল রেখে ব্যবহার করার আশা করছেন।

যদিও মহামারীকালে সংগ্রহ ও ডিজিটাইজিংয়ের কাজটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, কভিড আমাদের শোকের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করছে এবং প্রায় সময় পরিবারগুলো একই শহরে থাকে না, কারণ তারা ভ্রমণ করতে পারে না। আর যেহেতু অনুমতির প্রয়োজন হয় তাই কাজটা বেশ হয়ে কঠিন হয়ে যায়। হিউইট অবশ্য তিনি আশাবাদী। তিনি মূলত তিন মাসে ৫০টি ময়নাতদন্তের নমুনা পেতে যাত্রা শুরু করেছিলেন এবং সেই সময়ের মধ্যে ৯০টি পাওয়ার পথে আছেন।

দ্য সায়েন্টিস্ট