মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস মহামারী বিশ্বের অন্যান্য স্থানের তুলনায় কেন এত বাজে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা ফেডারেল সরকারের প্রতিক্রিয়াজনিত অব্যবস্থাপনা এবং ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজের নেতৃত্বের অভাবকে সামনে এনেছেন।

কেউ কেউ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সংস্কৃতি, জনস্বাস্থ্যের বিকেন্দ্রীকরণ প্রকৃতি এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে আঙুল তুলেছেন।

এগুলো সবই যৌক্তিক কারণ, কিন্তু এখানে আরো একটি কারণ আছে। তবে ব্যর্থ প্রতিক্রিয়ার আরো পুরনো কারণ রয়েছে—সংক্রামক রোগ মোকাবেলায় আমাদের পদ্ধতিগুলো উনিশ শতক থেকে নেয়া—যেখানে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সংক্রামক রোগকে দেশ থেকে দূরে রাখার ওপর অধিকতর মনোযোগ দেয়া হয়।

মেডিকেল স্যোসিওলজির একজন প্রফেসর হিসেবে আমি সংক্রামক রোগের প্রতিক্রিয়া এবং জনস্বাস্থ্য পলিসি নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমি আমার নতুন বই ‘ডিজিজ স্টেটস’-এ ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা কীভাবে দেশগুলোর বর্তমান রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আকার দিয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখেছি। আমি বিশ্বাস করি যে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার অধিক মনোযোগের কারণে তা ঘরোয়াভাবে সংগঠিত রোগের বিপর্যয় ঠেকানোর ক্ষমতাকে ব্যাহত করেছে।

জীবাণু তত্ত্ব ও সেনাবাহিনী

উনিশ শতকজুড়ে ইয়েলো ফিভার, গুটিবসন্ত ও কলেরা প্রাদুর্ভাব সংগঠিত হওয়ার সময় ইউএস ফেডারেল সরকার সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইকে ১৮৭৮ সালের ইয়েলো ফিভারের প্রাদুর্ভাবের আগ পর্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। একই বছর প্রেসিডেন্ট রাদারফোর্ড বি হায়েস ন্যাশনাল কোয়ারেন্টি অ্যাক্টে স্বাক্ষর করেন, যা ছিল রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রথম ফেডারেল আইন।

বিশ শতকের শুরুতে ‘নিউ পাবলিক হেলথ’ নামে নতুন ধারণা নিয়ে হাজির হয় আমেরিকানরা। যা কিনা জনস্বাস্থ্য নিয়ে ইউরোপীয় ধারণা থেকে পৃথক ছিল। এটি জোর দিত স্যানিটেশন ও সামাজিক পরিবেশের ওপর। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আগ্রহী হয়েছিল নতুনভাবে জনপ্রিয় হওয়া জীবাণু তত্ত্বের ওপর। যাতে বলা হয় অণুজীব এত ক্ষুদ্র হয় যে তা খালি চোখে দেখা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র মূলত মনোযোগ দেয় সংক্রামকদের আইসোলেট করার প্রতি।

বস্তুত সেনাবাহিনী রোগ নিয়ন্ত্রণ করত। ইয়েলো ফিভারের প্রাদুর্ভাবের পর ইউএস মেরিন হসপিটাল সার্ভিস দেশব্যাপী মেরিটাইম কোয়ারেন্টিন স্টেশনের দায়িত্ব নেয়। ১৯১২ সালে মেরিটাইম হসপিটাল সার্ভিস রূপ নেয় ইউএস পাবলিক হেলথ সার্ভিসে। এখন পর্যন্ত এতে সার্জন জেনারেলের নেতৃত্বে পাবলিক হেলথ সার্ভিস কমিশনড কর্পস অন্তর্ভুক্ত আছে। এমনকি সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি সামরিক সংস্থা হিসেবে যুদ্ধের অঞ্চলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম শুরু করে। রোগ নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা এ ধারণা প্রচার করে যে সংক্রামক রোগ হচ্ছে বিদেশী শত্রুর হানা দেয়ার মতো।

বিশ শতকে জীবাণু তত্ত্ব এবং মিলিটারি ম্যানেজমেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে সীমানা নিয়ন্ত্রণ এবং কোয়ারেন্টিন করার দিকে চালিত করে।

ভুলগুলো

একবিংশ শতাব্দীতে এসে এটা আমাদের প্রধান কৌশল হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম কাজ ছিল চীনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং ইউরোপিয়ানদের ভ্রমণ সীমিত করা।

তার এ কাজ নতুন কিছু না। ২০১৪ সালে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সময় ক্যালোফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি বাধ্যতামূলকভাবে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারেন্টিনে পাঠায়।

২০০৭ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর প্রতিক্রিয়ায় ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং সিডিসি ‘ডু নট বোর্ড’ লিস্ট করে সংক্রমিত লোকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ থেকে বিরত রাখার জন্য। কিন্তু বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব যদি অনেক বড় হয়, তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে ও কোয়ারেন্টিন করে একে থামানো সম্ভব নয়।

করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে সংক্রামক রোগকে দেশের ভেতর ঢুকতে না দেয়ার যে প্রচেষ্টা তা অনেক বেশি ব্যর্থ চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের অধিক মনোযোগ যা বলে তা হলো দেশটি কভিড-১৯-এর অভ্যন্তরীণ বিস্তৃতিকে সীমিত করতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এর ফলে যা হয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্র টেস্টিং, কন্টাক্ট ট্রেকিং ও শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিকাশে পিছিয়ে পড়েছে।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র জনস্বাস্থ্যে কম বিনিয়োগ করেছে। যার পরিণতিও ভালো ছিল না। আরো একবার এখন এসে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মহামারীর বিরুদ্ধে সরকারের নেয়া ব্যবস্থাগুলো।

স্ক্রলডটইন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত