গত ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, তহবিলের এ অর্থ শুধু শ্রমিক ও কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য ব্যবহার করতে হবে। অনুমান করা গিয়েছিল, রফতানি পণ্যের ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ায় উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের মজুরি প্রদান এবং অন্য স্বল্পমেয়াদি দায় পূরণে ব্যাপকভাবে নগদ অর্থের সংকটে পড়বেন। কাজেই তৈরি পোশাক শিল্পের অংশীজনরা গৃহীত এ প্রণোদনা কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়েছেন। এটি সত্য যে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপক ঝুঁকি পোশাকের বৈশ্বিক মূল্য নিগড় (গ্লোবাল অ্যাপারেল ভ্যালু চেইন) কার্যত বিপর্যস্ত করেছে। বৈশ্বিক পর্যায়ের অনেক ক্রেতা তাদের রফতানি আদেশ হয় বাতিল করেছেন, নতুবা স্থগিত করেছেন। চীন ও অন্য প্রধান অর্থনীতিগুলো বাকি বিশ্ব থেকে কার্যত বন্ধ বা বিচ্ছিন্ন থাকায় এ শিল্পের কাঁচামাল আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার নাগরিকদের জন্য একটি স্বেচ্ছায় বদ্ধাবস্থা (লকডাউন) আরোপ করেছে। প্রতিটি শিল্পের উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা কার্যত বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। রফতানিমুখী শিল্প তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গত ৩১ মার্চ ওই প্রণোদনা প্যাকেজের বিধিমালা প্রণয়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই বিধিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বাজেটারি বরাদ্দ দেয়ার কথা বলা হয়। ওই বরাদ্দ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনা সুদে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেবে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ সরল সুদে রফতানিকারকদের ঋণ সুবিধা দেবে। ওই ২ শতাংশ মূলত ব্যাংকের লেনদেন ব্যয় নির্বাহের জন্য। উল্লিখিত শর্তপূরণসাপেক্ষে কেবল রফতানিমুখী ও সক্রিয় শিল্প ইউনিটগুলো এ ঋণের জন্য যোগ্য হবে এবং ঋণের অর্থ কেবল কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদানের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে। পরিশোধের শর্তও সহজ। রফতানিকারী ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সমান কিস্তিতে ১৮ মাসের মধ্যে শোধ করতে পারবে উল্লিখিত ঋণ।
এ স্কিমের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও বেশ প্রশংসনীয়। ঋণদানকারী ব্যাংকগুলো সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের ২০২০ সালের মার্চে কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের আগের তিন মাসের মজুরিপত্র (সেলারি শিট) পর্যালোচনা করবে। ব্যাংকগুলো উপযুক্ত কর্মীদের ব্যাংক হিসাবে কিংবা মোবাইল ক্যাশ ট্রান্সফার ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি বেতন দেবে। একজন কর্মীকে কোনোভাবে গত তিন মাসের মোট গড় বেতনের বেশি অর্থ প্রদান করা হবে না। সর্বশেষ নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের অন্তত ৮০ শতাংশ রফতানিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই এ স্কিমের জন্য যোগ্য হবে। এর অর্থ হলো, এ স্কিম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রফতানিকারকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না। সার্বিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রণোদনা প্যাকেজটি সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও সম্মুখদর্শী। এর বাস্তবায়ন নকশাও যুক্তিসংগতভাবে সুগ্রথিত। এটি ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য অনুদান নয় এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থে ভর্তুকিও নয়। এ স্কিম অর্থায়নে ব্যবহূত সরকারি সিকিউরিটিজের বিক্রয় থেকে নেয়া সরকারি ঋণের সুদই হলো একমাত্র ভর্তুকি। আলোচ্য স্কিমে আরো কিছু বিষয় বিবেচনা এটিকে অধিক টেকসই, দক্ষ ও ন্যায্য করবে।
