দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে স্কুলগুলোতে শিশুরা তাদের দুপুরের খাবার খেতে বসে নীরবে, এ সময় তাদের বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা করে রাখে একটি প্লাস্টিকের পর্দা। তারা মাস্ক পরে থাকে এবং প্রতিদিন সকালে দুবার তাদের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়। প্রথমে একবার বাসায় এবং তারপর স্কুল গেটে।

এটা বিশ্বজুড়ে লাখো শিশুর নতুন বাস্তবতা হতে পারে। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছিল। এখন এসে সরকাগুলো কখন ও কীভাবে স্কুল খোলা যাবে সে বিতর্ক সামনে এনেছে। অনেকগুলো গবেষণা দেখাচ্ছে, এ কাজটা নিরাপদে করার কিছু উপায় রয়েছে। মূল ব্যাপার হচ্ছে স্বাস্থ্য এবং শারীরিক দূরত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা। যার ফলে সংক্রমণের বিস্তৃতি রোধ করা যায়।

পার্থের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার এপিডেমিওলজিস্ট জো হেইড বলেন, এশিয়ার কিছু দেশ, বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে স্কুলগুলো সরাসরি ক্লাস করাতে পারে তার একটি ভালো মডেল উপস্থাপন করেছে।

তবে গবেষকরা বলছেন, যদি কমিউনিটি ট্রান্সমিশন একেবারে নিচের স্তরে নেমে আসার আগে স্কুল খোলা হয়, তবে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে পারে।

উচ্চঝুঁকির পরিবেশ

এপিডেমিওলজিস্ট ইয়ং জুন চো বলেন, স্কুলগুলো উচ্চঝুঁকিসম্পন্ন স্থান হতে পারে। বাচ্চাদের আট ঘণ্টার কিংবা তার বেশি সময় দুর্বল ভেন্টিলেটেড রুমে থাকতে হয়। সেখানে প্রচুর মেলামেশা হয়ে থাকে, কারণ আশপাশের অনেক এলাকা থেকে বাচ্চা আসে। কেউ কেউ গণপরিবহন ব্যবহার করেও আসে।

মহামারীর শুরুর দিকে মনে হয়েছিল বাচ্চাদের সঙ্গে ভাইরাসের সংযুক্তি বয়স্কদের চেয়ে ভিন্ন। কারণ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মৃদু উপসর্গ দেখা গেছে। এটা ধারণা করা হচ্ছিল যে তারা কম সংক্রামক। কিন্তু এখন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে বাচ্চারা অন্য মানুষদের মাঝে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে তাদের মাঝে যারা একই ঘরে বাস করে। অনেকগুলো গবেষণা বলছে, বাচ্চারা যদি একবার সংক্রমিত হয়, তবে তারা আর কম সংক্রামক থাকে না।

লো কমিউনিটি স্প্রেড

দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় করা গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলগুলো নিরাপদে খোলা যাবে যখন কমিউনিটি ট্রান্সমিশন কমে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাচ্চারা মে মাসের মাঝামাঝিতে ক্লাসরুমে ফিরে আসে, যখন দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ৫০-এর নিচে নেমে আসে। এমন নিম্ন ট্রান্সমিশন রেট সত্ত্বেও ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে। যেমন হাইস্কুলগুলো দিয়ে শুরু করে, তারপর জুনিয়র স্কুল খোলা। আবার যেসব জায়গায় সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল, সেখানে শিক্ষার্থীদের একটা অংশ কেবল উপস্থিত হয়েছিল। যখন কেউ পজিটিভ আসছিল, পড়াশোনা আবারো অনলাইনে ফিরে গিয়েছিল। 

সিওলের গবেষকদের করা একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯ বছর এবং তার চেয়ে কম বয়সী বাচ্চাদের কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে স্কুল খোলার দুই মাস পরও সংক্রমণের দিক থেকে কোনো আকস্মিক বৃদ্ধি নেই। সরকারি ডাটা মতে, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে টেস্ট পজিটিভ আসা ১১১ জন স্কুলগামী বাচ্চাদের মধ্যে মাত্র একজন স্কুলে এসে পজিটিভ হয়েছে। বাকিরা হয় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে কিংবা অন্য কোথাও থেকে সংক্রমিত হয়েছে। চোয়ের মতে, এখান থেকে যে বার্তা গ্রহণ করা যায় তা হলো সঠিক পলিসির সাহায্যে আমরা স্কুলগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এখানে এমন কোনো রেসিপি নেই, যা কোরিয়াকে অনন্য করে তুলেছে।

অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে, মে মাসের মাঝামাঝিতে অনেকগুলো ইউরোপিয়ান দেশে স্কুল খোলার পরও এখন পর্যন্ত কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কোনো উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়নি।

ঠাসা ক্লাসরুম

স্কুল ও ক্যাম্প বড় প্রাদুর্ভাবের স্থান হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার একটি শিবিরে মধ্য জুনে রাতারাতি ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিনের ক্যাম্পে জর্জিয়া ৯৯৩টি সংক্রমণের কথা উল্লেখ করে। 

আরেকটি বড় প্রাদুর্ভাব চিহ্নিত হয়েছে ইসরায়েলের জেরুজালেমের হাইস্কুলে। যা দেখা যায় মে মাসের মাঝামাঝিতে স্কুল খোলার পর। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার পর কিছু কিশোর একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে মাস্ক ছাড়া সহপাঠীদের সঙ্গে বসে ছিল। এই প্রাদুর্ভাবের প্রভাব পড়েছে ১৫৩ জন শিক্ষার্থী, ২৫ জন স্টাফ ও অন্যদের ওপর। স্কুলের পরিবেশও কমিউনিটি স্প্রেডের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এপিডেমিওলজিস্ট এডওয়ার্ড গোল্ডস্টেইন বলেন, ইসরায়েল ও চিলির উদাহরণ খেয়াল করলে আমরা দেখি, স্কুলের আকারও স্কুলে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

স্কুলের উচিত দূরত্বের বিধিগুলো আরোপ করা, বাচ্চাদের ক্লাস সকাল-দুপুরে ভাগ করে এটা করা যেতে পারে। আর উচ্চসংক্রমণের এলাকাগুলোতে যদি স্কুল খোলা হয়, তবে মাস্ক পরা, ক্লাসের আকার, হাত ধোয়া এবং টেস্টিং-ট্রেসিংয়ের বিষয়গুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

নেচার