শনিবার লন্ডনে ১০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিল। তাদের মুখে মাস্ক ছিল না এবং সবাই বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি অবস্থান করছিল। ট্রাফালগার স্কয়ারে তারা একত্র হয়েছিল মূলত করোনাভাইরাস সময়ে ‘নিউ নরমাল’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে: মাস্ক, লকডাউন বিধিনিষেধ, বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিনেশন ও গোপনীয়তা ধ্বংস করা হেলথ পাসপোর্ট।

এই বার্তাটি মার্কিন স্টাইলের ব্যক্তি স্বাধীনতবাদের সঙ্গে মিলে যায় এবং মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে ‘মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ’ হতে। তবে এর মেজাজটি সিদ্ধান্তগতভাবে ষড়যন্ত্রমূলক ছিল। এ প্রতিবাদে অ্যান্টি-ভ্যাক্সার এবং জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারী পিয়ারস করবিন এবং ফ্যাবুলিস্ট ডেভিড ইচকেসহ অনেকেই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

এ সমাবেশকারীদের মাঝে নানা মতাদর্শের মানুষের সংমিশ্রণ ছিল। সেখানে অ্যান্টি-ভ্যাক্স এবং অ্যান্টি-৫জি প্ল্যাকার্ডও দেখা গেছে। কিউআনোনকে ইঙ্গিত করেও বেশ কয়েকটি টি-শার্ট দেখা গেছে। একই দিন একই রকম আরেকটি প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা গেছে বার্লিনে। উগ্র ডানপন্থার প্রায় ২০ হাজার সমর্থক এদিন রেইশট্যাগে ঝড় তোলার চেষ্টা করেছিল। লকডাউনের চাপে নিছক স্বার্থপর এলোমেলো ইভেন্ট হিসেবে এগুলোকে খারিজ করে দেয়া সহজ হবে। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন না।

যদি আপনি আমার মতো ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তার বিষয়টিতে আগ্রহী হন, তবে দেখা যাবে এ আন্দোলনগুলো অনেক বেশি পূর্বনির্ধারিত এবং এগুলো কেবল ভুলপথে চালিত জনগণের হতাশার কোনো লক্ষণ নয়। এ আন্দোলনগুলোয় যারা অংশ নেয় সেই পৃথক গোষ্ঠীগুলো ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক এবং উগ্র ডান গোষ্ঠীর স্থানান্তরিত জোট। শনিবারের আন্দোলনের প্রধান সংগঠক ছিল যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যান্টি-৫জি আন্দোলনকারীরা, যারা স্ট্যান্ড আপ এক্স নামে পরিচিত। হোপ নট হেটের মতে, এ গ্রুপটি অতীতে ম্যানচেস্টার এবং যুক্তরাজ্যের অন্যান্য শহরে ইউএস-সম্পৃক্ত কোয়ানন-বান্ধব আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। তারা বলছে এ দলটি ক্রমবর্ধমান ষড়যন্ত্রমূলক সংগঠনের অংশ, যারা এখন সহযোগিতা করার জন্য বিশ্বাসের পার্থক্যকে সরিয়ে রাখতেও ইচ্ছুক।  এর আগে সাংবাদিকদের করা একটি তদন্তে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলো ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে লকডাউনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আয়োজন করছে। এগুলো সবই সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির মিশ্রণের একটি অংশ। ষড়যন্ত্রগুলো সব সময় ওভারল্যাপের পয়েন্ট রাখে, কিন্তু কয়েক বছর ধরে অ্যান্টি-ভ্যাক্স আন্দোলন স্পষ্টভাবে ডানপন্থার দিকে এগিয়ে গেছে, যখন  মূলধারার উগ্র ডান এবং ডানপন্থী পপুলিস্ট দলগুলো অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতালির ফাইভ স্টার আন্দোলন এবং নর্দান লিগ সম্প্রতি  প্রশ্ন তুলেছে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে, একইভাবে ফ্রান্সের ফ্রন্ট ন্যাশনালও। হাঙ্গেরিতে ভিক্টর ওরবান নিয়মিতভাবে বলেছে, ইহুদি অর্থদাতা জর্জ সোরোস অভিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে দেশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন এবং ট্রাম্প এ সপ্তাহে দাবি করেছেন যে তার বিরোধী জো বাইডেন এমন লোকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যা আপনি কখনো শোনেননি। এমন মানুষ যারা অন্ধকারের ছায়ায় ঘেরা থাকে। ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলোতে সাধারণত কর্তৃপক্ষবিরোধী উপাদান থাকে। তারা সাধারণত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এগুলো বোঝার জন্য উপযোগী হতে পারে একাডেমিক মার্ক ডেভিসের ‘জনবিরোধী’ ডিসকোর্স।

কারো কারো জন্য, এ জনবিরোধী ডিসকোর্সটি চিরায়ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতার ধারণা নিয়ে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈষম্য ও সংকট সিস্টেমকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আবার ট্রাম্পের মতো যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের ষড়যন্ত্রমূলক চিন্তাভাবনা অনুমতি দেয় বিভ্রান্ত করতে, দায় চাপাতে, বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে।

অবশ্য এটি বড় কোনো ব্যাপার না যে গত সপ্তাহে অ্যান্টি-ভ্যাক্সারদের বিশাল দলটি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে কতটা অগ্রগতি লাভ করেছে। এ সপ্তাহে করা একটি জরিপ দেখাচ্ছে যে ব্রিটেনের ৮৫ শতাংশ নাগরিক দৃঢ়ভাবে সম্মত হয়েছে যে গ্রহণযোগ্যতার হার সর্বোচ্চ হলে তারা কভিড-১৯-এর সম্ভাব্য ভ্যাকসিন নেবে।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত