করোনাভাইরাস মহামারী আমাদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে, যার অন্যতম হলো সর্বক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির সুফল না নেয়া। ফলে কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়াতে এবং সমৃদ্ধি অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে চিরাচরিত চিন্তাভাবনাকে পেছনে ফেলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু এ ডিজিটাল রূপান্তর আসলে কী? আমরা বলতে পারি এটি হলো গতানুগতিক প্রক্রিয়া, পণ্য ও সেবাকে পাল্টে সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক, পরস্পর সংযুক্ত সলিউশন তৈরি করা, যা অধিক কর্মদক্ষতা ও নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরির মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি করে এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে।
কভিড-১৯ আমাদের দেখিয়েছে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রূপান্তর নিয়ে আসতে অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ফরচুন ৫০০ কোম্পানির মধ্যে পরিচালিত ফোর্বসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায়, তাদের ৭৫ শতাংশ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনে করেন চলমান সংকট তাদের প্রতিষ্ঠান ও খাতে প্রযুক্তির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করবে। আমরা এরই মধ্যে দেখতে পেয়েছি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসা বিশ্লেষণ ও চাহিদার পূর্বানুমান থেকে শুরু করে বিপণন, গ্রাহক সেবা, সাপ্লাই চেইন ও ব্যাক-অফিস রূপান্তরে বিনিয়োগ করছে। যদিও বিনিয়োগ ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তাদের প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব। দেখা যায় যে তারা দীর্ঘস্থায়ী কৌশলের পরিবর্তে স্বল্পস্থায়ী লক্ষ্য নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্যপ্রযুক্তিতে যেহেতু এখন আগের চেয়ে আরো বেশি উদ্যোগী হচ্ছে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব মূলত অকার্যকর ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে। এর পরিবর্তে তাদের চাহিদানুসারে সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বিস্তৃত ডিজিটাল রূপান্তর কৌশল থাকা উচিত।
সামনের দিনগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরে মূলত ছয়টি বিষয় প্রাধান্য পাবে: ১. গ্রাহক চাহিদা বুঝে পণ্যের নকশা ও বিক্রি, ২. সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ককে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের অংশ করা, ৩. নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আরো উন্নতি আনা, ৪. জনবলকে পুনর্গঠন ও দূর-ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা, ৫. ডিজিটাল উদ্যোগগুলোয় বিনিয়োগ ও সেগুলো গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়ন করা এবং ৬. ব্যবসায়িক মডেলের বিবর্তনের মাধ্যমে ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল পাওয়া।
আমরা দেখেছি বিশ্বব্যাপী সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও হোম কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পর থেকে যেসব কোম্পানি তাদের কার্যক্রমে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছিল কিংবা যারা দ্রুত রিমোট ওয়ার্ক টুলের মতো সলিউশন গ্রহণ করতে পেরেছে তারা এ মহামারীর মধ্যেও কার্যক্ষম থেকে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে, যারা প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল তারা সব থেকে বেশি প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে। আমরা ভাগ্যবান যে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বাস করছি। টুলস, প্রক্রিয়া রি-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যেমন ইন্টারনেট অব থিংস, মেশিন লার্নিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ক্লাউড টেকনোলজিস ইত্যাদি সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকাণ্ড স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব।
অদূরদর্শী নির্বাহীরা এখনো তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যয় সংকোচনের চেষ্টা করছেন এই ভেবে যে এটি তাদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে। যদিও এ গতানুগতিক ভাবনা ও ব্যবসা পরিচালনায় এরই মধ্যে আমাদের সংকটের মুখোমুখি করেছে। বিশালাকার ম্যামথ (বিলুপ্ত হাতি) জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় বরফযুগে টিকে থাকতে পারেনি। কিন্তু যারা বিবর্তিত হয়েছে তারা পেরেছে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিবর্তন হবে ডিজিটাল রূপান্তরভিত্তিক এবং ফরচুন ৫০০ কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের মতো দূরদর্শী নির্বাহীরা এরই মধ্যে তাদের সীমিত সম্পদ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণে বিনিয়োগের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে। এ বিবর্তন অর্জনে আমাদের শুরুতেই যে উদ্যোগটি নিতে হবে সেটি হলো প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একটি পথনকশা (রোডম্যাপ) তৈরি করা।
ডিজিটাল রূপান্তর পথনকশা হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তারিত বিবরণী, যা তথ্যপ্রযুক্তিগত রূপান্তরের জন্য কোম্পানির লক্ষ্য ও কৌশলগত পরিকল্পনা নির্ধারণ করে। এটি কোম্পানিজুড়ে প্রয়োজনীয় টুলস ও প্রযুক্তি প্রয়োগের সমন্বিত উপায়গুলোকে চিহ্নিত করে, যা কোম্পানির কর্মদক্ষতা বাড়ায়; একই কাজের পুনরাবৃত্তি হ্রাস করে; সমন্বয় বৃদ্ধি করে এবং এর মাধ্যমে ভুলের হার ও পরিচালনা ব্যয় কমিয়ে আনে। পাশাপাশি এটি মহামারী ও দীর্ঘ লকডাউনের মধ্যে ব্যবসা সচল রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করে।
একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলে অবশ্যই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকতে হবে: যেমন ব্যবসার উদ্দেশ্য-লক্ষ্য ও দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা, প্রযুক্তিগত চাহিদা ও এর ব্যাপ্তি নির্ধারণ, বর্তমান সক্ষমতা ও অবকাঠামো নিরীক্ষণ, সামগ্রিক আইটি কাঠামো নির্ধারণ, আইটি কাঠামোতে ব্যবসার প্রক্রিয়াগুলোকে সংস্থাপন, অবজেকটিভ অ্যান্ড কি রেজাল্ট (ওকেআর) নির্ধারণ, বাজেট যাচাই এবং সঠিক মানবসম্পদ চিহ্নিতকরণ। আমাদের প্রতিষ্ঠান ই-জেনারেশন বিশ্বমানের প্রডাক্টিভিটি সলিউশন এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে তাদের ডিজিটাল রূপান্তর কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পেরে গর্বিত। ‘ডিজিটাল-ফার্স্ট’
বিশ্বে সাফল্য পেতে ভবিষ্যতের জন্য একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কর্মীদের সঠিকভাবে নিয়োজিত করা, শক্তিশালী ডিজিটাল গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসাকে একীভূত করার মাধ্যমে ডিজিটাল দক্ষতা তৈরি ও রূপান্তর একান্ত জরুরি।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সূচনাকালে এটি আমাদের কর্মপ্রবাহে প্রযুক্তিকে বরণ করে নেয়ার একটি সুযোগ দিয়েছিল। অনেকেই সুযোগটি গ্রহণ করেছে, আবার অনেকে অপেক্ষা করেছে। কভিড-১৯ মহামারীর বাস্তবতায় আমাদের আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যেসব কোম্পানি ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন স্বাভাবিকতাকে বরণ করে নেবে, তারা মহামারী-পরবর্তী সময়ে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু যেসব কোম্পানি তাদের ব্যবসা কার্যক্রমে প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করবে না, যারা এখনো প্রযুক্তির প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে এগোনোর কথা ভাবছে, তারা নিকট ভবিষ্যতে কঠিন সময়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। কারণ ইন্ডাস্ট্রিজুড়ে প্রযুক্তিগত রূপান্তর ব্যাপক পরিসরে এবং ভাবনাতীতভাবে ঘটতে যাচ্ছে। সময় এখন সাহসী চিন্তার, দৃঢ়তার সঙ্গে পরিকল্পনা করার এবং বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেয়ার।
লেখক: ই-জেনারেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান, পেগাসাস টেক ভেঞ্চার্সের জেনারেল পার্টনার, ভিসিপিয়াবের সভাপতি ও বেসিসের সাবেক সভাপতি
shameem.ahsan@egeneration.co