প্রথমত, একটি রফতানিমুখী ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে অন্তত ৭ শতাংশ (৫ শতাংশ রেপো হার এবং ২ শতাংশ স্প্রেড অনুমান করে) সুদ আরোপ করা যেতে পারে, যাতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন না হয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি পোশাক উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থের সংকট না-ও থাকতে পারে এবং সেক্ষেত্রে প্রকৃত ঋণগ্রহণ ব্যয় এবং বাজার সুদহার সংগতিপূর্ণ হলে তারা এ প্রণোদনা গ্রহণে ইচ্ছুক না-ও হতে পারে। উল্লেখ করা দরকার, পোশাক রফতানিকারকরা স্বল্পমেয়াদি তারল্যের দাবি করেছেন, ভর্তুকি নয়। এটা নির্দেশ করে যে এ স্কিমের প্রকৃত নকশা অনুযায়ী প্রত্যেক রফতানিকারকই বিনা সুদে ঋণ নিতে পারবেন বলে তারা প্রত্যেকেই আলোচ্য প্রণোদনা প্যাকেজের জন্য আবেদনে আগ্রহী হবেন। এ নকশা তাই অন্তর্নিহিতভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং তহবিলের জন্য বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে। এই ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে দুর্নীতি হতে পারে যে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী বা ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ থাকা রফতানিকারকরা ‘ভুয়া মজুরিপত্র’
(ফেক সেলারি শিট) তৈরি করে সর্বোচ্চ ঋণ হাতিয়ে নেয়ার মাধ্যমে এ তহবিলের অপব্যবহার করতে পারেন। এ দুর্নীতির সম্ভাবনা দূর করা যায় ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক রেটের সঙ্গে ২ শতাংশ স্প্রেডের মতো শুধু একটি সহজ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে। উল্লেখ্য, কর্মীর ব্যাংক হিসাবে (বা বিকাশ হিসাব) সরাসরি বেতন প্রদানের বিধান আলোচ্য সহায়তা প্যাকেজে দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তৃতীয়ত, এই প্রণোদনা কিন্তু ঋণ ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। কিছু ঋণগ্রহীতা খেলাপি হবেন এবং অর্থ পরিশোধে অসমর্থ হবেন। বর্তমান অবয়বে ঋণপ্রদানকারী ব্যাংকের জন্য এটি হবে ক্ষতি এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়। চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাজেটারি বরাদ্দের পরিবর্তে অর্থায়িত স্কিমটি বিদ্যমান রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বা একই ধরনের উদ্যোগের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। তেমনটি হলে ঘোষিত তহবিলের অর্থ অর্থ মন্ত্রণালয় সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বা জনস্বাস্থ্যের আরো জরুরি প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারবে।
পরিশেষে, যেকোনো সরকারি ঋণ প্রণোদনা নিরপেক্ষতার নীতির ভিত্তিতে হওয়া উচিত। অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো (এমএসএমই) কিংবা রফতানিমুখী নয় অথচ লাখ লাখ কর্মী নিয়োগ দেয় এমন স্থানীয় অন্য বড় প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট মেটাতে হবে। কৃষি খাতে স্বনিয়োজিত মানুষের জন্য কী উদ্যোগ নেয়া হবে? এই কঠিন সময়ে তাদের ঋণ বা অর্থের জন্য সরকারের বিভিন্ন জানালা খোলা রাখা উচিত। সর্বশেষ শ্রমজরিপ অনুযায়ী, শুধু কৃষি খাতেই ২৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন কর্মী নিয়োজিত। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, নির্মাণসহ সেবা খাত এবং অন্য খাতে প্রায় ২৭ দশমিক ২ মিলিয়ন লোক নিয়োজিত। ৫০ মিলিয়নের অধিকসংখ্যক কর্মী চাকরি হারানো, আয় হারানো এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ার মুখোমুখি। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার দুটি আলাদা প্রণোদনা প্যাকেজ ৫ এপ্রিল ঘোষণা করেছেন। এর সুদহার ৯ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। সরকার অবশ্য সেই সুদের অর্ধেকের বেশি ভর্তুকি দেবে বলে ঘোষণা করেছে। এটা অনেক উত্তম প্রণোদনা। রফতানিকারকদেরও শূন্য হারে ঋণ প্রদান না করে তহবিলের বাজারমূল্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সুদে ঋণ প্রদান করলে রফতানি খাতেও ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ঋণমানও উন্নতি লাভ করবে।
আমরা আশা করি, স্বনিয়োজিত, এমএসএমই ও স্থানীয় শিল্পগুলোকে তারল্য জোগাতে সরকার অভিনবমূলক আর্থিক কর্মসূচি প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করবে এবং কভিড-১৯-এর সংকট মোকাবেলায় যথাযথভাবে সাহায্য করবে।





